সাম্বার ছন্দ, মরুভূমির সাহস আর বিশ্বকাপের রোমাঞ্চ-সব মিলিয়ে নিউ ইয়র্কে অপেক্ষা করছে এক মহাকাব্যিক লড়াই। ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নতুন মিশন শুরু করতে যাচ্ছে রেকর্ড সর্বোচ্চ পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। আর তাদের প্রথম বাধা আফ্রিকান ফুটবলের নবজাগরণের প্রতীক মরক্কো। যারা ২০২২ বিশ্বকাপে কাতারের মরুভূমিতে ইতিহাস লিখেছিল সেমিফাইনালে উঠে।
'সি' গ্রুপের বহুল প্রতীক্ষিত ম্যাচটি মাঠে গড়াবে বাংলাদেশ সময় রোববার ভোর ৪টায়। দুই দলের জন্য বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ, তাই উত্তেজনার মাত্রাও অন্যরকম। একদিকে ষষ্ঠ শিরোপার স্বপ্নে বিভোর ব্রাজিল, অন্যদিকে আবারও বিশ্বকে চমকে দেওয়ার প্রত্যয়ে উজ্জীবিত মরক্কো। ব্রাজিলের কাছে বিশ্বকাপ শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, এটি যেন তাদের ফুটবলীয় পরিচয়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতীক। পেলের দেশ, রোনালদোর দেশ, রোনালদিনহোর দেশ এবার আবারও 'হেক্সা' মিশনে নেমেছে।
তবে সেই যাত্রার শুরুতেই একটি বড় অনুপস্থিতি চোখে পড়বে-নেইমার। দলের সবচেয়ে বড় তারকাদের একজন চোটের কারণে পুরোপুরি ফিট নন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, শুধু মরক্কো ম্যাচ নয়, পুরো গ্রুপ পর্বেই তাকে বিশ্রামে রাখতে পারে ব্রাজিল। পরিকল্পনা একটাই-নকআউট পর্বে শতভাগ ফিট নেইমারকে পাওয়া। তবে নেইমারের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও আত্মবিশ্বাসে ভাটা নেই সেলেসাওদের।
কারণ ব্রাজিলের শক্তি কখনো একজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রাফিনিয়া, কাসেমিরো, ব্রুনো গিমারাইস, মারকুইনিওসদের মতো তারকাদের নিয়ে গড়া দলটি এখনো বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর শক্তি। দ্রুতগতির আক্রমণ, বলের দখল ধরে রাখা এবং মুহূর্তে ম্যাচের চিত্র বদলে দেওয়ার ক্ষমতা এসবই ব্রাজিলকে করে তুলেছে শিরোপার অন্যতম দাবিদার।
অন্যদিকে, মরক্কো এসেছে বুকভরা আত্মবিশ্বাস নিয়ে। কাতার বিশ্বকাপে তারা প্রমাণ করেছিল, ইউরোপ কিংবা দক্ষিণ আমেরিকার পরাশক্তিদের হারানো তাদের জন্য অসম্ভব নয়। আফ্রিকার প্রথম দল হিসেবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠে তারা বদলে দিয়েছিল বিশ্ব ফুটবলের বহু পুরোনো ধারণা। অধিনায়ক আশরাফ হাকিমির নেতৃত্বে গড়া বর্তমান দলটি আরও পরিণত, আরপ অভিজ্ঞ। শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণভাগ, দৃঢ় মাঝমাঠ এবং বিদ্যুৎগতির পালটা আক্রমণই তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। মরক্কোর লক্ষ্য শুধু ভালো খেলা নয়; তারা প্রমাণ করতে চায় কাতারের সাফল্য কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না।
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ সব সময়ই বিশেষ। একটি জয় যেমন আত্মবিশ্বাসকে আকাশচুম্বী করে তুলতে পারে, তেমনি একটি হোঁচট পুরো অভিযানের সমীকরণও বদলে দিতে পারে। তাই নিউ ইয়র্কের রাত শুধু তিন পয়েন্টের লড়াই নয়, এটি দুই দলের স্বপ্ন, সাহস এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষারও পরীক্ষা। একদিকে সাম্বার ছন্দে ষষ্ঠ তারকার খোঁজে ছুটবে ব্রাজিল। অন্যদিকে, আটলাস পর্বতের গর্জন নিয়ে আরেকটি ইতিহাস লেখার স্বপ্ন দেখবে মরক্কো। ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এর চেয়ে আকর্ষণীয় বিশ্বকাপ সূচনা আর কী হতে পারে!
বিশ্বকাপে ব্রাজিল ও মরক্কোর দেখা হয়েছে মাত্র একবার। ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে সেই ম্যাচে ব্রাজিল ৩-০ গোলে জয় পেয়েছিল। গোল করেছিলেন রোনালদো, রিভালদো ও বেবেতো। তবে সামগ্রিক আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান বলছে, দুই দলের লড়াই এখন আর একপেশে নয়। এখন পর্যন্ত তিন বার মুখোমুখি হয়ে ব্রাজিল জিতেছে দুই ম্যাচ, মরক্কো একটি। বিশেষ করে ২০২৩ সালের প্রীতি ম্যাচে ২-১ গোলে ব্রাজিলকে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছিল আফ্রিকার দলটি। সেটিই ছিল সেলেসাওদের বিপক্ষে তাদের প্রথম জয়, যা মরক্কোর আত্মবিশ্বাসকে নিয়ে গেছে নতুন উচ্চতায়।
এ কারণেই নিউ ইয়র্কের এই লড়াইকে শুধু অতীতের পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করা কঠিন। ইতিহাস ব্রাজিলের পক্ষে কথা বললেও বর্তমান বাস্তবতা মরক্কোকে সমান গুরুত্ব দিতে বাধ্য করছে। ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তিও ম্যাচটিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিচ্ছেন, 'প্রথম ম্যাচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বরং এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। এই ম্যাচই গ্রুপের শীর্ষস্থান নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।'
মরক্কোর শক্তিমত্তার প্রশংসা করে তিনি আরও বলেন, 'আফ্রিকার দলটি বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সংগঠিত ও কঠিন প্রতিপক্ষ। ব্রাজিলকে সর্বোচ্চ সতর্ক থেকেই খেলতে হবে।' অন্যদিকে মরক্কো কোচ মোহাম্মদ ওয়াহবি বলেন, 'আত্মবিশ্বাস ধরে রাখতে হবে। ব্রাজিলের দলে অসাধারণ মানের খেলোয়াড় আছে, বিশেষ করে উইংয়ে। কিন্তু মরক্কো এখানে এসেছে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করতে। আমরা কোনো প্রতিপক্ষকে ভয় পাই না। জয়ের লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামব।'