হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমছে না। যদিও স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও চিকিৎসকরা বলছেন, আক্রান্তের সংখ্যা কমে এসেছে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। ঈদের আগেও প্রতিদিন হাজারের ওপরে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল; ঈদের পরও হামে আক্রান্তের সংখ্যা হাজারের ওপরই রয়েছে। গতকাল সোমবার আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৯২ জন, রবিবার আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ২২১ জন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, ২ থেকে ৩ সপ্তাহের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা কমে আসবে। আর যাদের মৃত্যু হচ্ছে, তারা আগেই হাম আক্রান্ত হয়েছিল এবং পরে সেকেন্ডারি জটিলতা হিসেবে নিউমোনিয়া বা অন্যান্য জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে আসছে এবং অনেকের মৃত্যু হচ্ছে। তবে জনস্বাস্থ্যবিদ বলছেন, হামের টিকার কাভারেজ ৯৫ ভাগের কম হলে সংক্রমণ হতেই থাকবে।
এদিকে গতকাল রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে হামের দুইটি ওয়ার্ড সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়—ভর্তি থাকা ৩০ রোগীর মধ্যে একজন মাত্র সম্প্রতি দেওয়া হামের টিকা পেয়েছে। বাকি ২৯ শিশুর মধ্যে এক জন তিন মাস বয়সের শিশু ছিল, আর ২৮ শিশুর কেউ টিকা নেয়নি।
শিশুদের সঙ্গে থাকা অভিভাবকরা জানান, তারা টিকার প্রচারণা শোনেননি, কেউ বলছেন, বাচ্চা অসুস্থ ছিল, কেউ-বা বলেছেন, ‘আমার বাচ্চার বয়স মাত্র ছয় মাস হয়েছে টিকা দেওয়া যাবে কি না জানি না। কেউ-বা বলছেন, টিকা কেন্দ্র গেলে স্বাস্থ্যকর্মীরা বলেন, এখন টিকা নেই, পরে আসেন—এমন বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য পাওয়া যায়।’
রাজধানীর কেরানীগঞ্জ থেকে ৮ মাস ১১ দিন বয়সি উম্মে আনাবিয়াকে নিয়ে ৭ নম্বর বেডে আছেন মা হ্যাপি। তিনি বলেন, টিকা পাইনি। তিনি বলেন, ‘টিকার কোনো ক্যাম্পেইন আমরা শুনিনি। প্রতি মাসের সোমবার আয়শা হসপিটালের ভেতরে টিকা দেওয়া হয়, আমরা গিয়েছিলাম, তারা বলেছে হামের টিকা নেই।’
এদিকে হাফসা বেগম এসেছেন ভোলা থেকে ছেলে আয়মানকে নিয়ে। শিশুটির বয়স ১১ মাস। ৯ মাসে টিকা দেওয়া হয়। এর তিন দিন পর থেকে জ্বর, ঠান্ডা-লাগা শুরু হয়, তিনি জানান বাচ্চা বার বার নিউমোনিয়া আক্রান্ত হচ্ছে। ২৫ নম্বর বেডে আছে আয়মান।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, টিকার কাভারেজটা ভালোমতো হয়নি। টিকাদান কার্যক্রম যখন শুরু হয়, তখনই আমরা বলেছিলাম—যথেষ্ট প্রচার-প্রচারণা ছাড়াই যেভাবে টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে, তাতে ৯৫ ভাগ কাভারেজ পাওয়াই কঠিন। কারণ এটা অন্য টিকার মতো না যে, কাভারেজ কিছু কম হলেও কাজ হবে। হামের টিকার কাভারেজ ৯৫ ভাগের কম হলে এর সংক্রমণ হতে থাকবে, আর এবার সেই ঘটনাটাই ঘটেছে।
এই জনস্বাস্থ্যবিদ বলেন, ‘কারণ এই টিকাটা তো সাধারণ টিকার মতো না। হামের টিকা ৯ মাসে এবং ১৫ মাসে দেওয়া হয়। কিন্তু এই টিকা তো দেওয়া হচ্ছে ছয় মাস থেকে, তাহলে বয়স পরিবর্তন হয়েছে। আবার দেওয়া হচ্ছে ৫৯ মাস পর্যন্ত, তার মানে ১৫ মাসেরও পরিবর্তন হয়েছে। এই যে পরিবর্তনগুলো—তা অনেক মা জানেন না, কেননা তাদের জানানোর জন্য পর্যাপ্ত প্রচার-প্রচারণা হয়নি। দ্বিতীয়ত, অভিভাবকদের দ্বিধা থাকবে—যে ৯ মাসের জায়গায় ৬ মাসে টিকা দেব, কোনো ক্ষতি হবে না তো! কিংবা ৯ মাসের জায়গায় ৫৯ মাসে টিকা দেব—আমার বাচ্চার কোনো ক্ষতি হবে না তো! এই বিষয়গুলো যদি আগে থেকে রেডিও, টিভি, মাইকিং, স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারণা করত, তাহলে আমাদের এই হাই কাভারেজটা পাওয়ার সম্ভাবনাটা ছিল। আমার ধারণা বহু পকেট রয়েছে—যেখানে ৯৫ ভাগ কাভারেজ পাওয়া যায়নি। তার ফলেই ভাইরাসের সংক্রমণ থামানো যাচ্ছে না।’
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. আতিকুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, নতুন করে আক্রান্ত কমে গেছে। এই হাসপাতালে চাপ কমা মানে সবখানেই রোগীর চাপ কমেছে। আগে যারা আক্রান্ত হয়েছে, তারাই জটিলতা নিয়ে এখন আসছে। যেমন ডায়রিয়া, ঠান্ডা-শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, সেফসিস, র্যাশ বেশি হয়েছে, চামড়া উঠে যাচ্ছে এসব সমস্যা নিয়ে আসছে। তবে নতুন আক্রান্ত খুব কম রোগী আসছে বলে জানান। এটা সরকারের টিকার সুলফ বলা যায় বলে জানান এই শিশু বিশেষজ্ঞ। তিনি জানান, ‘হামের জটিলতা দুই সপ্তাহ তিন সপ্তাহ পরও হয়। হাম ভালো হওয়ার পর চার থেকে ছয় সপ্তাহ শিশুর ইমিউনিটি কম থাকে, তখন বিভিন্ন ধরনের জটিলতা দেখা দেয়। আশা করছি তিন থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে হামের নতুন-পুরাতন সব রোগীও কমে যাবে। দু-একটা থাকতে পারে। সেটা তো সব রোগের ক্ষেত্রেই থাকে। তবে মহামারি আকারে থাকবে না। আমাদের দেশে অনেক অসচেতন অভিভাবক আছেন, যারা শিশুকে টিকা দিতে নিয়ে যান না। সবার সচেতন হওয়া উচিত। হামের পর তিন থেকে ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত হাই প্রোটিন খাবার খাবে।’
টিকা বিশেষজ্ঞ ও সরকারের ইপিআই কর্মসূচির সাবেক প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. তাজুল ইসলাম এ বারি ইত্তেফাককে বলেন, ইমিউনিটি তৈরি হতে সময় লাগে। কে কখন টিকা পেয়েছে, তার ওপর ইমিউনিটি পাওয়াটা নির্ভর করে। ইমিউনাইজেশন করা হয়েছে, তবে শিশুদের ইউমিউনিটি পাওয়ার যে সময়, সেটা এখনো পার হয়নি। হার্ড ইমিউনিটি না হওয়া পর্যন্ত আক্রান্ত থাকবে। তিনি বলেন, যে কোনো ভাইরাস সংক্রমণের পর প্রাকৃতিকভাবে অথবা সংশ্লিষ্ট রোগে আক্রান্ত হওয়ার আগে টিকা গ্রহণের মাধ্যমে মানবদেহে অ্যান্টিবডি তথা রোগ-প্রতিরোধ তৈরি হয়। মিজেলস ভাইরাসের (হাম) ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে প্রাকৃতিকভাবে অ্যান্টিবডি (রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা) তৈরি হলে রোগটি সারা জীবনে আর হয় না।
গত ২৪ ঘণ্টায় হাম পরিস্থিতি :দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গে আরো আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গে, আর একজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে নিশ্চিত হামে। এ নিয়ে দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মোট মৃত শিশুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২৮ জনে। এর মধ্যে ৫৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে এবং ৯২ জনের মৃত্যু হয়েছে নিশ্চিত হামে।