মানবচরিত্রের মন্দ স্বভাবগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘গিবত’ ও ‘তুহমাত’। গিবত শব্দের অর্থ পরনিন্দা, কুৎসা রটনা, পেছনে সমালোচনা, পরচর্চা করা, দোষারোপ করা; কারও অনুপস্থিতিতে তার দোষ অন্যের সামনে তুলে ধরা। ইসলামি শরিয়তে গিবত হারাম ও কবিরা গুনাহ।
অপবাদের কারণে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ছিন্ন হয়। নষ্ট হয় সামাজিক সংহতি ও পারিবারিক বন্ধন। এমনকি জাতীয় ঐক্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অপবাদ ইসলামে যেমন নিষিদ্ধ তেমনিভাবে সামাজিকভাবেও একটি ঘৃণিত অপরাধ। অপবাদের রয়েছে শারীরিক শাস্তি। সামাজিকভাবে তার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। পরকালের শাস্তি তো আছেই।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘দুর্ভোগ তাদের জন্য, যারা পশ্চাতে ও সম্মুখে লোকের নিন্দা করে, মানুষের ত্রুটি খুঁজে বেড়ায় ও প্রচার করে।...অবশ্যই তারা হুতামায় (জাহান্নামে) নিক্ষিপ্ত হবে। তুমি কি জানো, হুতামা কী? তা আল্লাহর প্রজ্বলিত হুতাশন, যা হৃদয়কে গ্রাস করবে।
নিশ্চয় বেষ্টন করে রাখবে, দীর্ঘায়িত স্তম্ভগুলোতে।’ (সুরা-১০৪ হুমাজা, আয়াত: ১-৯)। হাদিস শরিফে রয়েছে, ‘যারা অগ্র-পশ্চাতে অন্যের দোষ প্রচার করে, তাদের জন্য রয়েছে ধ্বংসের দুঃসংবাদ।’ (মুসলিম)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা কি জানো, গিবত কাকে বলে?’ সাহাবিরা বললেন, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.) ভালো জানেন।’ তিনি বলেন, ‘তোমার কোনো ভাই সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে, তা–ই গিবত।’
সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আমি যে দোষের কথা বলি, সেটা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে থাকে, তাহলেও কি গিবত হবে?’ উত্তরে রাসুল (সা.) বলেন, ‘তুমি যে দোষের কথা বলো, তা যদি তোমার ভাইয়ের মধ্যে থাকে, তবে তুমি অবশ্যই গিবত করলে আর তুমি যা বলছ, তা যদি তার মধ্যে না থাকে, তবে তুমি তার ওপর তুহমত ও বুহতান তথা মিথ্যা অপবাদ আরোপ করেছ।’ (মুসলিম)
আরবিতে অপবাদকে বহুতান বলা হয়। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে মিথ্যা ভিত্তিহীন বা অসত্য অভিযোগ আরোপ করা। উদাহরণস্বরূপ : কেউ চুরি করেনি অথচ তাকে চোর বলা, কেউ অসৎ নয় অথচ তাকে অসৎ বলা।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাপারে অপবাদ দেওয়া প্রসঙ্গে ইমাম আবু ইউসুফ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন-
‘কেউ যদি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গালি দেয় অথবা তাকে মিথ্যারোপ করে বা তার ব্যাপারে অপবাদ রটনা করে তাহলে সে মুরতাদ হয়ে যাবে এবং স্ত্রীর সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে।‘ (আহকামুল কুরআন ৪ /২৭৫)
কোরআনুল কারিমে মহান আল্লাহ অপবাদের মতো অপরাধ করা ব্যক্তিকে অভিশপ্ত এবং তাদের কঠোর শাস্তি করা উল্লেখ করে বলেন-
اِنَّ الَّذِیۡنَ یَرۡمُوۡنَ الۡمُحۡصَنٰتِ الۡغٰفِلٰتِ الۡمُؤۡمِنٰتِ لُعِنُوۡا فِی الدُّنۡیَا وَ الۡاٰخِرَۃِ ۪ وَ لَهُمۡ عَذَابٌ عَظِیۡمٌ
‘নিশ্চয়ই যারা সচ্চরিত্রবান সরলমনা মুমিন নারীদের ব্যভিচারের অপবাদ দেয় তারা দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য (আখিরাতে) আছে মহা শাস্তি।’ (সুরা নুর : আয়াত ২৩)
অন্য আয়াতে এসেছে, যারা সতী-সাধ্বী, নিরীহ ইমানদার নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারা ইহকাল ও পরকালে ধিক্কৃত এবং তাদের জন্য রয়েছে গুরুতর শাস্তি। (সূরা নূর, আয়াত নং-২৩)
হাদিসে অপবাদের শাস্তি সম্পর্কে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের উপর এমন মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে, যা তার মধ্যে নেই, এমতাবস্থায় যতক্ষণ না সে তার কথার পরিণতি থেকে মুক্ত হবে ততক্ষণ সে দোজখের কাদার মধ্যে থাকবে। (অর্থাৎ জাহান্নামীদের পূজ, রক্ত ইত্যাদির মধ্যে থাকবে) (আবু দাউদ, হাদিস নং-৩৫৯৭)
অপবাদের গুনাহ থেকে মুক্ত হতে শুধু তওবা করলেই চলবে না, বরং যাকে অপবাদ দেওয়া হয়েছে তার কাছ থেকে দুনিয়া থেকেই মাফ নিতে হবে, অন্যথায় কেয়ামতের দিন অপবাদকারীর আমলনামা থেকে মজলুম ব্যক্তিকে নেক দেওয়া হবে। নেক আমল শেষ হয়ে গেলে মজলুমের গুনাহ তার উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের অপবাদের গুনাহ থেকে বাঁচার তৌফিক দিন। (আমিন)
গিবতকারীর অপরাধের শাস্তি রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং মিরাজে দেখে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘যখন আমাকে মিরাজে নিয়ে যাওয়া হলো, তখন আমাকে (জাহান্নামের শাস্তি দেখানোর জন্য) তামার নখবিশিষ্ট একদল লোকের পাশ দিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো। তারা তাদের নখগুলো দিয়ে স্বীয় মুখমণ্ডলে ও বক্ষদেশে আঘাত করে ক্ষতবিক্ষত করছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “হে জিবরাইল! তারা কারা?” জিবরাইল (আ.) বললেন, “এরা দুনিয়াতে মানুষের গোশত ভক্ষণ করত এবং তাদের মানসম্মান নষ্ট করত। অর্থাৎ তারা মানুষের গিবত ও চোগলখোরি করত।”’
(আবুদাউদ) রাসুলে কারিম (সা.) বলেছেন, ‘দুনিয়াতে যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করবে, অর্থাৎ গিবত করবে, কিয়ামতের দিন তাকে মৃত পচা মাংস ভক্ষণ করতে বাধ্য করা হবে। অতঃপর সে অনিচ্ছা সত্ত্বেও চিৎকার করতে করতে তা ভক্ষণ করবে।’ (বুখারি)
ধারণাপ্রসূত বিষয় মিথ্যার শামিল। আল্লাহ তাআলার বাণী, ‘হে মুমিনরা! তোমরা অধিকাংশ অনুমান হতে বিরত থাকো। নিশ্চয় অনুমান কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাপ। তোমরা একে অপরের বিষয়ে অনুসন্ধান কোরো না এবং একে অপরের পশ্চাতে নিন্দাবাদ কোরো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ পছন্দ করে? তবে তা তোমরা ঘৃণাই করবে। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো; আল্লাহ তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।’ (সুরা-৪৯ হুজুরাত, আয়াত: ১২)
রাসুলে আকরাম (সা.) বলেন, ‘সাবধান! তোমরা মন্দ ধারণা থেকে দূরে থাকো। কারণ, তা (অনেক ক্ষেত্রে) চরম মিথ্যাচারে পরিণত হয়।’ (সহিহ বুখারি: ৫১৪৩) প্রিয় নবীজি (সা.) আরও বলেন, ‘যা শুনে তা–ই বলা কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য যথেষ্ট।’ (মুসলিম) মিথ্যাবাদী অভিশপ্ত। পবিত্র কোরআনের ভাষায়, ‘মিথ্যাবাদীদের ওপর আল্লাহর লানত।’ (সুরা-৩ আলে ইমরান, আয়াত: ৬১)
হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, গিবতের কাফফারা হলো, তুমি যার গিবত করেছ, তার জন্য মাগফিরাতের দোয়া করবে। তুমি এভাবে বলবে, হে আল্লাহ! তুমি আমার ও তার গুনাহ মাফ করে দাও। (বায়হাকি)