বিশ্ব আজ প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও বিজ্ঞানের এক অভূতপূর্ব অগ্রগতির যুগে প্রবেশ করিয়াছে। মানবসভ্যতা একদিকে যেমন উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির নূতন নূতন শিখর স্পর্শ করিতেছে, অন্যদিকে তেমনি ক্রমেই গভীরতর হইয়া উঠিতেছে এক নীরব সংকট। ফলে বিশ্ব জুড়িয়া মানসিক স্বাস্থ্য পরিণত হইয়াছে এক গভীর উদ্বেগের বিষয়ে। চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী দ্য ল্যানসেটে সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গিয়াছে, ২০২৩ সালে বিশ্বে প্রায় ১২০ কোটি মানুষ বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ছিলেন, যাহা ১৯৯০ সালের তুলনায় ৯৫ দশমিক ৫ শতাংশ অধিক। উদ্বেগ ও বিষন্নতার বিস্তৃত এই মানসিক সমস্যার পরিসংখ্যান কেবল বিশ্ববাসীর জন্য সতর্কবার্তাই নহে; ইহা সমাজ, অর্থনীতি ও মানবিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ লইয়াও উত্থাপন করিয়াছে এক গভীর প্রশ্ন।
গবেষকগণ বলিতেছেন, এই সংকটের সবচেয়ে বড় অভিঘাত পড়িতেছে তরুণ প্রজন্মের ওপর। কৈশোর ও তরুণ বয়সে মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠন এবং ভবিষ্যৎ জীবনদর্শন নির্মাণের এই গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে মানসিক সমস্যার উদ্ভব ঘটিলে তাহা কেবল সাময়িক অস্বস্তিই সৃষ্টি করে না; অধিকন্তু শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন, পারিবারিক সম্পর্ক এবং সামাজিক অংশগ্রহণের ওপরও ফেলিতে পারে দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব। অনেক ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণে দুর্বলতা, একাকিত্ববোধ, মাদকাসক্তি কিংবা আত্মবিধ্বংসী প্রবণতার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ, মানসিক স্বাস্থ্যসংকটকে ব্যক্তিগত দুর্বলতা বা সাময়িক সমস্যা বলিয়া উপেক্ষা করিবার কোনো সুযোগ নাই।
প্রশ্ন হইল, মাত্র দুই যুগের ব্যবধানে বিশ্ব জুড়িয়া মানসিক সমস্যার এমন উর্ধ্বগতি কেন? মূলত কোভিড-১৯ মহামারির অভিঘাতের পর এই সংকট প্রকটতর হইতে থাকে দ্রুত গতিতে। ইহার মধ্যেই বিশ্ব প্রবেশ করে যুদ্ধবিগ্রহের অন্ধকারময় যুগে। ফলে দীর্ঘদিনের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ লইয়া দুশ্চিন্তা-বিশেষত মানুষের মানসিক স্থিতিশীলতাকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করিয়া দেয়। সাম্প্রতিক বৎসরগুলিতে আমরা কি ইহাই প্রত্যক্ষ করিতেছি না? বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক সংঘাতই কি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর অধিক নেতিবাচক প্রভাব ফেলিতেছে না? যুদ্ধ-সংঘাত কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের মানুষের জীবনকেই বিপর্যস্ত করে নাই; বরং প্রচলিত গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ প্রতিনিয়ত ধ্বংসযজ্ঞ, প্রাণহানি ও মানবিক বিপর্যয়ের সংবাদ প্রত্যক্ষ করিয়া একধরনের ট্রমার ভিতর ঢুকিয়া গিয়াছে। যুদ্ধজনিত অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি ও খাদ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদ্বেগ এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি মানুষের মানসিক চাপকে ব্যাপকভাবে বাড়াইয়া তুলিয়াছে। বিশেষত শিশু ও তরুণদের কোমল মনমানসিকতায় গ্রাস করিতেছে ভয়, উদ্বেগ ও হতাশার কালো থাবা। দীর্ঘ মেয়াদে সামাজিক স্থিতিশীলতা ও মানবিক বিকাশের পথে ইহা নিঃসন্দেহে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা।
আশার কথা হইল, উন্নত বিশ্বের অনেক দেশ ইতিমধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যকে জনস্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করিতে শুরু করিয়াছে। বিভিন্ন দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ করা হইয়াছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা কর্মক্ষেত্রে মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করিবার জন্য বিশেষ নীতি গ্রহণ করিতেছে অনেক দেশ। পাশাপাশি মানসিক রোগ সম্পর্কে পরিচালিত হইতেছে জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি। আমরাও কি সেই পথে হাঁটিতে পারি না?
বাংলাদেশের ন্যায় উন্নয়নশীল দেশসমূহের জন্য এই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। উন্নয়নশীল বিশ্বে মানসিক স্বাস্থ্য এখনো অনেকাংশে উপেক্ষিত একটি ক্ষেত্র। অথচ বিশেষজ্ঞ মহলের দাবি হইল, মানসিক স্বাস্থ্য কেবল ব্যক্তিগত বিষয় নহে; ইহা একটি জাতীয় উন্নয়ন-সংশ্লিষ্ট প্রশ্নও বটে। আজিকার তরুণ প্রজন্ম যদি উদ্বেগ, বিষণ্ণতা ও মানসিক অস্থিরতার ভারে ন্যুজ হইয়া পড়ে, তাহা হইলে ভবিষ্যতে সমাজ, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রও তাহার নেতিবাচক প্রভাব হইতে মুক্ত থাকিবে না। অতএব, আমরা বলিতে পারি, একটি জাতির উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো, প্রযুক্তি কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উপর নির্ভর করে না: ইহা মানুষের মানসিক সুস্থতার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিশ্ব যখন এক নীরব মানসিক স্বাস্থ্য মহামারির মুখোমুখি, তখন সকল বয়সের মানুষের জন্য নিরাপদ, সহানুভূতিশীল ও মানসিকভাবে সুস্থ সমাজ গঠনে রাষ্ট্র, পরিবার ও নাগরিক সমাজকে সম্মিলিতভাবে আগাইয়া আসিতে হইবে।