এআই-বুমের যুগে বাংলাদেশের অবকাঠামোগত প্রস্তুতি কোথায়?

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ান টেক-বিলিয়নিয়ার রবিন খোদার সাম্প্রতিক ভারতে ডেটা সেন্টারে বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশের ছেলে কেন দেশকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে ভারতে এত বড় বিনিয়োগ করছেন, তা নিয়ে হতাশা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু আলোচনাটা সেখানে শেষ না করে আমাদের পরের ধাপে নিয়ে যেতে হবে। যে এআই-বুমকে ঘিরে এই ডেটা সেন্টারে বিনিয়োগ, সেই এআই-বুমের অর্থ বাংলাদেশের জন্য কী?

সারা পৃথিবীর মতো বাংলাদেশেও এআইয়ের ব্যবহার ও চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। একটি গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ChatGPT ব্যবহারের হার ২০২২ সালে প্রায় ৫ শতাংশ ছিল, যা ২০২৫ সালে প্রায় ৪৯ শতাংশে পৌঁছেছে[১]। আইটি পেশাজীবী, ফ্রিল্যান্সার ও স্টার্টআপ কর্মীদের মধ্যে বাস্তব ব্যবহার আরও বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, গবেষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, চিকিৎসক, শিক্ষক, ব্যাংকার—প্রায় সব জ্ঞানভিত্তিক পেশাতেই এআই সহকারীর ব্যবহার আগামী দিনে আরও বাড়বে।

আমরা যখন ChatGPT, Copilot, Gemini বা অন্য কোনো এআই সহকারীকে প্রশ্ন করি, কোড লিখতে বলি কিংবা অনুবাদ করাই—প্রতিবারই মডেলটি চালাতে কম্পিউটিং শক্তি লাগে। কম্পিউটারে মডেল চালিয়ে উত্তর তৈরি করার এই প্রক্রিয়াকে প্রযুক্তির ভাষায় ইনফারেন্স (Inference) বলা হয়। আর টোকেন (Token) হলো এই ব্যবহারের মৌলিক একক। কাজ যত বড়, টোকেনের প্রয়োজনও তত বেশি। দশ লাইনের একটি কবিতা লিখতে হয়তো একশ টোকেন লাগতে পারে, আর দশ পৃষ্ঠার একটি রচনা লিখতে লাগতে পারে পাঁচ হাজার টোকেন। এই টোকেনের চাহিদা পূরণে ডেটা সেন্টারগুলো দিন-রাত ইনফারেন্স চালাচ্ছে। এই টোকেন কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে নতুন এক অর্থনীতি—টোকেন অর্থনীতি (Token Economy)। প্রায় সব এআই কোম্পানি এখন বাজার দখলের জন্য টোকেনের মূল্য ভর্তুকি দিয়ে কমিয়ে রাখছে। ২০ ডলারের একটি সাবস্ক্রিপশন কিনে আপনি হয়তো ২০০ ডলারের সমপরিমাণ টোকেন ব্যবহার করছেন।

দেশের এই টোকেন চাহিদার প্রায় পুরোটাই বিদেশি অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। OpenAI, Google, Microsoft, Anthropic বা অন্য বৈশ্বিক সেবাদাতার সার্ভারে আমাদের প্রশ্ন যাচ্ছে, সেখানেই মডেল চলছে, সেখান থেকেই উত্তর ফিরছে। এর তাৎক্ষণিক সুবিধা রয়েছে—বিশ্বমানের সেবা পাওয়া যায়। কিন্তু ঝুঁকিও রয়েছে। দেশের অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে, অবকাঠামো বিদেশে, নীতিমালা বিদেশি, ডেটার ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ সীমিত, আর স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতি বোঝার সক্ষমতাও সব সময় যথেষ্ট নয়। সামনের দিনে ইনফারেন্স সেবার ওপর পরনির্ভরশীলতা বিদ্যুৎ, ব্যান্ডউইথ বা অন্যান্য মৌলিক সেবার ওপর নির্ভরশীলতার মতোই কৌশলগত ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের বর্তমান টোকেন চাহিদা কত, ভবিষ্যতে তা কত বাড়বে, কিংবা দেশের টোকেন উৎপাদন সক্ষমতা ঠিক কত—এ বিষয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য আমি খুঁজে পাইনি। তবে আমাদের বর্তমান ডেটা সেন্টার ও জিপিইউ অবকাঠামো বিবেচনা করলে বলা যায়, এই সক্ষমতা মোটেও যথেষ্ট নয়। আমরা সত্যিকার অর্থেই একটি টোকেন-গরিব দেশ। যেমন একসময় বিদ্যুৎ, ব্যান্ডউইথ বা ডেটা সেন্টারের ঘাটতি উন্নয়নের বড় বাধা ছিল, তেমনি আগামী দিনে কম খরচে, নির্ভরযোগ্যভাবে এবং স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী এআই ইনফারেন্স চালানোর সক্ষমতা বড় প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হয়ে উঠবে। যে দেশের প্রোগ্রামার দিনে কয়েক ঘণ্টা এআই সহকারী ব্যবহার করতে পারবেন, তারা উৎপাদনশীলতায় এগিয়ে থাকবেন। যে দেশের ক্ষুদ্র ব্যবসা কম খরচে কাস্টমার সাপোর্ট, হিসাব বিশ্লেষণ বা ডকুমেন্ট প্রক্রিয়াকরণ করতে পারবে, তারা প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে। আর যে দেশ শুধু বিদেশি সাবস্ক্রিপশনের দামের দিকে তাকিয়ে থাকবে, সে ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়বে।

বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাজারের প্রধান গ্রাহক দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। ফলে মাসে ৫০ ডলার বা তার বেশি দামের এআই সাবস্ক্রিপশন বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী, ফ্রিল্যান্সার ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার নাগালের বাইরে। স্থানীয় মজুরি কাঠামো যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের তুলনায় অনেক কম, কিন্তু এআই সেবার দাম প্রায় একই বৈশ্বিক মানদণ্ডে নির্ধারিত। ফলে উৎপাদনশীলতার এই নতুন হাতিয়ারটি সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত হচ্ছে না।

সরকারের তাই প্রথম কাজ হওয়া উচিত সমস্যাটিকে একটি অবকাঠামোগত সমস্যা হিসেবে দেখা। এটি শুধু সফটওয়্যার ব্যবহারের বিষয় নয়; এটি জ্বালানি, ডেটা সেন্টার, আমদানি শুল্ক, বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা, দক্ষ জনবল এবং বাজারনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। স্বল্পমেয়াদে সরকার কয়েকটি বাস্তব পদক্ষেপ নিতে পারে। প্রথমত, এআই সার্ভার, জিপিইউ, উচ্চগতির নেটওয়ার্কিং যন্ত্রপাতি এবং গবেষণার উপযোগী কম্পিউটিং অবকাঠামোর ওপর শুল্ক ও ভ্যাট কমানো বা প্রত্যাহার করা দরকার। জাতীয় এআই নীতির খসড়ায় এ ধরনের শুল্ক ছাড় ও গবেষণা প্রণোদনার কথা রয়েছে; এখন সেগুলো দ্রুত বাস্তব নীতিতে রূপ দিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, সরকারি অর্থে এককভাবে বিশাল ভাষা মডেল তৈরির আগে স্থানীয় ইনফারেন্স সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়, স্টার্টআপ, সফটওয়্যার কোম্পানি এবং সরকারি সংস্থার জন্য কম খরচে এআই কম্পিউটিং অবকাঠামো ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। সব কাজ প্রথম দিন থেকেই দেশে করতে হবে না। কিন্তু সংবেদনশীল সরকারি তথ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইন এবং বাংলা ভাষাভিত্তিক সেবার জন্য স্থানীয় অবকাঠামো থাকা জরুরি।

তৃতীয়ত, বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে হবে। টেলিকম কোম্পানি, ডেটা সেন্টার অপারেটর, সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান এবং স্টার্টআপগুলো চাইলে স্থানীয় এআই ইনফারেন্স সেবা গড়ে তুলতে পারে। সরকার তাদের জন্য কর ছাড়, বিদ্যুৎ-প্রণোদনা, সহজ ঋণ, গবেষণা অনুদান এবং সরকারি ক্রয়ের নিশ্চয়তা দিতে পারে। রাষ্ট্র নিজে সবকিছু পরিচালনা করবে—এমন মডেল টেকসই নয়। বরং সরকারের কাজ হবে বাজার তৈরি করা, মান নির্ধারণ করা, ঝুঁকি কমানো এবং বেসরকারি খাতকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা।

এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকা হওয়া উচিত কেন্দ্রীয়। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এআই গবেষণা, ডেটাসেট নির্মাণ, মেশিন লার্নিং অপারেশনস (MLOps), হাই-পারফরম্যান্স কম্পিউটিং এবং এআই নিরাপত্তা বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচিতে যুক্ত করতে হবে। প্রতি বছর হাজারো শিক্ষার্থীকে শুধু এআই টুলের ব্যবহারকারী নয়, বরং মডেল মূল্যায়ন, ডেটা প্রকৌশল, ইনফারেন্স অপ্টিমাইজেশন, নিরাপত্তা এবং বাংলা ভাষা প্রযুক্তির নির্মাতা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

এআই সার্বভৌমত্ব মানে বিদেশি প্রযুক্তি বর্জন নয়। বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য সেটি বাস্তবসম্মতও নয়, কাম্যও নয়। আমাদের বৈশ্বিক ক্লাউড, ওপেন-সোর্স মডেল, আন্তর্জাতিক গবেষণা এবং বিদেশি বিনিয়োগ—সবই প্রয়োজন। কিন্তু সার্বভৌমত্বের অর্থ হলো প্রয়োজনের সময় নিজের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করতে পারা। সংবেদনশীল ডেটা দেশে রাখার সক্ষমতা থাকা। বাংলা ভাষার ব্যবহারকারীদের জন্য নিজস্ব মডেল উন্নয়নের ক্ষমতা থাকা। এবং প্রোগ্রামার, গবেষক ও অন্যান্য জ্ঞানকর্মীদের কাছে কম খরচে এআইয়ের শক্তি পৌঁছে দেওয়ার অবকাঠামো গড়ে তোলা।

লেখক: প্রিন্সিপাল সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, মাইক্রোসফট।