পবিত্র ঈদুল আজহা : ত্যাগের আনন্দ ও মহিমা

মুসলিম জাহানের দ্বারে সমাগত ত্যাগের এক মহোৎসব—পবিত্র ঈদুল আজহা। আগামী বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে মহা সাড়ম্বরে পালিত হইবে এই ঈদ উৎসব। এইখানে ‘ঈদ' শব্দের অর্থ আনন্দ। আর ‘আজহা' অর্থ ত্যাগ বা উৎসর্গ করা। তাই ঈদুল আজহার অর্থ ত্যাগ বা উৎসর্গের আনন্দ। যেই হেতু এই ঈদের গুরুত্বপূর্ণ অনুষজ্ঞ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাহার নামে ও উদ্দেশে পশু কোরবানি কর এবং মর্যাদাপূর্ণ এই ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অপার নৈকট্য (কোরবানি অর্থ নৈকট্য) অর্জনের মাধ্যমে আত্মিক মহা আনন্দ লাভ করা, তাই ইহাকে ঈদুল আজহা বলা হয়।

উল্লেখ্য, বাবা আদম (আ.)-এর দুই পুত্র কাবিল ও হাবিলের দেওয়া কোরবানি হইতেই কোরবানির ইতিহাসের গোড়াপত্তন হইয়াছে। ইহার পর হইতে বিগত সকল উম্মতের উপর তাহা জারি ছিল। তবে আমাদের উপর যে কোরবানির নিয়ম নির্ধারিত হইয়াছে, তাহা মূলত হজরত ইবরাহিম (আ.) কর্তৃক শিশুপুত্র ইসমাইল (আ.)-কে আল্লাহর রাহে কোরবানি দেওয়ার ঘটানাকে কেন্দ্র করিয়া। মক্কা নগরীর জনমানবহীন ‘মিনা’ প্রান্তরে আল্লাহর এই দুই আত্মনিবেদিত বান্দা তাহার নিকট নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মাধ্যমে তুলনাহীন ত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। বর্ষপরম্পরায় তাহারই স্মৃতিচারণ হইল ‘ঈদুল আজহা' বা কোরবানির ঈদ। কোরবানির মূল লক্ষ্য হইল—‘তাকওয়া’ বা খোদাভীতি অর্জন করা। পবিত্র কোরআনে ঘোষিত হইয়াছে, ‘আল্লাহর নিকট না তাহাদের কোরবানির গোশত পৌঁছে, না তাহাদের রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া' (সুরা হজ, আয়াত : ৩৭)। তাই ভোগসর্বস্ব মানসিকতা, লৌকিকতা কিংবা সামাজিক প্রতিষ্ঠার মোহ পরিত্যাগ করিয়া কেবল সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশে উৎসর্গীকৃত মন লইয়া আমাদের এই উৎসবে শামিল হইতে হইবে।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশে সালাত বা নামাজ আদায় করো এবং কোরবানি করো' (সুরা কাওসার-২)। কোরবানির এই স্মৃতিবাহী জিলহজ মাসে হজ উপলক্ষ্যে সমগ্র পৃথিবী হইতে লক্ষ লক্ষ মুসলমান সমবেত হন ইবরাহিম (আ.)-এর সেই স্মৃতিবিজড়িত মিনা, আরাফাত, মুজদালিফা ও সর্বোপরি মক্কা মুকাররমায়। ইহাতে আমরা নিবিড়ভাবে অনুভব করি বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্ব। প্রকৃতপক্ষে আমাদের বিত্ত-বৈভব, সংসার ও সমাজ সকল কিছুই মহান আল্লাহর উদ্দেশে নিবেদিত এবং কোরবানি হইতেছে সেই নিবেদনের একটি প্রতীক মাত্র। এই জন্য আমরা পশু কোরবানির সময় এই আয়াতটি পাঠ করিয়া থাকি, যাহার অর্থ হইল : ‘বলুন, নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ—(সকল কিছু) আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জন্য নিবেদিত। (সুরা আনআম, আয়াত-১৬৩ )।

আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পাশাপাশি সালাত, সিয়াম, হজ, জাকাত প্রভৃতি ইবাদতের অন্যতম লক্ষ্য সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা। কোরবানির ঈদের মাধ্যমেও এই সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়। এই জন্য কোরবানির মাংসের একটি বৃহৎ অংশ সমাজের দুস্থ ও অভাবগ্রস্ত মানুষের মাঝে বিতরণ করিবার যে বিধান রহিয়াছে, তাহা সুচারুভাবে পালন করা আমাদের কর্তব্য। ইহার পাশাপাশি এই পবিত্র দিবসে আমাদের নাগরিক দায়িত্বের প্রতিও সজাগ দৃষ্টি রাখা আবশ্যক। কোরবানির পর পশুর বর্জ্য যেইখানে-সেইখানে ফেলিয়া রাখিলে পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হয়, যাহা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। তাই কোরবানির পর রক্ত ও বর্জ্য দ্রুত পরিষ্কার করিয়া সেই স্থানে ব্লিচিং পাউডার বা জীবাণুনাশক ছড়াইয়া দেওয়া বাঞ্ছনীয়। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সহায়তার পাশাপাশি নিজ দায়িত্বে আমাদের চারিপার্শ্ব পরিচ্ছন্ন রাখিতে হইবে।

পরিশেষে, ত্যাগের যে মহিমান্বিত আদর্শ এই উৎসব আমাদের শিক্ষা দেয়, তাহা যেন কেবল এই একটি দিনেই সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং সমগ্র বৎসর আমাদের চিন্তা ও কর্মে প্রতিফলিত হয়। আমাদের মনে রাখিতে হইবে, ত্যাগ ব্যতীত কোনো সমাজ ও সভ্যতা বিনির্মাণ করা অসম্ভব। ঈদুল আজহার আত্মত্যাগের এই শিক্ষা ও আদর্শ বুকে ধারণ করিয়া বাস্তব জীবনে তাহা প্রতিফলিত করিতে পারিলে শান্তিপূর্ণ সামাজিক সহাবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব। পবিত্র এই ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষ্যে দেশবাসী ও সারা মুসলিম জাহানের প্রতি জানাই আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা—ঈদ মোবারক।