আবাহনীর প্রথম অধিনায়ক ও হকি কিংবদন্তি আবদুস সাদেকের মৃত্যু

বিশ্বকাপ ফুটবলের ডামাডোলের মাঝেই বিষাদগ্রস্ত হলো দেশের ক্রীড়াঙ্গন। চিরবিদায় নিলেন বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র ও বহুমুখী অ্যাথলেট আবদুস সাদেক। হকির মাঠের জাদুকর হিসেবে পরিচিতি থাকলেও ফুটবলেও তিনি রেখে গেছেন অসামান্য কীর্তি। দীর্ঘ এক বছর অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে আজ সকালে গুলশানের একটি হাসপাতালে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।

আবদুস সাদেকের খেলোয়াড়ি জীবনের শুরু হয়েছিল দেশের হকির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত আরমানিটোলা থেকে। আরমানিটোলা স্কুলের ছাত্র হিসেবেই হকির প্রেমে পড়েন তিনি। তবে ষাটের দশকে ঢাকার ফুটবল মাঠেও ছিল তার সরব পদচারণা। ১৯৬৫ সালে আজাদ স্পোর্টিংয়ের হয়ে ফুটবল লিগে যাত্রা শুরুর পর ভিক্টোরিয়া ও দিলকুশায় খেলেছেন তিনি। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে তৎকালীন ‘ইকবাল স্পোর্টিং’ যখন ‘আবাহনী ক্রীড়া চক্র’ হিসেবে নতুন যাত্রা শুরু করে, তখন ফুটবল দলের ঐতিহাসিক প্রথম অধিনায়কের দায়িত্ব পান আবদুস সাদেক। মাঠের রক্ষণে স্টপার হিসেবে খেলা সাদেক ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত আবাহনীর সঙ্গে খেলোয়াড় এবং কোচ হিসেবে যুক্ত ছিলেন।

ফুটবলে নিজের ছাপ রাখলেও সাদেকের মূল সত্তা জুড়ে ছিল হকি। ১৯৬৫ সালে তার উদ্যোগে গঠিত ‘কম্বাইন্ড হকি ক্লাব’ টানা পাঁচ বছর লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়ে ঘরোয়া হকিতে আধিপত্য বিস্তার করে। পরবর্তীতে তিনি ইস্পাহানি ক্লাবে যোগ দেন, যা স্বাধীনতার পর আবাহনী হকি দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই দলটির হয়ে বছরের পর বছর নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। ষাটের দশকে পূর্ব পাকিস্তান হকি দলের অপরিহার্য এই সেন্টার হাফ তৎকালীন পাকিস্তান জাতীয় দলেও নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন। পাকিস্তান দলের হয়ে ইউরোপ সফরে আটটি ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা ছিল তার ঝুলিতে।

সাদেকের প্রয়াণে ক্রীড়াঙ্গনের সতীর্থদের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। প্রখ্যাত ফুটবলার গোলাম সারোয়ার টিপু তাকে স্মরণ করে বলেন, ‘মাঠ এবং মাঠের বাইরে তার মতো বিশাল ব্যক্তিত্ব ও অমায়িক মানুষ ক্রীড়াঙ্গনে খুব কমই এসেছে।’ সতীর্থ হকি তারকা প্রতাপ শংকর হাজরা তাকে ভারতের অজিত পাল সিংদের মতো বিশ্বমানের খেলোয়াড়দের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, ‘সাদেক ছিল আমাদের দেশের এবং আরমানিটোলা স্কুলের গর্ব।’

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, আজ বাদ আসর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার আই ব্লকের বায়তুস সোবহান মসজিদে মরহুমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। আগামীকাল সকাল সাড়ে ১০টায় বনানী ডিওএইচএস মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে তাকে বনানী কবরস্থানে দাফন করা হবে। আবদুস সাদেকের বিদায়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সোনালি ক্রীড়া যুগের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।

আবদুস সাদেক ছিলেন দেশের ক্রীড়া ইতিহাসের এমন একজন বিরল প্রতিভা যিনি একই সঙ্গে হকি ও ফুটবলের শীর্ষ পর্যায়ে সফলতার সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আবাহনী ক্লাবের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এর বিকাশে তার অবদান অনস্বীকার্য। তার মৃত্যুতে এ দেশের ক্রীড়াঙ্গন একজন অভিভাবক ও কিংবদন্তিকে হারাল।