হাম নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে জুনে

দেশব্যাপী হামের প্রাদুর্ভাব চলছে। একইসঙ্গে শিশুদের মৃত্যু এবং আক্রান্তের হারও বেড়েই চলেছে। গতকাল শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীসহ দেশব্যাপী হামে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে নিশ্চিত হামে চার জনের এবং হাম উপসর্গে আট জনের মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে এই তথ্য জানানো হয়েছে। এতে আরো বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত হয়েছে ১১৯২ জন এবং নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ১১১ জন।

১৫ মার্চ থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত মোট হামের রোগীর সংখ্যা ৫৫ হাজার ৬১১ জন। এর মধ্যে নিশ্চিত হামের রোগীর সংখ্যা ৭ হাজার ৪১৬ জন। হাসপাতালে ভর্তিকৃত রোগীর সংখ্যা ৪০ হাজার ১৭৬ জন। হাসপাতাল থেকে ৩৬ হাজার ৫৫ জন ছাড়পত্র পেয়ে বাড়ি ফিরেছে। এ পর্যন্ত  ৪৫১ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৭৪ জন নিশ্চিত হামে মারা গেছে। বাকি ৩৭৭ জনের হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে জানানো হয়েছে।

আগামী জুন মাসের প্রথম দিক থেকে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আসা শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র সরকার। তিনি বলেন, শিশু মৃত্যুর মধ্যে নিউমোনিয়া মৃত্যুর হার সর্বাধিক। ১৫ মার্চ থেকে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়।

স্বাস্থ্যের মহাপরিচালক বলেন, ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। শতভাগ টিকাদান কার্যক্রম শেষ করা হয়েছে। এই কর্মসূচিতে ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। এ টিকাদান কার্যক্রমের বাইরে কিছু কিছু শিশু বাদ পড়েছে। তাদের খুঁজে বের করে টিকা দেওয়া হচ্ছে। টিকাদান কর্মসূচি চলমান। তার মতে টিকা দেওয়ার তিন থেকে চার সপ্তাহের পর থেকে হামে আক্রান্ত শিশুর দেহে এন্টিবডি তৈরি হওয়া শুরু হয়। প্রথমে ১৮ টি জেলা ও ৩০ টি উপজেলায় হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। 

সেসব জেলা ও উপজেলায় প্রথমেই টিকা দেওয়া হয়। বর্তমানে ঐসব জেলা-উপজেলায় হামের কোনো প্রাদুর্ভাব নেই। কোনো মৃত্যুর তথ্যও পাওয়া যায়নি।

আইইডিসিআর-এর সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান বলেন, হামের টিকা দেওয়ার পর তিন ও চার সপ্তাহের মধ্যে হামে আক্রান্ত শিশুদের দেহে ইমিউনিটি (রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা) তৈরি হয়। টিকা দেওয়ার আগে শিশুদের নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি। হামে যে সব শিশু মারা যায়, তাদের দেহে পুষ্টির ঘাটতি থাকে। ভিটামিন-এ ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের সমস্যা থাকে। এ কারণে ঐ সব শিশুদের সময়মতো টিক দেওয়া অতীব জরুরি বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মোসতাক হোসেন বলেন, হাসপাতালের বাইরে শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে। আক্রান্তের মধ্যে নিউমোনিয়ার হার বেশি। তাদের বেশির ভাগের আইসিইউর প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালের পক্ষে চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। বেসরকারি হাসপাতালগুলোর আইসিইউ হামে আক্রান্ত শিশুদের সুচিকিত্সার্থে ব্যবহার করার জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় নিতে পারে। ৯০ ভাগ শিশু সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে আসে। সময়মতো শিশুরা আইসিইউ সাপোর্ট না পাওয়ায় পরবর্তীতে বিভিন্ন জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়।

তিনি বলেন, বর্তমানে গ্রামাঞ্চলের শিশুরাই হামে আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। জ্বর হলে শিশুদের স্থানীয় উপজেলা অথবা জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিত্সকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থাপত্র নিতে হবে। এজন্য দেশব্যাপী হামের চিকিত্সা ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজানো হলে শিশুরা দ্রুত সুচিকিত্সা পাবে।

শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শফি আহমেদ মোয়াজ বলেন, গ্রামে হার্ড ইমিউনিটি বাড়ছে। সামনে শুরু হতে পারে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব। দুটি মিলিয়ে পরিস্থিতি বেসামাল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, হাম একটি শক্তিশালী ছোঁয়াচে রোগ। আক্রান্তদের মধ্যে গ্রামে হামে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। রাজধানীর হাসপাতালের মধ্যে চিকিত্সাধীন শিশুদের মধ্যে ৭০ ভাগই ঢাকার বাইরের বলে তিনি জানান।

শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, প্রতিবছর পাঁচ বছর বয়সি শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ২৪ হাজার মারা যায়।  দেশে মোট শিশু মৃত্যুর মধ্যে প্রতি চার জনের একজনই নিউমোনিয়ায় মারা যায় বলে তিনি জানান।

ঢাকা শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহবুবুল হক বলেন, হামের পর শিশুরা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। হামের আগে কোনো কোনো শিশু অন্য রোগে আক্রান্ত ছিল। ঐ সব শিশুর দেহে নতুন করে যুক্ত হয়েছে হামের ভাইরাস। এসব শিশুরাই নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন ধরনের জটিলতায় মারা যাচ্ছে বেশি। টিকাদান কার্যক্রম শেষ হয়েছে। সামনে থেকে হামে আক্রান্তের হার কমে আসবে বলে তিনি জানান।