আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবৎসরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে এক অভূতপূর্ব ও নজিরবিহীন বরাদ্দের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হইয়াছে, যাহা দেশের সর্বস্তরের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করিবে বলিয়া আশা করা যাইতেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই খাতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ প্রায় ১ লক্ষ ৩০ হাজার কোটি টাকা স্পর্শ করিতে চলিয়াছে, যাহা মোট বাজেটের প্রায় ১৪ শতাংশ (এই বার বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হইয়াছে প্রায় ৯ লক্ষ ৩০ হাজার হইতে ৯ লক্ষ ৩৮ হাজার কোটি টাকা)। বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দা ও মূল্যস্ফীতির তীব্র চাপের মুখে দাঁড়াইয়া সরকার যে দেশের দরিদ্র, নিম্ন আয়ের মানুষ ও গৃহিণীদের অগ্রাধিকার দিয়া এই কল্যাণমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করিয়াছে, তাহা নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। বিশেষ করিয়া 'ফ্যামিলি কার্ড', 'কৃষক কার্ড', দেশব্যাপী স্থানীয় সরকার ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে 'খাল খনন' এবং 'বৃক্ষরোপণ'-এই চারটি মেগা ফ্ল্যাগশিপ কর্মসূচি গ্রামীণ অর্থনীতিতে সরাসরি অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখিবে বলিয়া প্রতীয়মান হয়।
তবে বাজেটের এই বিশালত্ব যতই চমকপ্রদ হউক না কেন, উহার প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা ও নির্ভুল লক্ষ্য নির্ধারণের ওপর। পত্রিকান্তরে প্রকাশ, নারীপ্রধান ৪১ লক্ষ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনিয়া প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা সরাসরি 'জিটুপি' (গভর্নমেন্ট টু পারসন) পদ্ধতিতে প্রেরণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হইয়াছে। অন্যদিকে, প্রকৃত প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষিদের জন্য সমন্বিত ডাটাবেজ তৈরির মাধ্যমে 'কৃষক কার্ড' চালুর উদ্যোগ কৃষি উৎপাদনে এক অভিনব গতি সঞ্চার করিবে। কিন্তু এই নজিরবিহীন বরাদ্দের বিপরীতে অর্থনীতিবিদ ও গবেষকগণের প্রকাশ করা গভীর সংশয়কেও আমলে নিতে হইবে। তাহাদের মতামতকে উপেক্ষা করিলে চলিবে না, যেমন- বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির এক জরিপ অনুযায়ী, বর্তমান সামাজিক সুবিধার তালিকায় এখনো প্রায় ১৮ শতাংশ অযোগ্য মানুষ রহিয়াছেন, পক্ষান্তরে বহু প্রকৃত হকদার এই সুবিধা হইতে বঞ্চিত রহিয়াছে। স্থানীয় প্রশাসনের স্বচ্ছতার অভাব এবং রাজনৈতিক প্রভাবই ইহার প্রধান অন্তরায় বলিয়া চিহ্নিত হইয়াছে। তাই এই ব্যাপারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে। যাহাতে প্রকৃত অসচ্ছল ও অসহায় ব্যক্তিগণ এই সুবিধা পায়, তাহা সর্বান্তঃকরণে নিশ্চিত করিতে হইবে।
নিঃসন্দেহে সামাজিক সুরক্ষা খাতে ইহা এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। ইহার পাশাপাশি ওএমএস ও টিসিবির খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির পরিধি বৃদ্ধি এবং বয়স্ক, বিধবা, স্বামী নিগৃহীতা ও প্রতিবন্ধী ভাতাসহ মোট ১৮টি প্রধান কর্মসূচির বিস্তার সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের উপকারভোগীর সংখ্যা ২ কোটি ৬০ লক্ষ হইতে ৩ কোটি ৬৩ লক্ষে উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নীত করিবে। ইহা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। আরো আশার খবর হইল, এই বার কামার, কুমার, তাঁতি ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করিতে 'ক্রিয়েটিভ ইকোনমি' কর্মসূচির ন্যায় দূরদর্শী উদ্যোগও এই বাজেটে স্থান পাইয়াছে। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের প্রাজ্ঞ অর্থনীতিবিদগণের গঠনমূলক পরামর্শও অনুধাবন করিতে হইবে। তাহারা ইতিমধ্যে যথার্থই বলিয়াছেন যে, বর্তমানের ১৫০-১৬০টি বিক্ষিপ্ত ক্ষুদ্র কর্মসূচি হইতে বাজেট সংকুচিত করিয়া কেবল গুরুত্বপূর্ণ পাঁচ-ছয় বা ১০টি প্রধান কর্মসূচির উপর জোর দিলে সুফল নিশ্চিত করা সহজতর হইবে। কেননা বহুবিধ ও বিক্ষিপ্ত ক্ষুদ্র কর্মসূচিগুলি অনেক সময় তদারকি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনাকে আরো জটিল করিয়া তোলে।
অতএব, এই বিশাল জনকল্যাণমূলক বাজেটের সফল বাস্তবায়নে সরকারকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কঠোর হস্তে দমন করিতে হইবে। নতুন কার্ড বিতরণে নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে ডিজিটাল ডাটাবেজের ব্যবহার নিশ্চিত করা আবশ্যক। অন্যথায় এই বিপুল বরাদ্দের এক বড় অংশ অপচয় হইবার আশঙ্কা থাকিয়া যায়। একই সঙ্গে কর ফাঁকি রোধ করিয়া কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আহরণ করা না গেলে, ব্যাংক ঋণের ওপর সরকারের অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করিতে পারে। সরকার যদি এই সকল চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সহিত কর্মসূচিগুলি মনিটর করিতে পারে, তাহলেই এই সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনী দেশের দরিদ্র মানুষের জন্য প্রভূত কল্যাণ বহিয়া আনিবে বলিয়া আমরা বিশ্বাস করি।