ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি হামলায় যুদ্ধবিরতি হুমকিতে

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি হামলা এবং একে অপরকে দোষারোপের কারণে দুই দেশের নাজুক যুদ্ধবিরতি আবার চাপে পড়েছে। নতুন করে উত্তেজনায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে হওয়া প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা জোরালো হয়েছে।

হরমুজ প্রণালিতে শনিবার (২৭ জুন) একটি তেলবাহী জাহাজে অজ্ঞাত একটি প্রজেক্টাইল আঘাত হানার পর নতুন করে উত্তেজনা শুরু হয়। যুক্তরাজ্যের সমুদ্র নিরাপত্তাবিষয়ক সংস্থা ইউকেএমটিও জানায়, হামলায় জাহাজটির নিয়ন্ত্রণকক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও নাবিকেরা সবাই নিরাপদে আছেন। গত কয়েক দিনের ঘটনায় হরমুজে জাহাজ চলাচলে নিরাপত্তাঝুঁকির মাত্রা বাড়িয়েছে যৌথ সামুদ্রিক তথ্যকেন্দ্র (জেএমআইসি)।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলে দেশটির বিভিন্ন স্থাপনায় তারা হামলা চালিয়েছে।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, হরমুজ প্রণালিতে গত বৃহস্পতিবার একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের ড্রোন হামলার জবাবে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণাগার এবং উপকূলীয় রাডার নিশানা করে হামলা চালানো হয়েছে। সেন্টকমের দাবি, বাণিজ্যিক নৌযানের ওপর ইরানের হামলা যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন।

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানায়, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় সিরিক বন্দরের তাহেরুই ঘাট এলাকায় শুক্রবার রাতে একটি প্রজেক্টাইল আঘাত হানে। তবে মেহর বার্তা সংস্থার দাবি, হামলার পরও বন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন হামলার ঘটনাকে যুদ্ধবিরতি চুক্তির ‘নির্বোধের মতো লঙ্ঘন’ বলেন মন্তব্য করেছেন। গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স লেখেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি মেনে চলছে। তবে ইরান আবার হামলা চালালে তার জবাব দেওয়া হবে।

ভ্যান্সের ওই মন্তব্যের কিছুক্ষণ পর গতকাল সকালে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে আইআরজিসি। তাদের দাবি, ইরানের অনুমোদিত নৌপথ ছাড়া অন্য নৌপথ দিয়ে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করলে কিছু জাহাজের দিকে সতর্কতামূলক গুলি ছোড়া হয়েছে।

নাজুক যুদ্ধবিরতি

নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলায় ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সই হওয়া সমঝোতা স্মারক (অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি চুক্তি) টিকবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। উভয় পক্ষ একে অন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে।

চূড়ান্ত শান্তিচুক্তির আগে বিস্তৃত আলোচনার ভিত্তি হিসেবে সমঝোতা স্মারকটি করা হয়েছে। এর আওতায় হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলও অন্তর্ভুক্ত।

তবে ইরান বলছে, হরমুজে তাদের অনুমোদন নেই, এমন কোনো নৌপথ ব্যবহার করা যাবে না। একই সঙ্গে তেহরান জোর দিয়ে বলছে, ৬০ দিনের অন্তর্বর্তী সময়ের পর ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করে হরমুজে জাহাজ চলাচলের জন্য নতুন ব্যবস্থা চালু করা হবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এ অবস্থানের বিরোধিতা করছে।

চুক্তির পর হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় তেলের দাম যুদ্ধ-পূর্ব পর্যায়ের কাছাকাছি নেমে এসেছে। তবে বাজার পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত হওয়া জরুরি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালির ওমান উপকূলঘেঁষা দক্ষিণের নৌপথ ব্যবহার করুক। অন্যদিকে তেহরান চায়, জাহাজগুলো ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন উত্তর দিকের নৌপথ ব্যবহার করুক। ইরানের সংসদের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির প্রধান ইব্রাহিম আজিজি বলেছেন, তেহরানের নির্দেশনা অমান্য করা হলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে।

এ পরিস্থিতিতে সমঝোতা স্মারকের শর্ত লঙ্ঘন করে লেবাননে ইসরায়েলের হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও লেবানন একটি কাঠামোগত সমঝোতা চুক্তি সই করেছে। চুক্তির ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শুক্রবার দিবাগত রাতে বৈরুতে হিজবুল্লাহর সমর্থকেরা বিক্ষোভ করেন। তাদের দাবি, দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত তারা এই সমঝোতা মানবেন না। চুক্তির পরও গতকাল লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের নাবাতিয়াহ এলাকায় আবারও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল।

পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সতর্কতা

আল–জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি শুক্রবার বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চূড়ান্ত সমঝোতা হলে তা কার্যকর করতে শক্তিশালী যাচাইব্যবস্থা অপরিহার্য হবে।

গ্রোসির ভাষ্যমতে, ইরান সরকার পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ইচ্ছা নেই বলে জানিয়েছে। কিন্তু শুধু ঘোষণায় হবে না, তা নিশ্চিত করতে কার্যকর যাচাইব্যবস্থা থাকতে হবে।

ওয়াশিংটন–তেহরানের সমঝোতা চুক্তি অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে ইরানের ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা প্রায় ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম আইএইএর তত্ত্বাবধানে নিম্নমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামে রূপান্তর করার কথা রয়েছে।