মো. মাহবুব হাসান শাহীন
আবহমান গ্রামবাংলার অঞ্চলবিশেষের জনজীবনে হাওর অবিচ্ছেদ্য এক নাম। হাওর শব্দটি উচ্চারিত হলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সমুদ্র অথই জলরাশি। হাওর শব্দটি সমুদ্র শব্দ থেকেই এসেছে। সমুদ্র শব্দের বিকৃত রূপ হাওর। হাওরের প্রকৃত রূপটি বর্ষাকালেই পুরোপুরি উদ্ভাসিত হয়। বর্ষার জলে হাওর মৌসুমে সমুদ্রের পেটের মতো ফুলে ওঠে। যতদূর চোখ যায় পানি আর পানি। যারা সমুদ্র দেখেনি তারা হাওরকে সমুদ্র মনে করে ভুল করতে পারেন। হুুমায়ূন আহমেদের নাটকের একটি চরিত্র কথা প্রসঙ্গে বলেছিল, ‘সমুদ্র দেখিনি, তবে সমুদ্রের চেয়ে বড়ো বড়ো হাওর দেখেছি।’
আমাদের দেশে ছোটো-বড়ো ৪১৪টি হাওর রয়েছে। এসব হাওরের মধ্যে সুনামগঞ্জে ১৩৩টি, হবিগঞ্জে ৩৮টি, মৌলভীবাজারে চারটি, সিলেটে ৪৩টি, কিশোরগঞ্জে ১২২টি, নেত্রকোনায় ৮০টি। এ ছাড়াও জলমহাল রয়েছে ২৮ হাজার, বিল ৬ হাজার ৩০০টি। হাওর অঞ্চলে বসবাস করে ২ কোটির ওপরে মানুষ।
হাওর অঞ্চল অসমতল। কোথাও খাল, কোথাও বিল, কোথাও আবার নদীর প্রবাহ। এমনি ভৌগোলিক রূপরেখায় গ্রাম থেকে গ্রাম বিচ্ছিন্ন। পাড়া বা মহল্লাগুলোকে কি বর্ষায় কি খরায় মনে হয় সাধারণ জনজীবনের সঙ্গে এদের কোনো সম্পর্ক নেই। বর্ষায় দূর থেকে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা পাড়া বা মহল্লাগুলো মনে হয় বিপন্ন শরণার্থী শিবির।
হাওরের নৈসর্গিক রূপ যেমন দৃষ্টিনন্দন, তেমনি আবার এর অবয়ব মানবেতর। পর্যটকদের মন কেড়ে নেয় হাওর, তারা এর রূপের গৌরবে উল্লসিত হন, কিন্তু তারা জানেন না এই রূপের আড়ালে যে জনমানবকে হাওর তার বক্ষে ধারণ করে আছে, তাদের জীবন কত মানবেতর; কত সংগ্রামমুখর। গুজরাটের ভয়াল বন্যায় ভারতের বিখ্যাত কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কবিতা লিখে ইন্দিরা গান্ধীকে সেই বন্যা দেখতে নিরুত্সাহিত করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন—‘প্রিয়দর্শিনী ইন্দিরা, বিমানের জানালায় চড়ে তুমি গুজরাটের বন্যা দেখতে যেও না/ এ বড় ভয়ংকর দৃশ্য/ মুখ ফসকে বেরিয়েও যেতে পারে—বাহ্্, কী সুন্দর!’ সুনীল অনুধাবন করতে পেরেছিলেন—এমনটি মুখ ফসকে বেরিয়ে গেলে তা হবে নিষ্ঠুর প্রকাশ, বন্যার্তদের প্রতি উপহাস।
বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলে পর্যটকদের ঢল নামে। বিশেষ করে, বর্ষা ও শীত ঋতুতে হাওরের রূপ-রস পান করতে পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে। তারা আনন্দ কুড়িয়ে ঘরে ফিরে। পেছনে পড়ে থাকে জমাটবাঁধা অন্ধকারে হাওর জনপদ।
হাওরের বেশিরভাগ মানুষ বর্তমান দেশের উন্ননের যে আলোকধারা সেই ধারা থেকে অনেকাংশেই বিচ্ছিন্ন, তবে তাদের মনোবল সুদৃঢ়। এই দৃঢ়তাই সংশ্লিষ্ট মানুষজনের জীবনে নিয়ামক শক্তি হিসেবে বর্তমান। দৃঢ় মনোবলের আরেকটি কারণ আছে। তা হলো হাওরবাসীর একতা, সাম্য আর সম্প্রীতি। হাওরের অফুরান জলের মতোই হাওরবাসীর বুকে অফুরান ভালোবাসা। জলের উত্তাল প্রবাহের কারণে হাওরে বাড়ি নির্মাণের ভিটি পাওয়া খুব সহজ বিষয় নয়। ফলে বিভিন্ন গোত্রের মানুষ একত্রে উঁচু ভিটি তৈরি করে এবং এক ভিটিতে মিলে মিশে তারা বসবাস করে। এক মায়ের পেটে অনেক ভাইবোনের জায়গা হয়। অথচ পরবর্তীকালে এক ভিটিতেও তাদের জায়গা হয় না। বাংলাদেশে এজাতীয় উদাহরণ এন্তার রয়েছে। হাওরের মানুষজনের মর্মমূলে সীমাহীন ভালোবাসা আছে বলেই বিভিন্ন গোত্রের মানুষ এক ভিটিতে বসবাস করে বা করতে পারে।
কিন্তু স্বাধীনতার মৌলিক স্বাদ বঞ্চিত এখনো হাওরের মানুষ। কৃষিভিত্তিক হাওরের জনজীবনে সংকট এখনো নিত্যদিনের সঙ্গী। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিত্সা, আশ্রয়, খাদ্য, যোগাযোগ কোনোটিই এখনো আলোকিত নয়। এমন কি দেশের অপেক্ষাকৃত অনুন্নত এলাকার সঙ্গেও তুলনা করা যায় না। তবে আশার কথা, সরকার হাওর অঞ্চলে কর্মরত সরকারি চাকুরেদের জন্য হাওরভাতা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এতে করে সংশ্লিষ্ট এলাকায় কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভেতর আসবে গণমুখী চেতনা, আসবে আন্তরিক সেবাদানের মানসিকতা। উপকৃত হবে হাওরের মানুষ, এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই।
শিক্ষার দিক থেকে হাওর অঞ্চল এখনো অনেক পিছিয়ে আছে। বেশির ভাগ ছেলেমেয়ে প্রাইমারি অতিক্রম করতে পারে না। প্রান্তিক পরিবারের ছেলেমেয়েরা প্রাইমারিতেও যায় না। যাবে কি করে? কখনো কাদাজলে হেঁটে, কখনো খেয়া নৌকায় ভেসে বাচ্চাদের স্কুলে যাওয়া সত্যিই কঠিন।
অশিক্ষা, অজ্ঞতা হাওর জনপদে অক্টোপাসের মতো জড়িয়ে আছে। ফলে তাদের ভেতর স্বাস্থ্যসচেতনতা শূন্যের কোঠায়। নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলার হাওর অঞ্চলে ৩৫ শতাংশ পরিবার স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহার করে। এখনো ৬৫ শতাংশ পরিবার ঝুলন্ত বা কাঁচা পায়খানা ব্যবহার করে। অনেকেই ঝোপঝাড়ের আড়ালে প্রাকৃতিক কর্ম সম্পন্ন করে। স্যানিটেশন বিজ্ঞানসম্মত না হওয়ায় দূষিত হচ্ছে পানি। হাওর জনপদে লেগেই আছে পানিবাহিত রোগ। কলেরা, টাইফয়েড, আমাশয়, কৃমি ও জন্ডিসের মতো রোগবালাই সারা বছরই দেখা যায় হাওরের কোনো না কোনো ঘরে। সঠিক চিকিত্সার অভাবে হাওর অঞ্চলে শিশু মৃত্যুর হার দেশের অন্যান্য এলাকা থেকে অনেক বেশি। হাওর এলাকায় ডাক্তার সহজলভ্য নয়। উপজেলা হাসপাতালগুলোয় ডাক্তারের পোস্ট শূন্য পড়ে থাকে। সেসব এলাকায় যেতে চায় না কেউ।
হাওরে বসবাসরত মানুষজন প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করেই বেঁচে আছে। বিশেষ করে বর্ষাকালে ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, সাইক্লোন হাওরের বেশিরভাগ ঘর-বাড়ি ভেঙে লন্ডভন্ড করে দেয়। ‘এ যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। এক গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ২০৫০ সাল নাগাদ হাওর অঞ্চলে পানির উচ্চতা প্রাক্বর্ষা মৌসুমে দশমিক ৩ থেকে দশমিক ৬ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। সুতরাং সময় থাকতেই হাওরে আনতে হবে পরিকল্পিত কর্মসূচি, যে কর্মসূচি হবে উন্নত পৃথিবীর পানিবেষ্টিত জনপদের মতো জীবনবান্ধব।
বাল্যবিয়ে হাওরের ঘরে ঘরে যেন এক কর্কট রোগ। যে মেয়েটির খেলার বয়স, স্কুলে বইখাতা নিয়ে পড়ালেখা করার বয়স এবং ক্রমে ক্রমে দীঘল চুলে বেণি বোনার মতো স্বপ্ন বোনার বয়স, সে বয়সেই হাওরের সিংহভাগ মেয়ের বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হচ্ছে। অল্প বয়সেই মা হয়ে তারা ভুগছে নানা রোগব্যাধিতে। যে সন্তান তার কোলে সেও অপুষ্টিতে আক্রান্ত। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে আইন নয়, মূলত শিক্ষার আলোই ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখতে পারে। অতএব, হাওরের শিক্ষাব্যবস্থা যে করেই হোক সম্প্রসারিত করতে হবে। হতাশার হাহাকার থেকে হাওরকে অবশ্যই বের করে আনতে হবে। কারণ, হাওর দেশের কোনো অভিশাপস্থল নয়। অপরিমের সম্ভাবনার স্থল।
‘মাছে ভাতে বাঙালি’ আজন্ম কালের প্রবাদ। দেশের মত্স্য সম্পদের একটি বড় অংশ হাওরেই উত্পাদিত। দেশের মোট মাছের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ জোগান দেয় হাওর। দেড় কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা মত্স্যসম্পদের ওপর নির্ভরশীল। ১৩ লাখ মানুষ সরাসরি মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল। রপ্তানি খাতের মধ্যে মত্স্য অন্যতম। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বেলায় মত্স্য খাত দ্বিতীয়। মত্স্যবিজ্ঞানীদের ভাষায়, হাওর হলো মাদার ফিসারি। এই মাদার ফিসারিতে মিঠা পানির মাছ আছে ১৫০ প্রজাতির। আছে ১২০ প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ। হাওরের একশ্রেণির মানুষ ঝিনুক ও শামুক সংগ্রহ করার কাজে নিয়োজিত থেকে জীবিকা নির্বাহ করে। তারা ঝিনুক ও শামুক থেকে মুক্তা সংগ্রহ করে। তবে বাস্তবতা হলো এই মুক্তা তারা পানির দরে বিক্রি করে। কারণ, এই মূল্যবান রত্নের যথাযথ বাজার তাদের নাগালের বাইরে। সরকার উদ্যোগ নিলে ঝিনুক ও শামুক থেকে মুক্তা সংগ্রহের পথ প্রশস্ত হতে পারে। বিশ্ববাজারে এই মুক্তা রপ্তানি করে সম্ভব হতে পারে বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন। পাশাপাশি মুক্তা সংগ্রহকারীদের জীবনে আসতে পারে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা। ঝিনুক-শামুকের নাড়ি-ভূড়িও ফেলনা নয়। মিলমালিকরা ঝিনুক-শামুকের নাড়ি-ভূড়ি থেকেই হাঁস-মুরগির খাবার তৈরি করে। ২০০৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয়ের এক সম্মেলনে যে অভিমত ব্যক্ত করা হয়, তাতে দেখা যায় ৪১১টি হাওরের মধ্যে ৪৬টি থেকেই বছরে ৭০০ কোটি টাকার ফসল উত্পাদন সম্ভব। হাঁস-মুরগি ও গবাদি পশুপালন করে হাওরের দরিদ্র মানুষ জীবিকার পথ ধরে আছে। সরকার এই খাত সম্প্রসারণে উদ্যোগ নিলে হাওরে অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার সিংহ দুয়ার খুলে যাবে। কৃষি বিন্যাস, ফার্মিং সিস্টেম প্রযুক্তি-নির্ভর করলে হাওরে উত্পাদিত পণ্য থেকে কৃষক ও সরকার দুপক্ষই লাভবান হবে। হাওরে আছে দাদন ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য। এদেরকেও প্রতিরোধ করতে হবে। প্রয়োজনে এদেরকে আনতে হবে আইনের আওতায়। তাহলে বাঁচবে কৃষক, হাসবে কৃষি। শীতের প্রারম্ভ থেকে হাওরে আসতে থাকে অতিথি পাখি। প্রায় ২০০ প্রজাতির অতিথি পাখির আগমনে পুরো শীতকাল হাওর অঞ্চলে বিরাজ করে এক অনির্বচনীয় সৌন্দর্য। ভূ-প্রকৃতিগত বৈচিত্র্যের কারণে অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিক থেকে সন্দেহ নেই এ দেশের হাওর অঞ্চল একটি অন্যতম জনপদ।
বর্তমান জনবান্ধব সরকার দেশের পর্যটনশিল্পের বিকাশে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। সরকারের সফল উদ্যোগে হাওর হতে পারে পর্যটন পিয়াসীদের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র। অর্জন হতে পারে এ শিল্প থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।
n লেখক :ডেপুটি সেক্রেটারি, মিনিস্ট্রি অব
পাবলিক সার্ভিস কমিশন