বাংলাদেশকে ‘সোনার বাংলা’ বলিবার যথেষ্ট যুক্তিসংগত কারণ রহিয়াছে। কেননা প্রাচীনকাল হইতেই বাংলা ছিল একটি সমৃদ্ধ অঞ্চল। এই অঞ্চল ব্যবসায়-বাণিজ্য ও কারুশিল্পের জন্য ছিল বিখ্যাত। পাঁচ শতকে বাংলার সর্ববৃহৎ বন্দরনগরীর সঙ্গে দক্ষিণ ভারত, সিংহল, বার্মা, মালয়, পারস্য উপসাগর এবং দূরপ্রাচ্যের বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল। এই সময়ে প্রধান প্রধান উন্নত শিল্পসমূহের মধ্যে ছিল বস্ত্রশিল্প, চিনিশিল্প, লবণশিল্প, গজদন্তশিল্প এবং ধাতুশিল্প। আট শতকে আরব দেশীয় বণিকগণ চট্টগ্রামের সহিত বহির্বিশ্বের বাণিজ্য সম্পর্ক স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অনেক আগে হইতেই বাংলায় নৌকা নির্মাণশিল্প উন্নতি লাভ করে। ঢাকার মসলিন বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করে। এমনকি পূর্বে বস্ত্র, চিনি, লবণ ও অলংকার রপ্তানিতে বাংলার রেকর্ড ছিল। ৬০০ সালের দিকে হস্তশিল্পও সমৃদ্ধি লাভ করে। মোগল আমলে বাংলায় উৎপাদন ক্ষেত্রে আসে তেজিভাব। রপ্তানি বাজারে বিদেশিদের অংশগ্রহণ শিল্প উন্নয়নে নতুন প্রেরণা জোগায়। সেই দেশে যখন আমরা সংবাদপত্রের খবরে পড়ি, বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হইয়া যাইতেছে, তখন দুঃখ রাখিবার জায়গা থাকে না।
গতকাল পত্রিকান্তরে প্রকাশ, বিগত দুই বৎসরে দেশের ৪৫৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে বন্ধ হইয়া গিয়াছে। এই ঘটনার অভিঘাতে আকস্মিকভাবে কর্মহীন হইয়া পড়িয়াছেন সহস্রাধিক শ্রমিক। এই পরিস্থিতি আমাদের জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক অশনিসংকেত। বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। এই বিপুল জনসংখ্যার দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং বেকারত্বের হার হ্রাস করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। এই জন্য দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি সুদৃঢ় করিতে এবং জনসাধারণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করিতে নূতন নূতন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়িয়া তোলার কোনো বিকল্প নাই; কিন্তু নূতন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়িয়া তোলা দূরের কথা, বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলিই ক্রমান্বয়ে বন্ধ হইয়া যাইতেছে যাহা খুবই দুঃখজনক। মূলত যেই সকল কারণে সুপ্রতিষ্ঠিত কারখানাগুলি একের পর এক বন্ধ হইয়া যাইতেছে তাহার মধ্যে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানাবিধ সংকট দায়ী। ইদানীং আন্তর্জাতিক বাজারে কার্যাদেশের অভাব, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি দেশের শিল্প খাতকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলিয়া দিয়াছে। অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানিসংকট, বিশেষ করিয়া গ্যাস ও বিদ্যুতের অপর্যাপ্ততা উৎপাদন সচল রাখিবার পথে প্রধান অন্তরায় হইয়া দাঁড়াইয়াছে। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুতের কথা আমরা বহু দিন ধরিয়া বলিয়া আসিলেও ইহা অরণ্যে রোদনে পরিণত হইয়াছে। বিষয়টির প্রতি আসলে যতটা অগ্রাধিকার প্রদান করা দরকার, তাহা দেওয়া হইতেছে না বলিয়া শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলি দিনদিন রুগ্ন হইয়া পড়িতেছে। ইহার সহিত যুক্ত হইয়াছে ব্যাংক ঋণের জটিলতা, ব্যাংকগুলিতে সীমাহীন অস্থিরতা, লুটপাট এবং ইহার জেরে উদ্যোক্তাদের তীব্র আর্থিক অনটন। পুঁজির অভাবে অনেক সম্ভাবনাময় কারখানার উৎপাদন স্থায়ীভাবে বন্ধ হইয়া যাইতেছে।
এই ভয়াবহ সংকট হইতে পরিত্রাণের লক্ষ্যে সরকারকে দূরদর্শী, যুক্তিসংগত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে। প্রথমত, বন্ধ হইয়া যাওয়া এবং আংশিক সচল কারখানাগুলির পুনরুজ্জীবনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকঘোষিত তহবিলসমূহের শর্তাবলি অনতিবিলম্বে যাচাই-বাছাইপূর্বক শিথিল করিতে হইবে। জামানতসংক্রান্ত জটিলতা দূর করিয়া এবং সিআইবি প্রতিবেদনের কঠোরতা সাময়িকভাবে হ্রাস করিয়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ৭ শতাংশ সুদে সহজ শর্তে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল বা ঋণের ব্যবস্থা করা আবশ্যক। দ্বিতীয়ত, শিল্পাঞ্চলসমূহে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করিতে হইবে, যেন জ্বালানিসংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত না হয়। তৃতীয়ত, ব্যাংক ঋণের ডাউন পেমেন্টের শর্ত ন্যূনতম পর্যায়ে নামাইয়া ঋণ পুনঃ তপশিলিকরণের বিশেষ সুযোগ প্রদান করা প্রয়োজন। চতুর্থত, আন্তর্জাতিক বাজারে নূতন নূতন ক্রেতা অনুসন্ধান ও কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধির মাধ্যমে কার্যাদেশের প্রবাহ সচল রাখিতে হইবে।
আমরা মনে করি, সরকার যদি অবিলম্বে উদ্যোক্তাদের যৌক্তিক দাবি ও পরামর্শসমূহ বিবেচনা করিয়া কার্যকর আর্থিক ও নীতিনির্ধারণী সহায়তা প্রদান করেন, তাহা হইলে বন্ধ কারখানাগুলি পুনরায় সচল হইতে পারে। বর্তমানে দেশে কাচ, সার, সিমেন্ট, কাগজ, চিনি, লৌহ, ইস্পাত, ঔষধ, চামড়া প্রভৃতি শিল্পের ব্যাপক সম্ভাবনা রহিয়াছে। এই জন্য দরকার সরকারের সদিচ্ছা ও তাহার সঠিক বাস্তবায়ন।