সভ্যতার অগ্রযাত্রার এই যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিভিন্ন স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, স্মার্ট অবকাঠামো ও ডিজিটাল সেবার বিস্তার আমাদের জীবনকে করিয়া তুলিয়াছে সহজ, সাবলীল ও স্বাচ্ছন্দ্যময়। তবে দুঃখজনকভাবে আমরা হামেশাই ভুলিয়া যাই-এই উন্নত ব্যবস্থাগুলির কার্যকারিতা অনেক সময় নির্ভর করে কিছু আপাতদৃষ্টিতে ক্ষুদ্র দায়িত্ব পালনের উপর। সেই দায়িত্বে যখন অবহেলা করা হয়, তখন ক্ষুদ্র ত্রুটিই হইয়া দাঁড়ায় বৃহৎ বিপর্যয়ের কারণ। সম্প্রতি রাজধানী ঢাকায় ‘ইঁদুরে তার কাটিয়া দেওয়ার কারণে’ ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত এআই ক্যামেরা ও সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থা প্রায় ৪৮ ঘণ্টা অচল থাকিবার ঘটনা যেন আমাদের সেই বাস্তবতাই স্মরণ করাইয়া দিল। প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক, এত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব যাহাদের উপর ন্যস্ত, তাহারা কি যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করিতেছেন? নিয়মিত পরিদর্শন, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইলে কি ক্ষুদ্র ইঁদুর এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি করিতে পারিত?
এমন একটি বা দুইটি ঘটনা নহে, একইভাবে মেট্রোরেলের চলাচল কখনো ঘুড়ির সুতা, কখনো উড়িয়া আসা কাগজ, আবার কখনো বিড়ালের মতো ছোট্ট প্রাণীর কারণে বিঘ্নিত হইবার ঘটনা ঘটিতে দেখা যায়। ইহা কেবল প্রযুক্তিগত দুর্বলতার বিষয় নহে, বরং তদারকি, নিরাপত্তাব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বশীলতারও প্রশ্ন। বিজ্ঞজনেরা এই জন্য বলিয়া থাকেন, আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ করিলেই চলিবে না; তাহা সচল রাখিবার জন্য সমান গুরুত্ব সহকারে দায়িত্ব পালনও জরুরি। যথাযথ মেইনটেন্যান্স বা রক্ষণাবেক্ষণের সংস্কৃতিই এই সকল ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়ার পূর্বশর্ত।
প্রসঙ্গত আরেকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করিতে হয়। সম্প্রতি এক বিদ্যালয় পরিদর্শনে গিয়া একজন ইউএনও বিদ্যালয়ের বাথরুম অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় দেখিয়াছেন; সেইখানে সিগারেটের অবশিষ্টাংশও পাওয়া গিয়াছে। এই ধরনের ঘটনাগুলিও যেন নিয়মিত দৃশ্য হইয়া উঠিতেছে। প্রশ্ন হইল, অফিস-আদালত কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতা বা শৃঙ্খলা রক্ষার মতো দায়িত্বও যদি সঠিকভাবে পালন করা না হয়, তাহা হইলে বৃহত্তর দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কী অবস্থা চলিতেছে?
ক্ষুদ্র অবহেলার মূল্যও যে অনেক সময় কতটা ভয়াবহ হইতে পারে, সেই শিক্ষা আমরা পাই ইতিহাস হইতে। ইউক্রেনের চেরনোবিল পারমাণবিক দুর্ঘটনা ইহার বড় দৃষ্টান্ত, যাহার পিছনে ছিল নিরাপত্তা নির্দেশনা অমান্য করা ও দায়িত্বহীন সিদ্ধান্ত। এই রকম বহু দৃষ্টান্ত রহিয়াছে; যেমন-আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনা। ভোপালে একটি কীটনাশক কারখানায় নিরাপত্তাব্যবস্থা ও যন্ত্রপাতির যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ না করায় এবং বিভিন্ন সতর্কতা ও ত্রুটি উপেক্ষা করিবার ফলে এক রাত্রে বিষাক্ত মিথাইল আইসোসায়ানেট গ্যাস ছড়াইয়া পড়ে। ইহাতে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাপক হতাহতের পাশাপাশি পরবর্তী বৎসরগুলিতে বহু মানুষ স্বাস্থ্যগত জটিলতায় আক্রান্ত হইয়া পড়ে, ঘটিয়া যায় ইতিহাসের অন্যতম মানবিক বিপর্যয়।
অপরদিকে, বহু দেশ নিয়মিত পরিদর্শন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও কঠোর তদারকির মাধ্যমে বড় বিপর্যয় এড়াইতে সক্ষম হইয়াছে। জাপানের রেলব্যবস্থা ইহার উজ্জ্বল উদাহরণ। ক্ষুদ্র ত্রুটিকেও জাপানিজরা গুরুত্বের সহিত বিবেচনা করেন বলিয়াই নিরাপত্তা ও সময়ানুবর্তিতায় তাহারা বিশ্বময় প্রতিষ্ঠিত ও প্রশংসিত। ধর্মীয় অনুশাসনেও দায়িত্ব পালনের বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর নির্দেশনা রহিয়াছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) বলিয়াছেন, ‘প্রত্যেককে তাহার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হইবে।’ এই হাদিস স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে, দায়িত্ব কেবল কাজ বা চাকুরির অংশ নহে, ইহা একটি নৈতিক ও ধর্মীয় আমানত। খলিফা হজরত উমর (রা.) যেমনটি বলিতেন, ফোরাত নদীর তীরে একটি কুকুরও যদি অভুক্ত অবস্থায় মারা যায়, তাহা হইলে তাহার জন্যও তিনি জবাবদিহি করিতে ভয় পান। দায়িত্ববোধের এই গভীরতা আজিকার সমাজের জন্য সত্যিই এক অনুকরণীয় শিক্ষা।
সামান্য একটি তার, একটি সুতার টুকরা, একটি অপরিচ্ছন্ন কক্ষ কিংবা একটি অবহেলিত নিয়মকে তোয়াক্কা করিবার সংস্কৃতিকে খালি চোখে হয়তো ক্ষুদ্র বলিয়া মনে হইতে পারে; কিন্তু এই ক্ষুদ্র অবহেলাই কখনো কখনো জনদুর্ভোগ, অর্থনৈতিক ক্ষতি কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা ডাকিয়া আনিতে পারে। অতএব, ব্যক্তি হইতে প্রতিষ্ঠান, কর্মচারী হইতে নীতিনির্ধারক সকলের মধ্যেই দায়িত্বশীলতার সংস্কৃতি গড়িয়া তোলা জরুরি। কারণ, দায়িত্বে অবহেলার খেসারত অনেক সময় পুরো সমাজকেই বহন করিতে হয়।