দেশে হামের প্রাদুর্ভাব শুরুর তিন মাস পেরিয়ে গেলেও কমছে না হামের আক্রান্তের সংখ্যা। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হয়েছে। এখন যেসব রোগী হাসপাতালে আসছে—তারা হামের বিভিন্ন ধরনের জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে আসছে। যেমন—ঠান্ডা-শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, সেফসিস, র্যাশ বেশি হয়েছে, চামড়া উঠে যাচ্ছে এসব সমস্যা নিয়ে আসছে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম বিষয়ক বুলেটিনের তথ্য বলছে—হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসা রোগীর সংখ্যা প্রতিদিনই হাজারের আশপাশেই থাকছে।
রাজধানীর ডিএনসিসি হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে কথা হয় গাজীপুরা ২৭ নম্বর থেকে আসা ১০ মাস বয়সি শিশু রাফার মায়ের সঙ্গে। শিশুটিকে নিয়ে বাবা-মা দুই জনেই এসেছেন হাসপাতালে। জানান, গত পাঁচ দিন ধরে শিশুটির জ্বর-সর্দি-কাশি, এরপর শরীরে র্যাশ বের হয়েছে। কুর্মিটোলা হাসপাতাল ঘুরে তারা ডিএনসিসি হাসপাতালে আসে। এর আগে শিশুটি ডায়রিয়া নিয়ে একদিন কলেরা হাসপাতালে ভর্তি ছিল, তারপর বাড়ি ফিরলে জ্বর ও শরীরে র্যাশ দেখা দেয়। তখন একটি প্রাইভেট হাসপাতালে গেলে চিকিত্সক ওষুধ দিয়ে ছেড়ে দেয়। তিনি বলেছেন, এসব হাম নয়; এসব এলার্জি। বাড়িতে গেলে বাচ্চার আবার জ্বর-বমি শুরু হয় তখন তারা কুর্মিটোলা হাসপাতালে যান এবং সেখান থেকে ডিএনসিসি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আসেন। সামনেই কথা হয় এই শিশুর মা তাসলিমা বেগম ও বাবা রুবেলের সঙ্গে। তারা জানান, শিশুটিকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে বলেছেন।
জুনের প্রথম ১৫ দিনে আবার হাসপাতালে আসা রোগীর সংখ্যা বেড়ে দৈনিক গড়ে ১ হাজার ৮৯ জন হলেও নিশ্চিত সংক্রমণ আরো কমে ৮৮ জনে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যাও কমেছে। তবে মে মাসের শেষার্ধ থেকে পরিস্থিতির উন্নতি শুরু হয়। এ সময় হাসপাতালে আসা রোগী কমে দৈনিক ৯৩৩ জন এবং নিশ্চিত সংক্রমণ ১০৫ জনে নেমে আসে। মে মাসের প্রথমার্ধে হাসপাতালে আসা রোগীর সংখ্যা সামান্য কমলেও নিশ্চিত রোগী বেড়ে দৈনিক গড়ে ১৫৯ জনে পৌঁছায়। এপ্রিলের শেষ ১৫ দিনে প্রতিদিন গড়ে এক হাজার ২৬৬ জন শিশু হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে আসে এবং ১৪২ জনের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. আতিকুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, নতুন করে আক্রান্ত কমে গেছে। এই হাসপাতালে চাপ কমা মানে সবখানেই রোগীর চাপ কমেছে। আগে যারা আক্রান্ত হয়েছে তারাই জটিলতা নিয়ে এখন আসছে। যেমন ডায়রিয়া, ঠান্ডা-শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, সেফসিস, র্যাশ বেশি হয়েছে, চামড়া উঠে যাচ্ছে এসব সমস্যা নিয়ে আসছে। তবে নতুন আক্রান্ত খুব কম রোগী আসছে বলে জানান। এটা সরকারের টিকার সুফল বলা যায় বলে জানান এই শিশু বিশেষজ্ঞ। তিনি জানান, হামের জটিলতা দুই সপ্তাহ তিন সপ্তাহ পরেও হয়। হাম ভালো হওয়ার পর সাত থেকে ছয় সপ্তাহ শিশুর ইমিউনিটি কম থাকে, তখন বিভিন্ন ধরনের জটিলতা দেখা দেয়। আশা করছি তিন থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে হামের নতুন-পুরাতন সব রোগীয় কমে যাবে। দুই-একটা থাকতে পারে। সেটা তো সব রোগের ক্ষেত্রেই থাকে। তবে মাহামারি আকারে থাকবে না। আমাদের দেশে অনেক অসচেতন অভিভাবক আছেন যারা শিশুতে টিকা দিতে নিয়ে যান না। সবার সচেতন হওয়া উচিত। হামের পরে তিন থেকে ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত হাই প্রোটিন খাবার খাবে।
হাম রোগীর সংখ্যা :স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ১৫ মার্চের পর থেকে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ৮৮ হাজার ৮৯৫ জন। আর এই সময়ের মধ্যে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এ পর্যন্ত ১০ হাজার ৬৩৪ জন। গাম ও উপসর্গ নিয়ে রোগীর সংখ্যা বেড়ে লাখ ছুঁইছুঁই করছে—যা সংখ্যায় দাঁড়িয়েছে ৯৯ হাজার ৫২৯ জনে।
তবে দেশের হাম পরিস্থিতির নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন হামের টিকাদানে দেশের স্বাস্থ্য বিভাগ শতভাগ সার্থক ও সফল হয়েছে বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, হামের টিকাদানে শতভাগ স্বার্থক। পুরো দেশে শতভাগের বেশি টার্গেট আমরা অর্জন করেছি। টিকাদান আমরা থামিয়ে দিইনি। ঈদের আগে থেকে প্রতিদিন আমরা ডেকে ডেকে টিকা দিয়েছি, মাইকিংও করা হয়েছে। ইপিআই কর্মসূচি চলমান রয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমি বলব না হামে মারা যাচ্ছে না, দুই-একজন মারা যাচ্ছে। গত ২০ তারিখে যে টিকাটা দেওয়া হয়েছে, অ্যান্টিবডি তৈরি হতেও এক মাস সময় লাগে।
গত ২৪ ঘণ্টায় হামে আরো চার জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মোট নিশ্চিত হামে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়াল ৯৩ জনে। আর হাম উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে এ পর্যন্ত ৫৬৮ জনের। হাম ও উপসর্গে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়াল ৬৬১ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম রোগীর সংখ্যা ৯০৬ জন, এ পর্যস্ত হাম মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৭৩ হাজার ২৭৭ জন। আর হাসপাতাল থেকে এ পর্যন্ত ছাড়পত্র পেয়েছে ৬৯ হাজার ৬৮৮ জন।