বর্তমান বিশ্ব এক অস্থির সময় অতিক্রম করিতেছে। যুদ্ধ, রাজনৈতিক মেরুকরণ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জলবায়ু সংকট এবং সামাজিক বিভাজন দেশে দেশে মানুষের মনে ব্যাপক উদ্বেগ ও অস্থিরতা বৃদ্ধি করিয়াছে। আর ইহার অভিঘাতে ব্যক্তি হইতে রাষ্ট্র পর্যন্ত সর্বত্রই পরিলক্ষিত হইতেছে ধৈর্যের ঘাটতি ও সহনশীলতার সংকট। অনেক ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র মতভেদও রূপ লইতেছে বৃহৎ সংঘাতে। অথচ প্রতিটি সংকটের মধ্যেই সমাধানের পথ নিহিত থাকে সংযম, ধৈর্য ও আপস-মীমাংসার মানসিকতায়। সম্প্রতি চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার কেশবপুর গ্রামের একটি ঘটনা এই সত্যকে নূতন করিয়া স্মরণ করাইয়া দিল। পত্রিকান্তরে জানা যায়, দীর্ঘ দুই যুগেরও অধিক সময়ের বিরোধ, দফায় দফায় সংঘাত-সংঘর্ষ, মামলা-মোকদ্দমা ও সামাজিক বিভক্তির অবসান ঘটাইয়া দুই পক্ষ অবশেষে সমঝোতার পথে উপনীত হইয়াছে। স্থানীয় পুলিশের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও মধ্যস্থতায় সংঘটিত এই মহৎ উদ্যোগ কেবল একটি গ্রামের শান্তিই ফিরাইয়া আনে নাই; গোটা সমাজের জন্যই স্থাপন করিয়াছে এক শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত। দীর্ঘদিনের শত্রুতা যেইখানে ব্যর্থ হইয়াছে, সংলাপ ও সদিচ্ছা, তথা 'আর্ট অব কম্প্রোমাইজ' সেইখানে সফলতা অর্জন করিয়াছে-যাহা অনুকরণীয় শিক্ষা বটে।
মানবসভ্যতার ইতিহাস মূলত সংঘাত ও সমঝোতার ইতিহাস। ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র কিংবা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল-প্রতিটি স্তরেই মতভেদ, স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও বিরোধের উপস্থিতি স্বাভাবিক: কিন্তু ইতিহাস বারবার ইহাও প্রমাণ করিয়াছে যে, বলপ্রয়োগ, প্রতিশোধস্পৃহা কিংবা প্রতিপক্ষকে 'মূলোৎপাটন' বা পরাভূত করিবার প্রয়াস কখনোই কোনো বিরোধের স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করিতে পারে না। সংঘাতের অবসান ঘটিলেও তাহার ক্ষত ও বিষক্রিয়া দীর্ঘকাল সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনে বহমান থাকে। পক্ষান্তরে সংলাপ, সমঝোতা, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তিতেই প্রতিষ্ঠিত হয় স্থায়ী শান্তি, সামাজিক স্থিতি এবং সভ্যতার অগ্রযাত্রা।
ইতিহাস বিশ্লেষণে পাওয়া যায়-অগপতি যুদ্ধ বা সংঘাত বহু রক্তপাত ঘটাইয়া শেষ পর্যন্ত নিষ্পত্তি লাভ করিয়াছে আলোচনার টেবিলে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দেখা যায়, যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হয়, মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতিও তত বৃদ্ধি পায়। তবে বিবদমান পক্ষগুলিকে শেষ পর্যন্ত ফিরিয়া আসিতে হয় আলোচনা ও সমঝোতার পথেই-ইহাই যেন অনিবার্য নিয়ম। বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাত, বিশেষত মধ্যপ্রাচ্য বা পূর্ব ইউরোপের যুদ্ধ পরিস্থিতিও এই বাস্তবতার প্রতি ইঙ্গিত করে। যুদ্ধবিরতি, শান্তি আলোচনা কিংবা কূটনৈতিক উদ্যোগ-সকল কিছুই মূলত সমঝোতার পথ উন্মুক্ত করিবার প্রয়াস। ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি, গুড ফ্রাইডে চুক্তি, গাজায় যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ কিংবা সাম্প্রতিক ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা প্রভৃতি সকল আপসরফাই এই সত্যের সাক্ষ্য বহন করে।
ব্যক্তিজীবনেও সমঝোতার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। পরিবার, কর্মক্ষেত্র কিংবা সামাজিক সম্পর্কে অহংকার ও অনমনীয়তা অনেক সময় দূরত্ব ও বিরোধ সৃষ্টি করে। পক্ষান্তরে, সহমর্মিতা, ক্ষমাশীলতা ও পরস্পরের অবস্থান বুঝিবার মানসিকতা সম্পর্ককে করে তোলে মসৃণ ও সুদৃঢ়। অনুরূপভাবে, ধর্মীয় শিক্ষাও কি আমাদের একই বার্তা প্রদান করে না? যেমন-ইসলাম ধর্ম ধৈর্য, সংযম এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করিয়াছে। পবিত্র কোরআনে ধৈর্যশীলদের জন্য সুসংবাদের কথা বলা হইয়াছে এবং বিবাদ নিরসনে ন্যায়ভিত্তিক মীমাংসাকে উৎসাহিত করা হইয়াছে। মহানবি হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর জীবনেও বহু দৃষ্টান্ত রহিয়াছে, যেইখানে তিনি প্রতিশোধের পরিবর্তে আপস, সহনশীলতা ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে বৃহত্তর শান্তি প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন। প্রসঙ্গত, আমরা স্মরণ করিতে পারি হুদাইবিয়ার সন্ধি-সমঝোতার কথা, ইসলামের ইতিহাসে যাহা এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আপাতদৃষ্টিতে কঠিন ও অসম শর্ত সত্ত্বেও মহানবি (স.) বৃহত্তর শান্তি ও কল্যাণের স্বার্থে সেই চুক্তি গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে ইহাই ইসলামের জন্য এক যুগান্তকারী সাফল্যের দ্বার উন্মোচন করে। এই ঘটনা শিক্ষা দেয়, ধৈর্য ও সমঝোতা কখনো দুর্বলতা নহে, বরং উহা দূরদর্শী নেতৃত্বের পরিচায়ক। এই সকল ঘটনা বা ইতিহাসের চর্চা আমাদের জীবনপথের নানাবিধ সমস্যা-সংকটে পাথেয় নিঃসন্দেহে।
অতএব, বিরোধের আগুনে ঘৃতাহুতি প্রদান নহে, বরং সংলাপের দ্বার উন্মুক্ত রাখাই হউক সকল ক্ষেত্রে টিকসই সমাধানের পথ। এই কারণেই আজিকার অস্থির-সংঘাতময় বিশ্বে ব্যক্তি হইতে রাষ্ট্র, রাষ্ট্র হইতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল-সর্বত্র সমঝোতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা এবং তাহার প্রতি অবিচল আনুগত্য অপরিহার্য। মনে রাখিতে হইবে, স্থায়ী বিজয় কখনো ধ্বংসের মাধ্যমে আসে না; ইহা আসে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মধ্য দিয়াই, যাহা চুয়াডাঙ্গার প্রত্যন্ত অঞ্চলের ঘটনাটি চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়া দিল।