রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বছিলায় পরিবার নিয়ে বসবাস করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী আজিজুল হক। এই পরিবারে দুটি শিশু আছে। একটির বয়স ১১ বছর, অন্যটির ১৩ বছর। ১৩ বছর বয়সি শিশুটির কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, সে সারা দিন ডিজিটাল ডিভাইস স্মার্টফোন নিয়ে কেন পড়ে থাকে। জবাবে বলল, ‘আমি খেলতে চাই। কিন্তু মাঠ পাব কোথায়?’ ১১ বছর বয়সি শিশুটির কাছে জানতে চাওয়া হয়, মোহাম্মদপুর থানাটি কোন জেলায় অবস্থিত? জবাবে সে স্মর্টফোন হাতে নিয়ে বলে, ‘দেখি গুগল কী বলে?’ গুগলে সার্চ দিয়ে বলল, ঢাকা জেলায় অবস্থিত। শিশু দুটির বাবা আজিজুল হক বলেন, তার সন্তান দুটি মোহাম্মদপুরের একটি বেসরকারি স্কুলের ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে পড়ালেখা করছে। কিন্তু ঐ স্কুলে কোনো খেলার মাঠ নেই। আজিজুলের বাসার আশপাশে কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে নেই কোনো খেলার মাঠ। ফলে তার দুই সন্তানের প্রচুর আগ্রহ থাকলেও খেলার কোনো সুযোগ নেই। মিরপুরের কাজীপাড়ায় বসবাসকারী রবিউল আলমের ৯ বছর বয়সি শিশুটি খেলার মাঠ না পেয়ে এখন মোবাইল, ট্যাব ও স্মার্ট টিভিতে বেশির ভাগ সময় অতিবাহিত করছে। বেলা ১২টার দিকে এই শিশুটির কাছে প্রশ্ন ছিল, তোমার এখন কী করা উচিত। জবাবে বলল, ‘চ্যাটজিপিটির (একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চ্যাটবট) কাছে শুনে জানাচ্ছি।’
জানা গেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালায় বাধ্যতামূলক থাকলেও ঢাকাসহ সারা দেশে ১৫ সহস্রাধিক প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেই কোনো খেলার মাঠ। রাজধানী ঢাকায় সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ৫ হাজারের বেশি প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার মধ্যে শতকরা ৯৫ ভাগের বেশি প্রতিষ্ঠানই বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়। একাধিক পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে, এসব বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৯৮ ভাগেরই নিজস্ব খেলার মাঠ নেই। ছোট পরিসরে, গ্যারেজে বা ছাদে গড়ে উঠেছে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সব বিভাগীয় শহরে প্রায় ৪০ ভাগ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নেই খেলার মাঠ। দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১১৬। অর্ধেকের বেশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৭২ দশমিক ২৬ শতাংশ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষার্থীরা খেলার মাঠ থেকে বঞ্চিত। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে থাকা ৩৪২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৫২টিতেই কোনো খেলার মাঠ নেই।
শিক্ষাবিদরা বলেন, শিক্ষার্থীদের শারীরিক এবং মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করতে তাদের পর্যাপ্ত এবং পরিমিত খেলাধুলা ও সহশিক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। সেজন্য প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অত্যাবশ্যকীয়ভাবে শিক্ষার্থীদের জন্য থাকতে হবে খেলাধুলার সুযোগ, উন্মুক্ত মাঠ। খেলাধুলা ছাড়াও সমাবেশ আয়োজন ও শ্রেণিকক্ষের বাইরে পাঠদানের জন্য প্রয়োজন হয় একটি সুন্দর মাঠের। কোনো প্রতিষ্ঠানে খেলাধুলার মাঠ বা সুযোগ না থাকলে তাকে পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বলা যায় না। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলাধুলার মাঠ নেই। খেলার মাঠের অভাবে শিশুরা ডিজিটাল ডিভাইসে আসক্ত হচ্ছে। তাদের মানসিক, মেধা ও সৃজনশীল বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে।’ ঢাকার বহু পরিবারের মা-বাবা এখন মাঠ না থাকা সন্তানদের ভবিষ্যত্ নিয়ে চিন্তায় আছেন।
জানা গেছে, ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাঠ, ক্রীড়া, খেলাধুলা ও শরীরচর্চার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এদিকে দেশের সব প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খেলার মাঠ সংরক্ষণ এবং তা সব শিশু-কিশোরের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত রাখার নির্দেশ দিয়েছে বর্তমান সরকার। গত ২৫ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম শেষে এবং ছুটির দিন এসব মাঠ আশপাশের ছেলেমেয়েদের খেলাধুলার জন্য খুলে দিতে হবে। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে এটি একটি অপরিহার্য শর্ত। কিন্তু এই শর্ত যারা পূরণ করছে না, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকরী কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা চোখে পড়ছে না। যেসব স্কুলে খেলার মাঠ রয়েছে, এমন পাঁচটি স্কুলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বিকালে স্কুল ছুটি হওয়ার খেলার মাঠ তালাবদ্ধ রাখা হয়েছে। এদিকে রাজধানীসহ সারা দেশে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে রেস্টুরেন্ট ও ফাস্টফুডের দোকান গড়ে উঠেছে। খেলার মাঠ না থাকায় এসব রেস্টুরেন্টে খাওয়া-দাওয়া ও আড্ডা দিয়ে সময় কাটাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। অনেক সময় এসব প্রতিষ্ঠানে অস্বাস্থ্যকর খাবার ও তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি হয়। অনেক জায়গায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দেওয়াল ঘেঁষে বা আশপাশের দোকানে সিগারেট ও তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি ও প্রচার করা হয়। যদিও শিক্ষাঙ্গনের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাকজাত পণ্য বিক্রি ও প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু অনেকে এই নিষেধাজ্ঞা মানছেন না।
রাজধানীতে উন্মুক্ত কিছু মাঠ থাকলেও সেগুলো ব্যবহার অনুপযোগী। আসাদ গেটের পশ্চিমে অবস্থিত লালমাটিয়া নিউ কলোনি ক্রীড়া চক্র মাঠটি দীর্ঘকাল ধরে দখল ও দূষণের কারণে সম্পূর্ণ খেলার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। মাঠটিতে ঘাসের কোনো অস্তিত্ব নেই। এর চারপাশ কাঁচাবাজার, ভ্রাম্যমাণ দোকান এবং ভবন নির্মাণসামগ্রীর ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। অবৈধ মেলা ও গাড়ি বিক্রির হাট বসায় শিশু-কিশোররা মাঠে খেলাধুলার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি মানুষের জন্য ৯ বর্গমিটার খোলা জায়গা (খেলার মাঠ, পার্ক ইত্যাদি) প্রয়োজন। কিন্তু ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় জনপ্রতি খোলা জায়গার পরিমাণ এক বর্গমিটারের কম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক শিক্ষার্থীর গবেষণা অনুযায়ী, খোলা জায়গার সংকট সবচেয়ে বেশি পুরান ঢাকায়। ঐ এলাকার আটটি ওয়ার্ডে একটুও উন্মুক্ত স্থান নেই।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ সম্প্রতি রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে খেলাধুলার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, দেশের প্রায় ৬৬ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ উন্নয়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নতুন বেসরকারি বিদ্যালয়ের অনুমোদনের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট মানের খেলার মাঠ বাধ্যতামূলক করার বিষয়ে কাজ চলছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আবদুল হালিম গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের লক্ষ্যে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলার মাঠ থাকা খুবই জরুরি। এ ব্যাপারে সরকারের কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। তিনি বলেন, সুস্থ দেহ, সুস্থ মন। সেজন্য প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অত্যাবশ্যকীয়ভাবে শিক্ষার্থীদের জন্য থাকতে হবে খেলাধুলার সুযোগ, উন্মুক্ত মাঠ।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, একটি আধুনিক শহরে প্রতি আধাবর্গকিলোমিটার এলাকায় একটি খেলার মাঠ থাকা আবশ্যক। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আয়তন (৩০৫ দশমিক ৪৭ বর্গকিলোমিটার) অনুযায়ী মাঠ প্রয়োজন অন্তত ৬১০টি। অথচ বাস্তবে আছে মাত্র ২৩৫টি! অর্থাত্ প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেক মাঠও নেই। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার স্কুলপড়ুয়া শিশুদের একটি বড় অংশ মোবাইল, টেলিভিশন, ট্যাব বা কম্পিউটারের মতো ইলেকট্রনিক যন্ত্রের পর্দায় চোখ রেখে প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা কাটায়। এর ফলে তাদের ঘুম কমে যাচ্ছে, ওজন বাড়ছে, মাথাব্যথা ও চোখের সমস্যা হচ্ছে। মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
আদনান হোসেন। বর্তমানে ২০ বছরের টগবগে তরুণ। রাজধানীর একটি বেসরকারি স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেছে সে। তার ১০ বছরের স্কুলজীবনে প্রতিদিন সকাল শুরু হয়েছিল পড়াশোনা দিয়ে, বিকালও শেষ হতো পড়াশোনায়। তারপর সোজা বাসায়। সেখানেও কেবল পড়া আর পড়া। পরদিন আবার সেই একই রুটিন। চার দেওয়ালের গণ্ডির ভেতরে এভাবেই কেটেছে আদনানের স্কুলজীবনের ১০টা বছর। খেলাধুলায় তার সমবয়সি অন্যদের অর্জনের ঝুলিতে থানা, জেলা, বিভাগীয় বা জাতীয় পুরস্কার থাকলেও আদনানের নেই কিছুই। শুধু যে আদনানের অর্জনের ঝুলি খালি, তা কিন্তু নয়। আদনানের মতো অসংখ্য শিক্ষার্থী রয়েছে, যাদের বিদ্যালয় জীবন কেটেছে এমনই মলিন। কেননা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের জন্য ছিল না কোনো খেলার মাঠ।