বিশ্ব ফুটবলে ব্রাজিল মানেই এক আবেগ, এক ইতিহাস। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের হলুদ জার্সি, ‘সাম্বা ফুটবল’ আর অসংখ্য কিংবদন্তির জন্ম যেন একই সূত্রে গাঁথা। ২০০২ সালের ৩০ জুনে গৌরবের মুকুটে পঞ্চম পালকটি যুক্ত হয়েছিল। বুধবার (১ জুলাই) ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশন (সিবিএফ) নিজেদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে সে দিনটির স্মৃতিচারণ করে পোস্ট দিয়েছে।
গতকাল সেই ঐতিহাসিক সাফল্যের দুই যুগ পূর্তি হলো।
এর আগে, ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০ ও ১৯৯৪; এই চারটি বিশ্বকাপ জয়ের মধ্য দিয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল সেলেসাওরা। সুইডেনে কিশোর পেলের হাত ধরে প্রথম শিরোপা, চিলিতে টানা দ্বিতীয় বিশ্বজয়, মেক্সিকোয় সর্বকালের অন্যতম সেরা দল নিয়ে তৃতীয় মুকুট এবং যুক্তরাষ্ট্রে ২৪ বছরের অপেক্ষা শেষে চতুর্থ বিশ্বকাপ; প্রতিটি জয়ই ফুটবল ইতিহাসে আলাদা গুরুত্ব বহন করে।
জানা যায়, জাপানের ইয়োকোহামা আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানিকে ২-০ গোলে হারিয়ে ব্রাজিল নিজেদের পঞ্চম বিশ্বকাপ শিরোপা জিতেছিল। আর সেই ম্যাচের নায়ক ছিলেন ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিও। দ্বিতীয়ার্ধে তার জোড়া গোলেই বিশ্বজয়ের উল্লাসে মেতে উঠেছিল পুরো ব্রাজিল।
তার ১৯৯৮ সালে বিশ্বকাপ ফাইনালে স্বাগতিক ফ্রান্সের কাছে ৩-০ গোলে হেরে শিরোপা হাতছাড়া করেছিল ব্রাজিল। সেই ম্যাচের আগে রোনালদোর রহস্যময় অসুস্থতা আজও ফুটবল ইতিহাসের আলোচিত বিষয়। এরপর একের পর এক গুরুতর হাঁটুর চোটে অনেকেই ভেবেছিলেন, তার ক্যারিয়ার হয়তো শেষ। কিন্তু হার মানেননি রোনালদো।
পরে দীর্ঘ পুনর্বাসনের পর ২০০২ বিশ্বকাপে ফিরে এসে তিনি যেন নতুন করে নিজের পরিচয় দেন। পুরো টুর্নামেন্টে ৮ গোল করে জেতেন গোল্ডেন বুট। আর ফাইনালে জোড়া গোল করে নিশ্চিত করেন ব্রাজিলের পঞ্চম বিশ্বকাপ।
সেই ব্রাজিল দলকে এখনও অনেকেই ইতিহাসের অন্যতম সেরা আক্রমণভাগ হিসেবে বিবেচনা করেন। রোনালদো, রিভালদো ও রোনালদিনহো; এই তিন তারকার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ‘থ্রি আর’ বিশ্বকাপে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে বারবার বিপর্যস্ত করেছে। মাঝমাঠে ছিলেন গিলবার্তো সিলভা ও ক্লেবারসন। রক্ষণে লুসিও, এডমিলসন ও রকে জুনিয়র, আর গোলপোস্টে নির্ভরতার প্রতীক মার্কোস। কোচ লুইজ ফেলিপে স্কোলারির অধীনে দলটি টুর্নামেন্টজুড়ে খেলেছিল আত্মবিশ্বাসী ও কার্যকর ফুটবল।
২০০২ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের যাত্রা ছিল নিখুঁত। গ্রুপ পর্বে তুরস্ক, চীন ও কোস্টারিকাকে হারিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করে তারা। এরপর নকআউট পর্বে একে একে বেলজিয়াম, ইংল্যান্ড ও তুরস্ককে বিদায় করে ফাইনালে ওঠে। ফাইনালেও জার্মানিকে হারিয়ে টুর্নামেন্টের সাতটি ম্যাচই জিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার বিরল কীর্তি গড়ে ব্রাজিল।
প্রথমার্ধে জার্মান গোলরক্ষক অলিভার কান ছিলেন দুর্দান্ত। একের পর এক আক্রমণ ঠেকিয়ে ব্রাজিলকে হতাশ করেন তিনি। তবে ৬৭তম মিনিটে রিভালদোর নেওয়া শট কান পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারলে ফিরতি বলে গোল করেন রোনালদো। মাত্র ১২ মিনিট পর ক্লেবারসনের পাস থেকে রিভালদো বল ছেড়ে দিলে ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা রোনালদো নিখুঁত শটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন। সেই গোলেই ব্রাজিলের পঞ্চম বিশ্বকাপ নিশ্চিত হয়ে যায়।
২০০২ সালের সেই শিরোপার পর কেটে গেছে ২৪ বছর। এরপর ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ এবং চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপেও ব্রাজিল নতুন করে বিশ্বসেরা হওয়ার স্বপ্ন দেখেছে। কিন্তু পঞ্চম শিরোপার পর আর বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তোলা হয়নি সেলেসাওদের। তবু ২০০২ সালের সেই স্মৃতি এখনও ব্রাজিলিয়ানদের কাছে অনুপ্রেরণার প্রতীক।