বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়েছে গোটা বিশ্বে। তবে এই মেগা ইভেন্টের আড়ালে অন্যতম আয়োজক দেশ মেক্সিকোয় মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে এক অন্ধকার জগৎ। মেক্সিকোয় বিশ্বকাপ দেখতে যাওয়া লাখ লাখ বিদেশি পর্যটক ও ফুটবলপ্রেমীদের আগমনকে কেন্দ্র করে দেশটিতে মানবপাচার এবং জোরপূর্বক যৌন বাণিজ্যের বাজার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে।
মেক্সিকোর অন্যতম শীর্ষ জাতীয় দৈনিক ‘মিলেনিও’ এ নিয়ে একটি চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। মিলেনিওর খবরে বলা হয়েছে, কুখ্যাত মাদক কার্টেল এবং অপরাধী চক্রগুলো আসন্ন বিশ্বকাপকে তাদের অবৈধ আয়ের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে।
এবারের বিশ্বকাপে মেক্সিকো মোট ১৩টি ম্যাচ আয়োজন করবে। খেলাগুলো অনুষ্ঠিত হবে দেশটির তিনটি প্রধান শহর মেক্সিকো সিটি, গুয়াদালাহারা ও মন্তেররেইয়ে। মেক্সিকোর অপরাধবিষয়ক গবেষকদের মতে, এই তিনটি প্রধান শহরের যৌন বাণিজ্যের রুটগুলো এখন সম্পূর্ণভাবে অপরাধী সংগঠনগুলোর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।
গুয়াদালাহারা শহরটি মূলত হালিস্কো নিউ জেনারেশন কার্টেলের (সিজেএনজি) মূল ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এবং সেখানে স্বাধীনভাবে কোনো কিছু করার সুযোগ নেই বললেই চলে। সেখানকার যৌনকর্মীদের নিয়মিত এই কার্টেলকে নির্দিষ্ট অংকের ফি বা চাঁদা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। অন্যদিকে, মন্তেররেইয়ে আধিপত্য বিস্তার করছে নর্থইস্ট কার্টেল এবং সিনালোয়া কার্টেল। বিশেষ করে শহরের বারিও আন্তিগুয়ো এলাকায় তাদের সঙ্গী প্রদানকারী পরিষেবা ও বারের ব্যবসা এখন রমরমা হয়ে উঠেছে।
রাজধানী মেক্সিকো সিটিতে মানবপাচারের চিত্র আরো বেশি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। শহরের দক্ষিণ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে ভেনিজুয়েলার কুখ্যাত গ্যাং ত্রেন দে আরাগুয়া এবং স্থানীয় ত্লাহুয়াক কার্টেল। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় ও পূর্ব অঞ্চলে সক্রিয় রয়েছে সিজেএনজি ও সিনালোয়া কার্টেল। মেক্সিকোর আরেক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘অ্যানিমেল পলিটিকো’-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বকাপ সামনে রেখে দেশটির ১০টি শীর্ষ অপরাধী চক্রের মধ্যে ৯টিই এখন জোরপূর্বক দেহ ব্যবসা বা পতিতাবৃত্তি থেকে বিপুল পরিমাণ মুনাফা লুটছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক ব্যবসার পাশাপাশি মানবপাচার এখন মেক্সিকান কার্টেলগুলোর অন্যতম প্রধান আয়ের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য অনুযায়ী, এই কালোবাজারি ব্যবসার বৈশ্বিক মূল্য বছরে প্রায় ৯৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২ লাখ ১৭ হাজার ১৩ কোটি টাকার সমান। অ্যানিমেল পলিটিকো তাদের প্রতিবেদনে আরও দাবি করেছে যে, মাদক চক্রগুলো নারীদের শুধু যৌন কাজেই বাধ্য করছে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে তাদের জিম্মি করে মাদক পাচার এবং প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপের ওপর নজরদারির মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করাতেও বাধ্য করছে। বিশ্বকাপের ফুটবল রোমাঞ্চের আড়ালে মেক্সিকোর এই অন্ধকার চিত্র এখন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্যও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।