সাইপ্রাসের জঙ্গলে পাতা দিয়ে ঢেকে রাখা ছিল বাংলাদেশি যুবকের মরদেহ

সাইপ্রাসে এক বাংলাদেশি যুবককে হত্যার পর তার মরদেহ একটি জঙ্গলে পাতা দিয়ে ঢেকে রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে। নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার উত্তর বাখরনগর ইউনিয়নের লোচনপুর গ্রামের গ্রিসপ্রবাসী নাসির মিয়ার ছেলে শাহরিয়ার আহমেদ ইমনকে (২২) হত্যার পর মরদেহ গুম করার চেষ্টা করে অপহরণকারী চক্র।

হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহে গত রোববার (২১ জুন) শাহীন বাবু (২২) নামে এক বাংলাদেশিকে সাইপ্রাস পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে বলে দাবি করেছে নিহত ইমনের পরিবার।

প্রায় তিন মাস আগে স্টুডেন্ট ভিসায় সাইপ্রাসে যায় ইমন। সেখানে তিনি লারনাকার ওরোক্লিনি এলাকায় বসবাস করতেন।

শাহরিয়ারের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, গত ঈদুল ফিতরের রোজার শেষের দিকে শাহরিয়ার স্টুডেন্ট ভিসায় সাইপ্রাসে যান। বিদেশে যাওয়ার আগেই অনলাইনে সেখানকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তার পরিবার মাসিক খরচ বাবদ ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা তাকে পাঠাতো। পরিবারের উপর চাপ কমাতেই শাহরিয়ার কাজের সন্ধান করতে থাকে। এক পর্যায়ে কাজের সন্ধান পান।

গত ১১ জুন বিকেলে তার মায়ের সঙ্গে সর্বশেষ করা হয়। তিনি তার মাকে জানান, কাজের ব্যবস্থা হয়েছে। সেদিন রাত থেকে ডিউটি শুরু হবে। কাজ পাওয়ার কথাটি তার প্রবাসী বাবা ও তার রুমম্যাট রায়হান মিয়াকে জানায় ইমন।

রায়হান তাকে বলেছিলেন, ‘সেখানে গিয়ে লোকেশন পাঠাস।’ কোনো প্রয়োজন হলে যেন যোগাযোগ করা যায় সহজে। স্থানীয় সময় রাত ৯টায় কাজের স্থানে পৌঁছে রায়হানের কাছে হোয়াটসঅ্যাপে লোকেশন পাঠায় ইমন। কিছুক্ষণ পর রায়হান ফিরতি মেসেজে ‘ওকে’ লিখলেও তা আর সিন করেনি শাহরিয়ার। কিন্তু রাত ১০টার দিকে শাহরিয়ারের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকেই বাবা নাসির মিয়ার কাছে একটি ম্যাসেজ পাঠানো হয়। তাতে লেখা ছিল, ‘আপনার ছেলেকে কিডন্যাপ করেছি। ছেলেকে ফিরে পেতে চাইলে ৩৫ হাজার ইউরো দিতে হবে (যা বাংলাদেশি টাকায় ৫০ লাখ)। যদি দেন ছেলেকে ফিরে পাবেন, না দিলে তার চোখ ও কিডনি খুলে বিক্রি করে দেব। রাতেই বাবা পরিবারের সদস্যদের ঘটনাটি জানান।

তবে সবাই ভেবে ছিল, হয়তো ইমনের হোয়াটসঅ্যাপ আইডি ‘হ্যাকড’ হয়েছে। পরদিন ১২ জুন সকালে কাজ থেকে আর ফিরে আসেনি ইমন। এরপরই রায়হান ওখানকার স্থানীয় পুলিশ স্টেশনে গিয়ে রিপোর্ট করেন। পরে পুলিশের সাথে ওই লোকেশনে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে ২৪ ঘণ্টা ধরে অনলাইনে সচল ছিল ইমনের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর এবং প্রতিদিনই পরিবারের কাছে মুক্তিপণের টাকা চাইছিলো অপহরণকারীরা।

ইমনের ভাই নয়ন আহমেদ বলেন,

ইমনের কোনো খোঁজ না পেয়ে এক পর্যায়ে আমরা মুক্তিপণের টাকা পাঠাতে রাজি হই এবং দর-কষাকষির মাধ্যমে বাংলাদেশি টাকায় পাঁচ লাখে চুক্তি হয় অপহরণকারীদের সঙ্গে। পরে রোববার দুপুরে চুক্তি অনুযায়ী টাকা পাঠাতে যাই ব্যাংকে। ওখানে গিয়ে ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হয়ে টাকা পাঠাবার সিদ্ধান্ত নেই এবং অপহরণকারী কাছে থাকা আমার ভাইয়ের মোবাইল ফোন দিয়ে ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে চাই। কিন্তু অপহরণকারীদের কথাবার্তায় ও আচরণে সন্দেহ হলে টাকা না দিয়ে বাড়ি ফিরে আসি।

তিনি আরও বলেন, ‘এক পর্যায়ে দেখি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরটি অফলাইনে চলে যায়। ওই দিন রাতেই জানতে পারি সাইপ্রাস পুলিশ শাহীন বাবু নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে এবং তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওখানকার একটি জঙ্গল থেকে পাতা দিয়ে ঢাকা আমার ভাইয়ের মরদেহ উদ্ধার করে।’

তবে গ্রেপ্তার ওই তরুণ শাহীন বাবুর বাড়ি বাংলাদেশের কোন এলাকায়, তা নিশ্চিত করতে পারেন নি নয়ন আহমেদ।

রায়পুরার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাসুদ রানা বলেন, সাইপ্রাসে এক শিক্ষার্থী অপহরণের পর হত্যার শিকার হয়েছে। সে ঘটনায় এক বাংলাদেশিকে ওখানকার পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে বলে শুনেছি। তবে বিষয়টি সাইপ্রাসের দূতাবাস থেকে এখন পর্যন্ত আমাদের অফিশিয়ালি জানানো হয়নি। নিহত তরুণের পরিবারের পক্ষ থেকেও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি। তারা যদি সহযোগিতা চায়, মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।