আফসানা রিজোয়ানা সুলতানা
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য অনেকটা দায়ী। আমাদের দেশের দক্ষিণে রয়েছে বঙ্গোপসাগর। তারই প্রভাবে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, টর্নেডো, সাইক্লোন বা জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা ও মহামারিতে দেশের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়।
সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে আর একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেশ দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেটি হলো বজ্রপাত। প্রায় প্রতি বছরই কালবৈশাখী ঝড়ের সঙ্গে দেশে বজ্রপাতের কারণে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে।
সাধারণত ঋতু পরিবর্তনের সময় বায়ুমণ্ডলে এক ধরনের অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। এসময় বায়ুমণ্ডলে বাতাসের তাপমাত্রা ভূ-ভাগের উপরিভাগের তুলনায় কম থাকে। তখন জলীয়বাষ্প ও মেঘের কণার মধ্যে এক ধরনের ঘর্ষণের ফলে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক আয়নের সৃষ্টি হয়। এর ফলে ঐ এলাকার ওপর বজ্রমেঘ সৃষ্টি হতে থাকে। এটি যখন তীব্র হতে থাকে তখন এটি নিচে চলে আসায় বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে।
পৃথিবীর অন্যসব দেশের তুলনায় বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বাংলাদেশেই বেশি। বিশ্বে বজ্রপাতে মৃত্যুর এক চতুর্থাংশই ঘটে বাংলাদেশে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সেফটি ইনস্টিটিউটের ২০১০ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ পরিসংখ্যান উল্লেখ করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ১৭ মে ২০১৬ বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়।
আমরা একটু পিছনের দিকে তাকালে দেখতে পাব যে প্রতি বছর কত লোক মারা যাচ্ছে ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগটির কারণে। গত পাঁচ বছরে বজ্রপাতে মৃতের সংখ্যা ১১৬১। এর মধ্যে ২০১১ তে ১৭৯ জন, ২০১২ তে ৩০১ জন, ২০১৩ তে ২৮৫ জন, ২০১৪ তে ২১০, ২০১৫ তে ২৮৫ জন, ২০১৬ সালে ৩৫০ জন, ২০১৭ সালে ২৬৭ জন বজ্রপাতে মারা গেছেন। কিন্তু আমরা একটু সতর্কতা অবলম্বন করলেই এ মৃত্যুর হার অনেকটা কমিয়ে আনতে পারি।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট গবেষক বলেছেন, বড়ো গাছের অভাব বজ্রপাতে মৃত্যুর একটি কারণ। খোলা জায়গায় বজ্রপাত বেশি হয়। তাই আমাদের বেশি বেশি গাছ লাগাতে হবে। আবার বজ্রপাতের মৌসুমে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। যেমন— ক) বড়ো গাছপালায় বিদ্যুত্ স্পর্শের সম্ভাবনা বেশি, তাই গাছ থেকে কমপক্ষে চার মিটার দূরে থাকতে হবে। খ) খোলা জায়গায় বা মাঠে কাজ করা অবস্থায় হাঁটু গেড়ে বসে পড়তে হবে, মাটিতে শোয়া যাবে না। গ) উঁচু জায়গায় অবস্থান করা যাবে না। ঘ) বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। ঙ) জলাশয় থেকে দূরে থাকতে হবে। ঞ) বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির লাইন বিচ্ছিন্ন রাখতে হবে। চ) বজ্রপাতের সময় বাড়ির ধাতব কল, সিঁড়ির রেলিং, পাইপ ইত্যাদি স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। এমনকি ল্যান্ড ফোনও ব্যবহার করা যাবে না। এই সময় গাড়ির কাচে হাত দেওয়াও বিপজ্জনক। জ) বজ্রপাতের সময় খালি পায়ে না থাকা কিংবা চামড়ার জুতা পড়া থেকে রাবারের জুতা ব্যবহার করা উত্তম। ঝ) আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা জানান, খোলা আকাশে বিদ্যুত্ চমকানো শুরু করলে মুঠোফোন বন্ধ করে দিতে হবে, মাথার ওপর ছাতা থাকলে তা গুটিয়ে ফেলতে হবে।
বজ্রপাত একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এর পুরোপুরি সমাধান আমাদের হাতে নেই। আমরা শুধু কিছু সতর্কতা অবলম্বন করে এর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে আনতে পারি। কিন্তু দেশের বেশিরভাগ লোকই উপরিউক্ত বিষয়গুলো সম্পর্কে অবগত নয়। সাধারণত আমাদের দেশে মার্চ-মে এবং অক্টোবর-নভেম্বর মাসে বেশি বজ্রঝড়ের ঘটনা ঘটে। দেশের উপকূলীয় ও হাওর এলাকায় বজ্রপাত বেশি হয়। এই সময় বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে উপরিউক্ত সতর্কতামূলক কথাগুলো বেশি বেশি প্রচার করে জনগণকে সচেতন করে তুলতে হবে। আমরা একটু সচেতন হলেই আর আমাদের দেশ বজ্রপাতে মৃত্যুর তালিকায় ওপরের দিকে স্থান নেবে না।
n লেখক :শিক্ষার্থী, কৃষি অনুষদ,
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়