ব্রাজিলের নীরব নায়ক ব্রুনো

আপডেট : ০১ জুলাই ২০২৬, ০৩:৫৯

বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই তারার ঝলকানি। গোলদাতাদের উল্লাস, উইঙ্গারদের ঝড় তোলা গতি, ফরোয়ার্ডদের নিখুঁত ফিনিশিং। সব আলো যেন তাদের ঘিরেই আবর্তিত হয়। উত্তর আমেরিকায় চলমান বিশ্বকাপেও দৃশ্যপট আলাদা নয়। ব্রাজিলের আক্রমণভাগে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, ম্যাথুয়েস কুনহা, নেইমারদের নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে।

কিন্তু ফুটবল তো শুধু গোলের গল্প নয়। মাঠের গভীরে, চোখ কম পড়া এক জায়গায় তৈরি হয় ম্যাচের আসল সুর। আর ব্রাজিলের সেই সুরের নেপথ্য শিল্পী একজনই—ব্রুনো গুইমারেস। তিনি গোলের নায়ক নন, আলো কাড়ার মানুষও নন। তার নেই নাটকীয় উদ্‌যাপন কিংবা প্রচারের ঝলক। অথচ ব্রাজিলের খেলার ছন্দ, গতি, ভারসাম্য আর নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন এই নীরব যোদ্ধা।

ইংলিশ ক্লাব নিউক্যাসল ইউনাইটেডের এই মিডফিল্ড জেনারেল বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বেই বুঝিয়ে দিয়েছেন কেন তিনি আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার। তিন ম্যাচে তার উপস্থিতি যেন ছিল ব্রাজিলের মধ্যমাঠে এক অদৃশ্য ছায়া। সবখানে আছেন, সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন, অথচ খুব বেশি চোখে পড়ছেন না। সবশেষ নকআউট রাউন্ডে মঙ্গলবার জাপানের বিপক্ষেও আলো কেড়েছেন ২৮ বছর বয়সি এই সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার।

খেলা যখন ১-১ সমতায় শেষ হওয়ার উপক্রম, তখনই তিনি গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লিকে দেন ডিফেন্সচেরা পাস। আর সেটা থেকে গোল করে সব শঙ্কা কাটিয়ে ব্রাজিলকে শেষ ষোলোর টিকিট পাইয়ে দেন মার্টিনেল্লি। শুধু এই গোলেই নয়, পুরো ম্যাচেই আলো ছড়ান ব্রুনো।

বল পায়ে ব্রুনো যেন এক সুরকার। তিনি জানেন কখন খেলার গতি বাড়াতে হয়, কখন সেটিকে শান্ত নদীর মতো ধীর করতে হয়। কখন ছোট ছোট পাসে চাপ ভাঙতে হয়, কখন দীর্ঘ পাসে প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ছিন্ন করতে হয়। সব যেন আগেই লেখা থাকে তার মাথার নকশায়। প্রতিপক্ষ যতই চাপ সৃষ্টি করুক, ব্রুনোর শরীরী ভাষায় থাকে না কোনো তাড়াহুড়ো। বরং তার শান্ত উপস্থিতিই ব্রাজিলকে এনে দেয় স্থিরতা। ছোট পাস, নিখুঁত সুইচ, দৃঢ় ট্যাকল কিংবা বুদ্ধিদীপ্ত পজিশনিং। সবকিছু মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন সেলেসাওদের মধ্যমাঠের হৃদস্পন্দন।

আক্রমণে ভিনিসিয়ুস ঝড় তুলছেন। কুনহা জাদু দেখাচ্ছেন। কিন্তু সেই আক্রমণের ভিত? সেটি গড়ে দিচ্ছেন ব্রুনো। তার পা থেকেই শুরু হয় ব্রাজিলের অসংখ্য আক্রমণ। প্রতিপক্ষের মধ্যমাঠ ভেঙে খেলার দিক পালটে দেওয়ার 

ক্ষমতা তাকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে গেছে। রক্ষণে নেমে বল কাড়তে যেমন পারদর্শী, তেমনি মুহুর্তেই আক্রমণে উঠে তৈরি করতে পারেন গোলের সুযোগ। আধুনিক ফুটবলে এমন নিখুঁত 'বক্স-টু-বক্স' মিডফিল্ডারের মূল্য আকাশছোঁয়া। আর ব্রুনো গুইমারেস সেই সংজ্ঞারই জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

ফুটবলের সব নায়ক আলোয় থাকেন না। কেউ কেউ আড়ালে থেকেই পুরো দলের ভিত্তি গড়ে দেন। ব্রাজিলের এবারের বিশ্বকাপ যাত্রায় ব্রুনো ঠিক তেমনই এক নায়ক। নিঃশব্দ, স্থির, অথচ অপরিহার্য। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ গ্রুপ ম্যাচেই তার আরেকটি প্রমাণ মিলেছে। পুরো ম্যাচ জুড়ে তিনি দৌড়েছেন ১২.১ কিলোমিটার। যা ম্যাচে সর্বোচ্চ। এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যাই নয়; এটি তার অক্লান্ত পরিশ্রম, অসাধারণ ফিটনেস এবং দলের প্রতি নিবেদনের প্রতিচ্ছবি। জাপানের বিপক্ষেও এমন স্বপ্রতিভ ছিলেন তিনি। বল পুনরুদ্ধার, প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভেঙে দেওয়া, মধ্যমাঠে ভারসাম্য রক্ষা, সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি— প্রতিটি ক্ষেত্রেই ব্রুনো অনবদ্য। তার নিরলস ছুটে চলাই ব্রাজিলের খেলার ভিতকে করেছে আরো শক্তিশালী। বিশ্বকাপের মঞ্চে এই উজ্জ্বল পারফরম্যান্সের পুরস্কারও যেন অপেক্ষা করছে তার জন্য।

ইতিমধ্যেই ইংলিশ জায়ান্ট আর্সেনাল তাকে দলে ভেড়াতে আগ্রহ দেখিয়েছে। ৫৫ মিলিয়ন ইউরোর প্রস্তাবও পাঠানো হয়েছে নিউক্যাসেলের কাছে। কিন্তু নিউক্যাসেলের বার্তা স্পষ্ট—ব্রুনো বিক্রির জন্য নন। তার নামের পাশে যেন বড় অক্ষরে ঝুলছে একটাই বার্তা, 'নট ফর সেল'।

তবে মাঠের বাইরের সব আলোচনা আপাতত দূরে রেখেছেন ব্রুনো। তার মনোযোগ এখন একটাই—ব্রাজিলকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দেওয়া। ব্রুনোর ভাষায়, 'মিডফিল্ডাররা যদি ভালো খেলে, তাহলে পুরো দলই ভালো খেলবে। আমাদের কাজ হলো ভিনি, কুনহা, রাফিনিয়া, নেইমার যেই খেলুক, তাদের জন্য খেলাটা যতটা সম্ভব সহজ করে দেওয়া।' তিনি আরো বলেন, 'আমরা হয়তো গোল করব না। কিন্তু এমন পরিবেশ তৈরি করতে চাই, যেখানে আমাদের ফরোয়ার্ডরা নিজেদের সেরাটা দিতে পারে। কারণ তারা ভালো খেললে, ব্রাজিল ও ভালো খেলবে।'

এবারের বিশ্বকাপে সাম্বার দেশের আক্রমণভাগ যতই মুগ্ধতা ছড়াক, মধ্যমাঠের হৃদস্পন্দন কিন্তু এক জনই—ব্রুনো গুইমারেস। পাঁচ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল যদি এবার অনেক দূর যায়, ইতিহাস হয়তো গোলদাতাদের নামই বেশি মনে রাখবে। কিন্তু যারা খেলাটা গভীরভাবে দেখবেন, তারা জানবেন এই দলের আসল প্রাণ লুকিয়ে ছিল এক নীরব যোদ্ধার পায়ে। তিনি ব্রাজিলের খেলার ছন্দ। তিনি সাম্বার নীরব সুরকার ব্রুনো।

ইত্তেফাক/এনএন