বুধবার, ২৯ মে ২০২৪, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

ইসরাইল-ইরান সংঘাতে কি জ্বালানিসংকট আসছে?

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ০৭:৪০

ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের মধ্যেই ইরানের সঙ্গে নতুন করে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে ইসরাইল। চলতি মাসের একেবারে প্রথম দিন সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে ইরানি কনস্যুলেটে হামলা চালায় ইসরাইল। এর জবাবে ১৩ এপ্রিল দিবাগত রাতে ইসরাইলকে লক্ষ্য করে তিন শতাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। তেহরানের হামলায় তেল আবিবের তেমন একটা ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বটে, তবে বিভিন্ন সূত্রের বরাতে জানা যাচ্ছে, ইরানে শিগিগরই পালটা হামলা চালানোর বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে ইসরাইলের যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভা। বলা বাহুল্য, ইসরাইল যদি ইরানে সত্যি সত্যিই আক্রমণ করে বসে, তাহলে গাজা যুদ্ধের কারণে আগে থেকেই অস্থিতিশীল হয়ে ওঠা মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল আরো উত্তপ্ত হয়ে উঠবে। বিশেষ করে, ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে বড় ধরনের সংঘাত সৃষ্টি হলে তার প্রভাব পড়বে জ্বালানি তেলের বাজারে।

কোনো সন্দেহ নেই, ইসরাইলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরো বেড়েছে। একই সঙ্গে বিরাজ করছে বৃহত্তর সংঘাত সৃষ্টির উদ্বেগজনক পরিস্থিতি। ঠিক এমন একটি অবস্থায় জ্বালানি তেলের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠা অস্বাভাবিক নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

মনে রাখা দরকার, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পায় বেশ খানিকটা। এক ধরনের সংকট শুরু হয় জ্বালানির বাজারে। দুঃখজনকভাবে ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যেই শুরু হয় গাজা যুদ্ধ। ফলে নতুন করে ইরান-ইসরাইল সংঘাত শুরু হলে জ্বালানি তেলের দাম অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে নিশ্চিতভাবে, যা ইতিমধ্যে দৃশ্যমান। আমরা দেখেছি, ইসরাইলে ইরানের হামলার ঠিক পরের দিনই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বেড়ে যায় ১ দশমিক ৩৪ শতাংশ। আরো উদ্বেগজনক কথা, মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টির ফলে এনার্জি সাপ্লাই চেইন ব্যাহত হবে মারাত্মকভাবে।

অতীত অভিজ্ঞতা বলে, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায় হুহু করে। প্রথমেই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়ে জ্বালানি তেল বিক্রির স্টেশনগুলোতে। এতে করে শাকসবজি ও নিত্য পণ্যসামগ্রী পরিবহনের খরচ বেড়ে যায় কয়েক গুণ। ফলে মূল্যস্ফীতির পাগলা ঘোড়া ক্রমশ টালমাটাল করে তোলে দেশের অর্থনীতিকে। উদ্বিগ্ন হওয়ার বিষয় বটে!

ইউনাইটেড স্টেটস এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের বক্তব্য, বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে ইরানের ভূমিকা মাত্র ২ শতাংশ। এর অর্থ এই নয় যে, ইরান সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে জ্বালানির বাজারে তার প্রভাব পড়বে না। বরং জ্বালানি যেখান থেকেই আসুক (উত্পাদন-রপ্তানি) না কেন, কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে প্রতিটি অঞ্চল।

আমরা লক্ষ করে আসছি, বিশ্বব্যাপী তেলের দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হয়, বেঁধে দেওয়া হয়। জ্বালানি তেল উত্পাদনকারী দেশগুলোর সংগঠন ‘ওপেক’ এই মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে কলকাঠি নাড়ে। বিশ্বের বেশির ভাগ তেল রপ্তানি নিয়ন্ত্রিত হয় ওপেকের মাধ্যমে। ১৯৬০-এর দশকে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থায় ইরান, ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব ও ভেনিজুয়েলার বড় ধরনের কর্তৃৃত্ব আছে। ফিরে দেখার বিষয়, ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে বৈশ্বিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সময় ওপেক সদস্যদের হস্তক্ষেপে জ্বালানির বাজার নিয়ন্ত্রিত হতো। সে সময় দফায় দফায় ব্যাপক হারে মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে। আসলে, ওপেকভুক্ত দেশগুলো একসঙ্গে বসে ঠিক করত, জ্বালানির বাজার কী মাত্রায় নিয়ন্ত্রণ করা হবে। অবশ্য সেই দিন এখন আর নেই!

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, ওপেকের ১৩টি সদস্য দেশ বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ তেল উত্পাদন করে থাকে, যা বিশ্বব্যাপী পেট্রোলিয়াম বাণিজ্যের প্রায় ৬০ শতাংশ। তবে ওপেকভুক্ত দেশের বাইরেও বর্তমানে কিছু দেশ তেল উত্পাদন করছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। নন-ওপেক তেল উত্পাদক দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে—মেক্সিকো, কাজাখস্তান, আজারবাইজান ও মালয়েশিয়া। এসব দেশ জ্বালানির বাজারে চোখে পড়ার মতো অবদান রাখতে শুরু করেছে। নিচের উদাহরণে বিষয়টা পরিষ্কার হবে।

২০২২ সালে ওপেকভুক্ত দেশগুলোর দৈনিক তেল রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২৮.৭ মিলিয়ন ব্যারেল। এর বিপরীতে নন-ওপেক উত্পাদনকারী দেশগুলোর দৈনিক রপ্তানি ছিল ১৬.৫ মিলিয়ন ব্যারেল। অর্থাত্, বর্তমানে জ্বালানির বাজার নিয়ন্ত্রণ করার তেমন সুযোগ নেই ওপেকভুক্ত দেশগুলোর হাতে। বিশেষ করে, জ্বালানি তেলের প্রশ্নে পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য ইরান এখন আর আগেকার সেই নিয়ন্ত্রকের আসনে নেই।

২০১৯ সালে পরমাণু কর্মসূচি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ। এরপর থেকে তেলের পুনঃ ব্র্যান্ডিং শুরু করার পথ ধরে তেহরান। তেল পরিশোধন ও বিক্রির ক্ষেত্রে নানান কৌশলের আশ্রয় নিতে থাকে। এসবের পরও বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে ইরানের গুরুত্ব কমে এসেছে ক্রমাগতভাবে। বর্তমানে ইরানি তেলের প্রধান ক্রেতা হচ্ছে চীন। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার পর থেকে তেল কেনার ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ছাড় পাচ্ছে বেইজিং।

মনে থাকার কথা, গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে গত বছরের শেষের দিক থেকে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সুয়েজ খালে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে হামলা চালাতে শুরু করে। এর ফলে সুয়েজ খালে জাহাজ চলাচল কমে যায় ব্যাপক মাত্রায়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এক হিসাব অনুসারে, হুতিদের আক্রমণের মুখে সুয়েজে জাহাজ চলাচল হ্রাস পেয়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। সমস্যা মূলত এখানেই। ইরানের হামলার জবাবে ইসরাইল যদি পালটা হামলা করে বসে (যেমনটা আশঙ্কা করা হচ্ছে), তাহলে প্রতিশোধ নিতে হরমুজ প্রণালিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা চালাবে তেহরান। এই জলপথ দিয়ে বৈশ্বিক সামুদ্রিক তেল বাণিজ্যের এক-চতুর্থাংশ সম্পন্ন হয়। অর্থাৎ, হরমুজ প্রণালি আক্রান্ত হওয়ার অর্থ হচ্ছে বিশ্বব্যাপী তেলের বাজার শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পড়া! অন্যান্য রুট ব্যবহার করে তেলের সরবরাহ সচল রাখার সুযোগ আছে বটে, কিন্তু তা বেশ সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। তাছাড়া পশ্চিমা দেশগুলোর হাতে হরমুজ প্রণালির বিকল্প রুট খুব কমই আছে।

মার্কিন বুশ প্রশাসনের জ্বালানিবিষয়ক সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও বর্তমানে র্যাপিডান এনার্জির প্রেসিডেন্ট বব ম্যাকন্যালি মনে করেন, ইরান-ইসরাইল সংঘাতের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুড অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে ১০০ মার্কিন ডলারে উঠে যেতে যারে। আর উত্তেজনা ব্যাপক আকার ধারণ করার মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক তেল-বাণিজ্যের অন্যতম রুট হরমুজ প্রণালিতে যদি সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটে, তাহলে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম বেড়ে ১২০ থেকে ১৩০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে।

বাস্তবতা হলো, মধ্যপ্রাচ্যে কোনো দ্বন্দ্ব-সংঘাত বা সংকট দেখা দিলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে জ্বালানি তেলের ওপর। অবস্থা কতটা মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছায়, ১৯৭৩ সালের অক্টোবর মাসে তা বেশ ভালোমতোই টের পেয়েছিল পশ্চিমা বিশ্ব। ’৭৩ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে ইসরাইলকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিবাদে তত্কালীন সৌদি বাদশাহ ফয়সাল বিন আব্দুল আজিজ এবং মিশরের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আনোয়ার আল-সাদাত পশ্চিমা বিশ্বে তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেন। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম এতটাই বেড়ে যায় যে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ভিত নড়বড়ে পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়।

যতক্ষণ না ইরানে পালটা হামলা করছে ইসরাইল, খুব বেশি চিন্তার কারণ নেই। তবে প্রস্তুত থাকতে হবে বিশ্বের প্রতিটি দেশকে। সরকারগুলোর উচিত হবে নির্ভরযোগ্য ও নিকটবর্তী অংশীদারদের কাছ থেকে তেল সরবরাহ সুরক্ষিত করার বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দেখা। দেশীয় উত্পাদন বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেওয়াও আজকের দিনে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এসব উদ্যোগ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলা সহজতর হবে অনেকাংশে। আবারও স্মরণ করিয়ে দিতে হয়, ইরান-ইসরাইল সংঘাতের হাত ধরে যদি কোনোভাবে হরমুজ প্রণালি আক্রান্ত হয়ে পড়ে, তাহলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের বাজার অস্থির হয়ে উঠবে। আর এর জের ধরে দেশে দেশে টালমাটাল হয়ে পড়বে অর্থনৈতিক অঙ্গন।

লেখক: এডিথ কোওয়ান ইউনিভার্সিটির স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ল-এর অ্যাসোসিয়েট ডিন
দ্য কনভারসেশন থেকে অনুবাদ: সুমৃৎ খান সুজন

ইত্তেফাক/এসটিএম