মানবতার পরীক্ষায় আমরা কোথায়?

মানুষকে আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব বলা হয় তাহার জ্ঞান, বিবেক ও মানবিকতার জন্য; কিন্তু যখন কোনো বিপন্ন মানুষের আর্তনাদ খোদ তাহার স্বজাতিরই হৃদয় স্পর্শ করে না, যখন দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে উদ্ধার করিবার পরিবর্তে আমরা তাহার সম্পদ লইয়া ব্যস্ত হইয়া পড়ি, কিংবা দুর্যোগে বিধ্বস্ত মানুষের সর্বস্ব লুট করিতে দ্বিধাবোধ করি না, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে-আমরা কি সত্যিই ‘সৃষ্টির সেরা জীব’-এই শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা ধারণ করিতেছি? 

সম্প্রতি বাংলাদেশে ঘটিয়া যাওয়া একটি মর্মান্তিক ঘটনা সমগ্র জাতির বিবেককে নাড়া দিয়া গিয়াছে। কুমিল্লার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে মাছভর্তি একটি পিকআপ দুর্ঘটনাক্রমে খালে পড়িয়া গেলে চালক যখন গাড়ির ভিতরে আটকা পড়িয়া জীবন রক্ষার জন্য আকুল চেষ্টা করিতেছিলেন, তখন তাহাকে উদ্ধারে আগাইয়া আসিবার পরিবর্তে আশপাশের লোকজন খালে ঝাঁপাইয়া পড়ে মাছ লুট করিতে। মুহূর্তের মধ্যেই জীবন্ত মাছ বালতি, বস্তা ও পলিথিনে ভরিয়া লইয়া যাওয়া হয়। অথচ অসহায় চালক ও তাহার সহকারীকে শেষ পর্যন্ত নিজেদের চেষ্টাতেই প্রাণ বাঁচাইয়া বাহির হইতে হয়। দুর্ঘটনার মুহূর্তে এমন নির্মম উদাসীনতা কেবল আইনের নয়, মানবিকতারও চরম বিপর্যয়।

ঠিক একই চিত্র পুনরায় প্রত্যক্ষ করা গেল বিদেশের মাটিতে-ভূমিকম্পকবলিত ভেনিজুয়েলায়। ভয়াবহ ভূমিকম্পে অসংখ্য মানুষ যখন ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়িয়া জীবন-মৃত্যুর সহিত লড়িতেছে, তখন একদল দুর্বৃত্ত তাহাদের উদ্ধার করিবার পরিবর্তে দোকানপাট, ঘরবাড়ি, অফিসের মালামাল এমনকি ফার্মেসি পর্যন্ত লুট করিতে ব্যস্ত হইয়াছে। ভূমিকম্পের ন্যায় দুর্যোগের মুহূর্তে মানুষের বিপন্নতাকে এইভাবে সুযোগে পরিণত করা কি সভ্যতার পরিচায়ক হইতে পারে? অবশ্য, সেই ধ্বংসস্তূপের মধ্য হইতে মানবতার এক অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্তও বিশ্ববাসীর হৃদয় স্পর্শ করিয়াছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়াইয়া পড়া এক ছবিতে দেখা যায়, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়িয়া আছেন এক পিতা। তাহার শরীরের একটি অংশ বাইরে থাকিলেও অপর অংশ কংক্রিটের নিচে আটকা। উদ্ধারকর্মীরা তাহাকে টানিয়া তুলিতে চাইলে তিনি অনুরোধ করেন-তাহার হাত যেন না টানা হয়। কারণ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া সন্তানরা এখনো সেই হাত আঁকড়াইয়া ধরিয়া আছে। মৃত্যু যখন সম্মুখে উপস্থিত, তখনো একজন পিতার হৃদয়ে নিজের প্রাণের পূর্বে স্থান পাইয়াছে সন্তান। ইহাই যেন মানবতার প্রকৃত রূপ, সভ্য সমাজের মানুষের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য।

আজকাল প্রায়ই দেখা যায়, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তি সাহায্যের জন্য ছটফট করিতেছেন, আর অনেকেই তাহাকে উদ্ধার না করিয়া মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণে ব্যস্ত। মানবিকতার স্থানে যখন কৌতূহল, দায়িত্ববোধের স্থানে যখন আত্মস্বার্থ স্থান লাভ করে, তখন সমাজের নৈতিক ভিত্তিই দুর্বল হইয়া পড়ে। বিবেককে জাগ্রত করিবার পরিবর্তে আমরা যদি বিপন্ন মানুষের সম্পদ লুণ্ঠনে ব্যস্ত হই, তাহা হইলে সৃষ্টির সেরা জীব বলিয়া নিজেদের দাবি করিবার নৈতিক ভিত্তি কোথায়? আমরা প্রায়শই ভুলিয়া যাই, বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানো কেবল সামাজিক দায়িত্ব নহে; ইহা ইমান ও কৃতজ্ঞতারও বহিঃপ্রকাশ। ধর্মীয় শিক্ষাও ইহাই। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলিয়াছেন, ‘যে ব্যক্তি একটি প্রাণকে রক্ষা করিল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকেই রক্ষা করিল।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত ৩২)। ধর্মশিক্ষায় আরও বলা হয়, ‘জীবে দয়া করে যেই জন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।’ 

সুতরাং, সৃষ্টিকুলের অংশ হিসাবে কেন আমরা জীবের প্রতি সদয় আচরণ করিব না? তাহদের বিপদে আগাইয়া যাইব না? ইতিহাসে এমন বহু দৃষ্টান্ত রহিয়াছে, যেইখানে মানুষ নিজের জীবন বিপন্ন করিয়াও অপরকে রক্ষা করিয়াছে। আত্মত্যাগ ও মানবতার সেই শিক্ষাই তো ইতিহাসে তাহাদের করিয়া রাখিয়াছে চিরস্মরণীয়-বরণীয়। বিজ্ঞজনেরা বলিয়া থাকেন, মানবসভ্যতার প্রকৃত শক্তি প্রযুক্তি, অর্থ কিংবা অট্টালিকায় নহে। বরং মানুষের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতায়। দুর্যোগ, দুর্ঘটনা কিংবা বিপদের মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তা আমাদের মানবতার পরীক্ষা গ্রহণ করেন। সেই পরীক্ষায় যদি আমরা ব্যর্থ হই, তাহা হইলে সকল গর্বই কি অর্থহীন হইয়া যাইবে না?