সুস্বাস্থ্যের মৌলিক ভিত্তি

ইংরাজি ‘হেলথ’ (Health) অথবা বাংলায় স্বাস্থ্য বা সুস্বাস্থ্য শব্দটির উত্পত্তি হয়েছে মূল শব্দ ‘হোল’ (whole) বা সমগ্র থেকে। মানুষ স্বাস্থ্যবান তখনই হয় যখন তারা শরীর, মন ও শক্তির মধ্যে পূর্ণতা অনুভব করেন। বহু মানুষ চিকিত্সাশাস্ত্রের মাপকাঠিতে স্বাস্থ্যবান হলেও অন্তরের ভালো থাকাকে অনুভব করেন না।

সমগ্রতা অনুভবের জন্য অবশ্যই ব্যক্তির শরীর, মন ও শক্তিকে অভ্যন্তরীণ তীব্রতার একটি নির্দিষ্ট স্তরে সক্রিয় থাকতে হবে। চিকিত্সাশাস্ত্রের বিচারে কোনো মানুষ স্বাস্থ্যবান হলেও তার শক্তিসমূহ উদ্যমহীন হয়ে থাকতে পারে। অন্য কথায়, জীবনের পরিস্থিতিগুলো যেভাবে ঘটা উচিত, কেন সেভাবে ঘটছে না, সেটি কোনো মানুষের বোধ্যগম্য নাও হতে পারে। এর কারণ হলো—মানুষ অন্তস্থ তার শক্তিকে ভালো রাখার দায়িত্ব নিচ্ছেন না। 

জীবনে যা কিছু দৈহিক অথবা মনস্তাত্ত্বিক পরিস্থিতি আপনি অনুভব করেন, মূলগতভাবেই তার প্রতিটির একটি শক্তির ভিত্তি আছে, রাসায়নিক ভিত্তি হিসেবেও যা প্রকাশিত হয়। এক অর্থে, আধুনিক অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ রসায়ন ছাড়া আর কিছুই নয়। আপনার শরীরের কোনো সমস্যা হলে সেটাকে কিছুটা স্থিতিশীল অবস্থায় নিয়ে আসার জন্য আপনি ওষুধ গলাধঃকরণ করছেন, যা কি না আদতে একটি রাসায়নিক। স্বাস্থ্য সমস্যার সুরাহা করতে আপনি যদি রাসায়নিক ব্যবহার করেন, তার একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকবেই। এই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার জন্য একটি প্রতিষেধক আছে। এই প্রতিষেধকের জন্য আরো একটি প্রতিষেধক আছে। এ এক অন্তহীনচক্র।

আপনার শরীরে রসায়নের স্তরে যা কিছু ঘটছে তা নিয়ন্ত্রিত হয় আপনার শক্তির ক্রিয়াশীলতার দ্বারা। কিছু মানুষের শরীরে অতিরিক্ত অ্যাসিড থাকে বলেই আপনি তাদের ক্ষার জাতীয় ওষুধ দেন; কিন্তু কেন তাদের শরীরে অতিরিক্ত অ্যাসিড থাকে? তাদের মন, শরীর এবং সর্বোপরি তাদের শক্তি যেভাবে ক্রিয়াশীল হয়, সেটিই এর কারণ।

যোগে যখন আমরা স্বাস্থ্যের কথা বলি তখন শরীর বা মনের দিকে তাকাই না, শক্তিকে নিয়ে কথা বলি। যদি আপনার প্রাণ শরীরে সঠিক ভারসাম্য এবং পর্যাপ্ত প্রবাহ থাকে, আপনার ভৌত (শরীর) এবং মানসিক শরীরটিও পুরোপুরি সুস্থ থাকবে। এটা রোগ সারানোর বিষয় নয়, এটা হলো শক্তিতন্ত্রকে স্থিত এবং সক্রিয় করার জন্য যৌগিক অনুশীলনের মৌলিক ভিত্তি তৈরি করা, যার ফলস্বরূপ আপনার শরীর ও মন স্বাভাবিক ভাবেই সুন্দর থাকে।  

সংক্রামক ব্যাধি এবং দুরারোগ্য ব্যাধির তফাত বোঝাটা জরুরি। সংক্রমণের চিকিত্সা ওষুধের মাধ্যমে করা যেতে পারে; কিন্তু দুরারোগ্য বা ক্রনিক রোগের ক্ষেত্রে মূল কারণটি সর্বদাই থাকে প্রাণ-শরীরের মধ্যে। প্রাণময়কোষ বা প্রাণ-শরীরকে স্থিত ও সক্রিয় করার জন্য মানুষ যদি নির্দিষ্ট কিছু সাধনায় ইচ্ছুক হন, নিশ্চিতভাবেই তারা দুরারোগ্য ব্যাধির হাত থেকে মুক্তি পেতে পারেন।

এটা ঠিকই যে, কোনো মানুষই নিখুঁত পরিবেশে বাস করেন না। জীবনযাত্রার চাপ, যে খাবার খাই, যে বায়ুতে শ্বাস নিই, যে জল পান করি—এসবই অনেক রকম ভাবে আমাদের প্রভাবিত করতে পারে। বাইরের জগতের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ যত বেশি হয়, আমাদের শরীরের রাসায়নতন্ত্র ভারসাম্যহীন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তত বৃদ্ধি পায়; কিন্তু আমাদের দেহতন্ত্রের মধ্যে শক্তি যদি সঠিক ভাবে চর্চিত হয়, এই উপাদানগুলির প্রভাব বেশি পড়তে পারে না।

ধরা যাক, আপনি বিদ্যুতের বিষয়ে কিছুই জানেন না। এখন আমি যদি আপনাকে বলি যে, শুধু একটি বোতাম টিপলেই গোটা ঘরটাই আলোয় ভেসে যাবে, আপনি কি আমাকে বিশ্বাস করবেন? না। এবার

আমি এটা করলাম আর আলো এসে গেল। আপনি এটাকে অলৌকিক ঘটনা বলবেন। এর সহজ কারণ হলো—বিদ্যুত্ কীভাবে কাজ করে আপনি বোঝেন না। একইভাবে, জীবনের ঘটনা নানা রকম ভাবে ঘটে; কিন্তু আপনি নিজেকে শুধু ভৌত অনুভব এবং যুক্তিবাদী ভাবনার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছেন—সমস্যা সেখানেই।

এই মুহূর্তে চিকিত্সা বিজ্ঞান কেবল ভৌত শরীরটিকে জানার মধ্যেই সীমিত হয়ে গেছে। তার বাইরে যদি কিছু ঘটে, তাকে আপনি অলৌকিক বলেন। আমি শুধু এটাকে বিজ্ঞানের অন্য একটি মাত্রা বলি। আপনার প্রাণশক্তি আপনার সম্পূর্ণ শরীরতন্ত্রটিকে তৈরি করেছে। তাহলে প্রাণশক্তি কি শরীরতন্ত্রের একটা ত্রুটিকে ঠিক করতে পারে না? যদি আপনার শক্তিকে পর্যাপ্ত প্রবাহে এবং সঠিক ভারসাম্যে রাখতে পারেন, সেক্ষেত্রে এটা নিছক সুস্থ থাকার চেয়ে অনেক বেশি কিছু করতে সক্ষম হবে।

n সৌজন্যে : ঈশা ফাউন্ডেশন