ধর্ষণ ও ভ্রূণ নষ্টের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতা জিসান মিয়া প্রধানকে দুই দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে কুমিল্লার আদালতে হাজির করা হয়। পরে আদালত জিসানকে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দিয়েছেন।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) বিকেল ৪টা ৪০ মিনিটে কুমিল্লার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ৩ নম্বর আমলি আদালতের বিচারক তৈয়র উদ্দিন আহমেদ এ আদেশ দেন। এর আগে গত রোববার একই আদালত জিসানের দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছিলেন।
জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শামসুল আলম শাহ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী জিসান মিয়া প্রধানকে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
আইনজীবীরা জানান, দাউদকান্দির এক বিধবা নারীকে ধর্ষণ এবং ভ্রূণ নষ্ট করার অভিযোগে করা মামলায় কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে থাকা জিসান মিয়াকে গত রোববার দুপুরে আদালতে হাজির করা হয়। পরে কুমিল্লার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ৩ নম্বর আমলি আদালতের বিচারক তৈয়র উদ্দিন আহমেদের আদালতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। শুনানি শেষে আদালত দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পরে ওই দিন বিকেলেই জিসানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় ডিবি পুলিশ।
জিসান মিয়ার আইনজীবী মনির হোসেন পাটোয়ারী বলেন, ‘আজকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওসি শামসুল আলম শাহ দুই দিনের রিমান্ড শেষে জিসানকে আদালতে হাজির করেন। পরে আদালত তার শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। এরপর সবকিছু ঠিকঠাক থাকায় জিসানকে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রেরণ করেছেন। আজকে ডিবি পুলিশ এবং আসামিপক্ষ থেকে নতুন কোনো আবেদন করা হয়নি। আমরা গত রোববার জামিন আবেদন করেছিলাম; আদালত সেটি নামঞ্জুর করেছেন।’
মঙ্গলবার বিকেলে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জেলা ডিবি পুলিশের ওসি শামসুল আলম শাহ বলেন, ‘আদালতের দেওয়া জিজ্ঞাসাবাদের সময় শেষ হওয়ায় জিসানকে আদালতে হাজির করা হয়েছে। পরে আদালত তাকে কারাগারে প্রেরণ করেছেন।’
রিমান্ড প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদে জিসান কী তথ্য দিয়েছেন, সেটি তদন্তের স্বার্থে এখন বলা যাচ্ছে না।’
এর আগে ১৬ জুন জিসান মিয়াকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন একই আদালতের বিচারক। তার আগে চার দিন পুলিশি পাহারায় কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গঠিত মেডিক্যাল বোর্ড তাকে সুস্থ বলে মত দেওয়ার পর ১৬ জুন দুপুরে তাকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়।
জিসান মিয়া প্রধান ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সহকারী আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক এবং সংগঠনটির কুমিল্লা জেলা পশ্চিম শাখার সাবেক সভাপতি। ইতিমধ্যে তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। কুমিল্লার দাউদকান্দির এক বিধবা নারী তাকে প্রধান আসামি করে ধর্ষণ ও ভ্রূণ নষ্টের অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় জিসানসহ চারজনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার অপর তিন আসামিও ওই মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচয়ের পর ওই নারীর সঙ্গে জিসানের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তাকে একাধিকবার ধর্ষণ করা হয় এবং অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর ভ্রূণ নষ্ট করতে বাধ্য করা হয়। পরে বিয়ের জন্য চাপ দিলে জিসান আত্মগোপনে চলে যান বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অবশ্য জিসানের পরিবার দাবি করে আসছিল, তিনি অপহরণের শিকার হয়েছিলেন। এ বিষয়ে তার স্বজনেরা থানায় সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেন। তবে পুলিশ বলছে, জিসানকে কেউ অপহরণ করেনি; বিয়ে এড়াতে তিনি নিজেই আত্মগোপনে ছিলেন।
জেলা পুলিশ জানায়, ১১ জুন রাতে জিসান নিখোঁজ হয়েছেন জানিয়ে তার চাচাতো ভাই রাসেল আহম্মেদ দাউদকান্দি মডেল থানায় জিডি করেন। জিডির পর জেলা পুলিশের একাধিক দল তাকে উদ্ধারে তৎপরতা শুরু করে।
অনুসন্ধানকালে পুলিশ জানতে পারে, কয়েক মাস আগে ফেসবুকের মাধ্যমে এক বিধবা নারীর সঙ্গে জিসানের পরিচয় হয় এবং তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্রেমের সম্পর্কের জের ধরে অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর জিসান ওই নারীকে ভ্রূণ নষ্ট করার জন্য চাপ দেন এবং একপর্যায়ে ওষুধ সেবনের মাধ্যমে গর্ভপাত ঘটানো হয়। পরে ওই তরুণী জিসানকে বিয়ের জন্য চাপ দিলে তিনি ১২ জুন বিয়ে করবেন বলে সম্মতি দেন। তবে বিয়ে এড়াতে ১১ জুন রাতেই তিনি নাটক সাজিয়ে আত্মগোপনে চলে যান। নিখোঁজের অনুসন্ধান চলাকালে ১২ জুন রাতে লাকসাম এলাকা থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। ওই দিন রাতেই ভুক্তভোগী নারী মামলাটি করলে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জিসানকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ।