উত্তাল সমুদ্রই দক্ষ নাবিক তৈরি করে!

বিশ্বসভ্যতার ইতিহাস বিশ্লেষণ করিলে দেখা যায়, যুদ্ধ হয়তো সীমান্তে ঘটে; কিন্তু তাহার অভিঘাত পৌঁছাইয়া যায় সাধারণ মানুষের রান্নাঘর অবধি। চারিদিকে যেন কেবলই দীর্ঘশ্বাস পড়িতে থাকে-বাজারে স্বস্তি নাই, কর্মসংস্থানে নিশ্চয়তা নাই, সমাজে নিরাপত্তা বা শৃঙ্খলা নাই, ভবিষ্যৎ লইয়া মানুষের মনে ভরসা নাই। যুদ্ধবিধ্বস্ত বিশ্ব যেন আজ এই শিক্ষাই গ্রহণ করিতেছে। শুধু কি অর্থনৈতিক অভিঘাত, অস্থির সময় সমাজজীবনকেও ক্রমশ নিরাপত্তাহীন ও অস্থিতিশীল করিয়া তুলিতেছে-তুচ্ছ কারণেই মানুষ আইন হাতে তুলিয়া লইতেছে; ঘটিতেছে বহু অমানবিক-নৃশংস ঘটনা। এই ধরনের একটি বাস্তবতায় রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতার পাশাপাশি নেতৃত্বের দৃঢ়তা, দূরদর্শিতা ও দায়িত্ববোধেরও যেন পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হইয়া যায়! ধনী-গরিব, পূর্ব-পশ্চিম-কোনো নেতৃত্বই এই অগ্নিপরীক্ষার বাহিরে নহে। ইতিহাস বলিতেছে, এমন দুর্যোগের সময়ে জাতির ভাগ্য অনেকাংশে নির্ভর করে নেতৃত্ব বা লিডারশিপের উপর।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলিয়াছেন, ‘যেটা পপুলার সেটা করব না, যেটা সঠিক সেটা করব।’ ইহাই রাষ্ট্রনায়কোচিত বার্তা; কারণ নেতৃত্বের মূল দায়িত্ব কেবল জনমত অনুসরণ করা নহে, প্রয়োজনবোধে জনগণকে সঠিক পথের দিকনির্দেশনাও প্রদান করা। ইতিহাসে বহু সফল রাষ্ট্রনায়ক সাময়িক জনপ্রিয়তার চাইতে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়াছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ হইতে আমরা এই শিক্ষাই পাই। উদাহরণস্বরূপ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দুর্যোগকালে উইনস্টিন চার্চিল ব্রিটিশ জনগণকে সহজ আশ্বাস দেন নাই; বরং কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়াইবার আহ্বান জানাইয়াছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও তাহার বিভিন্ন কথা বা বক্তব্যের মধ্যে ‘কঠিন সময়ের জন্য প্রস্তুতি’ গ্রহণের আহ্বান জানাইতেছেন। এই সকল উদাহরণ প্রমাণ করে, সংকট যতই গভীর হউক না কেন, সঠিক নেতৃত্ব জাতিকে পুনরুদ্ধারের পথে লইয়া যাইতে পারে। বৃহৎ সংকটের সময় জনগণ কেবল অর্থনৈতিক সহায়তাই চাহে না; বরং তাহারা চাহে আস্থা ও দিকনির্দেশনা। নেতৃত্বের মুনশিয়ানা এইখানেই-আর এই জন্যই বলা হইয়া থাকে, উত্তাল সমুদ্র হইতেই জন্ম নেয় দক্ষ নাবিক।

করোনা মহামারির ক্ষত শুকাইবার পূর্বেই ইউক্রেন যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার অগ্নিস্ফুলিঙ্গ যখন সমাজজীবনকে পুড়াইয়া মারিতেছিল, ঠিক সেই সময়ে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যকার চলমান সংঘাতের মধ্যে পড়িয়া যায় সমগ্র পৃথিবী। হাঁসফাঁস করিতে থাকা বিশ্ববাসীর মুখে এখন একই আর্তনাদ-সমাজে স্বস্তি ফিরিবে কবে? ঠিক এমন একটি সংকটময় মুহূর্তে নেতৃত্বের প্রশ্নে কেবল বক্তব্যই নহে, বরং ধারাবাহিক নীতিগত অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ।

সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায় হইতে অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথা বারবার উচ্চারিত হইতেছে। বিশেষ করিয়া, রাষ্ট্র পরিচালনায় জনপ্রিয়তার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার যে দৃষ্টিভঙ্গি প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন নীতিনির্ধারকের বক্তব্যে প্রতিফলিত হইতেছে, তাহা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কেননা, অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল তাৎক্ষণিক স্বস্তি প্রদান নহে; বরং এমন ভিত্তি নির্মাণ করা, যাহার উপর দাঁড়াইয়া ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি স্থিতিশীল অর্থনীতি লাভ করিতে পারে।

অর্থনৈতিক চাপ যখন দীর্ঘস্থায়ী হয়, তখন তাহার সামাজিক প্রতিক্রিয়াও দৃশ্যমান হইয়া উঠে। উন্নয়নশীল দেশসমূহে এই প্রভাব আরও গভীর। আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য নষ্ট হইয়া গেলে মানুষের মধ্যে হতাশা, ক্ষোভ ও অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়। এইরূপ সময়ে নেতৃত্বের গুরুত্ব নিঃসন্দেহে সর্বাধিক। সংকটকালেই একজন রাষ্ট্রনায়কের প্রকৃত সক্ষমতা, দূরদর্শিতা ও সাহসের পরীক্ষা হয়। শান্ত ও স্বাভাবিক সময়ে জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ; কিন্তু কঠিন সময়ে রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষার্থে প্রয়োজন হয় বিচক্ষণ ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্তের। অনেক সময় সেই সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে জনপ্রিয় না-ও হইতে পারে; কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য তাহাই সঠিক পথ নির্দেশ করে। বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এই সত্য আরও স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হইতেছে। জনগণ মূলত শেষ পর্যন্ত বক্তব্যের চাইতে কর্মের প্রতিফলনই দেখিতে চাহে। চলমান বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ‘পপুলার’ বা জনতুষ্টবাদী কাজের চাইতে ‘সঠিক’ কাজ করাকেই তাই রাষ্ট্রনেতাদের জন্য সমুচিত বলিয়া বিজ্ঞজনেরা মনে করিতেছেন।