গ্রামের পরিকল্পিত উন্নয়ন চাই

জয়নুল আবেদীন স্বপন

 

বাংলা প্রবাদ ‘ডুমুরের ফুল’ অর্থাত্ অবাস্তব বস্তু। বিজ্ঞান বলে, ডুমুরেরও ফুল হয়। আর ফল তো সবাই দেখে।  রূপকথায় আছে, ভাগ্যবানরাই ডুমুরের ফুল দেখে। ডুমুরের ফুল দেখেছে এমন ভাগ্যবান লোক  চোখে না পড়লেও ভবিষ্যতে উন্নত বাংলাদেশ দেখবে এবং উন্নত বাংলাদেশে বসবাস করবে এ দেশের ভাগ্যবান মানুষ। উন্নত দেশের ফুল ফুটতে শুরু করেছে বাংলাদেশে। আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখলে উন্নত সুবিধা আমরাও ভোগ করব আশা রাখি।

দেশ উন্নত হলে আমার গ্রাম শহর হবে। গ্রামের রাস্তাঘাট, বিদ্যুত্, পানি ও গ্যাসসহ আধুনিক নগর সুবিধা পাবে গ্রামের মানুষ। গ্রামের ঘুমন্ত মানুষের জেগে ওঠার শুভদিন শীঘ্রই আসছে। মন্দকে প্রতিহত করে মর্যাদা ও সম্মান নিয়ে বাঁচতে চায় গ্রামের মানুষ। দেশের অগ্রগতির অন্যতম কারিগর গ্রামের কৃষক, যাদের পরিশ্রমে দেশের সভ্যতা টিকে আছে। হাজারো প্রতিকূলতার মধ্যে আশা পূরণের স্বপ্ন দেখে তারা। দেশের সুনাম অর্জনে কৃষকরাই এগিয়ে। কিন্তু দেশের চালিকাশক্তি এই কৃষকরাই কষ্টের সোনালি ফসল ঘরে তুলতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ধানের দেশে ধানের দাম কম। ধানের দামে খরচ না ওঠায় এক কৃষক রাগ করে কষ্টার্জিত নিজের জমিতে আগুন দিয়েছিল। তবু নিজেদের অধিকার আদায় করতে তারা আন্দোলনে যায়নি। নিচু এলাকায় বন্যায় ফসল তলিয়ে গেছে। চাষিরা পড়েছে বিপাকে। অনেকের বসতভিটা নদীতে বিলীন হয়েছে। সর্বগ্রাসী বন্যা অনেকের চাল-চুলো কেড়ে নিয়েছে। তারপরও থেমে নেই কৃষকের জীবনযাত্রা। সাহস ও ভরসা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। বেঁচে থাকার জন্য নতুন নতুন স্বপ্ন দেখে। দেশ উন্নত হোক, উন্নত দেশের ছোঁয়া গ্রামেও আসুক—এটা তাদের প্রত্যাশা। কৃষককে পিছনে রেখে দেশ উন্নয়ন সফল হবে না।

গ্রাম উন্নয়নের নামে গ্রামের সর্বনাশ করা যাবে না। পরিকল্পনা অনুযায়ী গ্রামের উন্নয়ন চাই। একদিকে উন্নয়নের ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে গ্রাম, অন্যদিকে বন ক্রমেই উজাড় হয়ে গ্রামের প্রকৃতি ধ্বংস হচ্ছে। গাছপালা কেটে প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট করা হচ্ছে। এতে জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি হচ্ছে। নদী-নালা, পুকুর ভরাট করে দখল করছে প্রভাবশালীরা। দখল হচ্ছে ফসলি জমি। ঢাকার আশেপাশে, বিশেষ করে গাজীপুরের ধানী জমিতে হচ্ছে অবৈধ কারখানা বেশি। কারখানার বর্জ্য ও বিষাক্ত বিষ কৃষকের জমিতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ধানী জমি নষ্ট করে অদৃশ্য শক্তির বলে শত শত ইটভাটা তৈরি হচ্ছে। ঘন বসতিপূর্ণ লোকালয়েও ইটভাটা নির্মাণ হচ্ছে। ইটভাটার বিষাক্ত গ্যাস ও কালো ধোঁয়ার প্রভাবে ধান নষ্ট হচ্ছে, মৌসুমি ফলের মুকুল ও গুটি ঝরে যাচ্ছে।

অপরিকল্পিত উন্নয়ন নয়, উন্নয়ন চাই পরিকল্পনা অনুযায়ী। গ্রামের উন্নয়ন চাই, তাই বলে কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট নতুন দুর্যোগ চাই না। দেশে পরিকল্পিতভাবে শিল্পায়ন হোক। আমাদের বিবেক ও মনুষ্যত্বকে জাগিয়ে তুলতে কাজের জবাবদিহিতা থাকতে হবে। শেষ ভালো যার সব ভালো তার। গ্রামে কৃষকের ফসলি জমি, পুকুর, নদী-নালা, খাল-বিল, প্রাকৃতিক বন ও জনবসতি ঠিক রেখে গ্রাম উন্নয়ন করতে হবে। কৃষকরা যাতে শৃঙ্খলাপূর্ণ নাগরিক সুবিধা ভোগ করে সে লক্ষ্যেই হোক গ্রাম উন্নয়ন। গ্রামের সৌন্দর্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা পরিবেশবান্ধব গ্রামের সুষম উন্নয়ন চাই। বাস্তব জীবন আনন্দময় হোক—এটা সবারই কাম্য। জনবসতি হুমকিতে পড়ে এমন অনিয়ম আমরা দেখতে চাই না।

গাজীপুর