বাবা দিবস আজ

বাবা যেন বটের ছায়া

তিনি বটবৃক্ষ, নিদাঘ দিঘল সূর্যের তলে সন্তানের অমল-শীতল কোমল ছায়া। তিনি বাবা। বাবার তুলনা তিনি নিজেই। বাবা অকৃত্রিম, শাশ্বত, চির আপন, চিরন্তন। বাবা মানে ভালোবাসা, মায়া-মমতা নির্ভরতার বিশাল আকাশ আর নিঃসীম নিরাপত্তার চাদর। ‘মরিয়া বাবর অমর হয়েছে, নাহি তার কোন ক্ষয়/ পিতৃস্নেহের কাছে হয়েছে মরণের পরাজয়’—সন্তানের প্রতি বাবার ভালোবাসা এতটাই স্বার্থহীন যে, সন্তানের জন্য নিজের প্রাণ দিতেও তারা কুণ্ঠবোধ করেন না।

আজ রবিবার ২১ জুন। বিশ্ব বাবা দিবস। বছরের এই একটি দিনকে প্রিয় সন্তানরা আলাদা করে বেছে নিয়েছেন। জুন মাসের তৃতীয় রবিবার সারা বিশ্বের সন্তানরা পালন করবেন এই দিবস। রাগ শাসন আর রাশভারী চেহারার আবডালে এই মানুষটির যে কোমল হৃদয়, তা মাতৃহৃদয়ের চেয়ে কম নয়। ‘মা’র মতো ‘বাবা’ও ছোট্ট একটি শব্দ, অথচ গভীরতা অতলান্ত -অসীম। পবিত্র কুরআনে সুরা আহকাফের ১৪ নম্বর আয়াতে, বনি ইসরাইলের ২৪ নম্বর আয়াতে, সুরা নিসার ৩৬ নম্বর আয়াতে সুরা লোকমানের ১৪ নম্বর আয়াতে পিতা-মাতার খেদমত করার নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহ-তায়ালা। সুরা বনি ইসরাইলে ২৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমার পালনকর্তা আদেশ দিয়েছেন যে, তিনি ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো। তাদের মধ্যে কেউ বা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হন, তাহলে তাদেরকে ‘উহ!’ শব্দটিও বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না; বরং তাদের সঙ্গে নম্রভাবে কথা বলো।’ তাদের জন্য অহর্নিশি দোয়া করতে বলা হয়েছে, যেন শৈশবের মতো আল্লাহ তাদের প্রতি রহম করেন। রাব্বির হাম হুমা কামা রাব্বা ইয়ানি ছাগিরা। সন্তানের জন্য পিতার দোয়া আল্লাহর কাছে পৌঁছাতে কোনো পর্দা-আড়াল থাকে না।

রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘পিতা- মাতা জান্নাতের মাঝের দরজা। যদি চাও, দরজাটি নষ্ট করে ফেলতে পারো, নতুবা তা রক্ষা করতে পারো। (তিরমিজি, তুহফাতুল আহওয়াযি, ৬/২৫)। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাহে ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তার নাক ধুলায় মলিন হোক (৩ বার), সাহাবায়ে কেরাম জিগ্যেস করলেন, হে আল্লাহর রসুল! সেই হতভাগা ব্যক্তিটি কে? রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাহে ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, সে হলো ঐ ব্যক্তি, যে তার পিতা-মাতা উভয়কে বা এক জনকে পেল অথচ তাদের সেবা করে জান্নাত হাসিল করতে পারল না’ (মুসলিম-৪/১৯৭৮, হা-২৫৫১)। নবি সাল্লাল্লাহু আলাহে ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টি পিতার সন্তুষ্টিতে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি পিতার অসন্তুষ্টিতে নিহিত (তিরমিজি-১৮৯৯)।’ রসুলুল্লাহ (স.)-কে পিতা-মাতার অধিকার সম্পর্কে জিগ্যেস করা হলে তিনি বলন, ‘তারা তোমার জান্নাত বা জাহান্নাম (ইবনে মাজাহ :৩৬৬২)।’ অর্থাৎ তাদের সেবাযত্নে আল্লাহর জান্নাত পাওয়া যাবে। পক্ষান্তরে তাদের অন্তরে কষ্ট দিলে জাহান্নাম অবধারিত।

ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :ধার্মিকতার সর্বোত্তম কাজ হলো একজন মানুষ তার পিতার প্রিয়জনদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখে (সহিহ মুসলিম-২৫৫২)।

অন্য একটি হাদিসে বর্ণিত রয়েছে যে, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তার নেক বান্দাদের মর্যাদা জান্নাতে উন্নীত করবেন এবং তারা বলবে : হে প্রভু, এটা কী? আল্লাহ বলবেন :এটা তোমার সন্তান তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার কারণে (মুসনাদে আহমদ ১০২৩২)। কেবল ইসলাম নয়, অন্যান্য ধর্মেও পিতা-মাতার অধিকারে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। ‘পিতা স্বর্গ, পিতা ধর্ম, পিতাহী পরমং তপঃ, পিতরী প্রিতিমাপন্নে প্রিয়ন্তে সর্বদেবতা’—হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা এই মন্ত্র জপে বাবাকে স্বর্গজ্ঞান করে শ্রদ্ধা করেন। পিতা, সন্তানের মাথার ওপর যার স্নেহচ্ছায়া বটবৃক্ষের মতো, সন্তানের কল্যাণার্থ জীবনের প্রায় সবকিছুই নির্দ্বিধায় ত্যাগ করতে হয় তাকে। আদর-শাসন আর আস্থা, ভরসা, পরম নির্ভরতা ও বিশ্বস্ততার জায়গা হলো বাবা। বাবার মাধ্যমেই সন্তানের জীবনের শুরু। সন্তান বাবার ঋণ কখনো পরিমাপ করতেও পারে না। পরিবারের মহিরুহ হয়ে দায়িত্ব পালনে, সন্তান-সংসার পরিচালনায় ব্রতী যিনি। শাসনে কঠোর, ভালোবাসায় কোমল, স্নেহে উদার, ত্যাগে অগ্রগামী বাবা, যিনি জন্মদাতা।

বাবা হলেন অদ্বিতীয় আলো, যার আলোয় আলোকিত হয়েই আমাদের সারা জীবনের পথচলা। বাবারা যে কোনো ধরনের দুঃখ-কষ্ট একাই সহ্য করেন। সব সময় চেষ্টা করেন দুঃখ-কষ্ট ক্লেশ যেন সন্তানদের স্পর্শ না করে। সন্তানের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভেবে সারা জীবন অক্লান্ত পরিশ্রম করেন।

‘কাটে না সময় যখন আর কিছুতে/ বন্ধুর টেলিফোনে মন বসে না/ জানালার গ্রিলটাতে ঠেকাই মাথা/ মনে হয় বাবার মতো কেউ বলে না/ আয় খুকু আয়, আয় খুকু আয়...।’ হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও শ্রাবন্তী মজুমদারের গাওয়া এই গানটি সন্তানদের এক অসীম আবেগ-নস্টালজিয়ায় ডুবিয়ে দেয়। সন্তানের জন্য বাবার ভালোবাসা অসীম। মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট বাবর সন্তানের প্রতি বাবার ভালোবাসার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে আছেন। তিনি সন্তান হুমায়ুনের জীবনের বিনিময়ে নিজের জীবন ত্যাগ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি। এমন স্বার্থহীন যার ভালোবাসা, সেই বাবাকে সন্তানের খুশির জন্য জীবনের অনেক কিছুই ত্যাগ করতে হয়। এনসাইক্লোপেডিয়া জানাচ্ছে, জুন মাসের তৃতীয় রবিবার বিশ্বের প্রায় ৭৪টি দেশে বাবা দিবস পালিত হয়। তৃতীয় রবিবার হিসেবে এ বছর আজ ২১ জুন পালিত হচ্ছে বাবা দিবস। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯০৮ সালে প্রথম বাবা দিবস উদযাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার ফেয়ারমন্টে ৫ জুলাই এই দিবস পালন করা হয়। ১৯৬৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তত্কালীন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসন জুন মাসের তৃতীয় রবিবারকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাবা দিবস হিসেবে নির্ধারণ করেন। ১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন প্রতি বছর জাতীয়ভাবে বাবা দিবস পালনের রীতি চালু করেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং স্যাট টিভির তুমুল প্রচার দাক্ষিণ্যে বাবা দিবস ঘটা করেই পালিত হচ্ছে। বাবার জন্য এক দিন কেন! কেউ কেউ বলে থাকেন, বাবা দিবসটা ঠিক আমাদের জন্য নয়। এটি মূলত পাশ্চাত্যের। বাবার জন্য আমাদের অনুভূতি প্রতিদিনকার। প্রতি অনু-মুহূর্তের। তার জন্য আলাদা দিনের দরকার নেই। কারো কারো অভিযোগ : এ ধরনের দিবসগুলো কর্পোরেট কিছু বিষয়কেই বিজ্ঞাপিত করে। বেনিয়ারা ধুন্ধুমার ব্যবসার মওকা খোঁজে। এদিন বৃদ্ধাশ্রমে থাকা বাবাটি দীর্ঘদিন পর দেখা পান প্রিয় সন্তানের। বাংলাদেশে অনেক সন্তান তাদের পিতাকে ভাবে অভাজন। পিতার বুকফাটা আর্তনাদ না শোনার মতো সন্তানও এই সমাজে আছে।