হংকং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চলমান অচলাবস্থার মধ্যে পুলিশের সঙ্গে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়েছে। জাতিসংঘ হংকং কর্তৃপক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। মঙ্গলবার হংকংকে ‘রসাতলে’ নিয়ে যাবেন না বলে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদেরকে নতুন করে সতর্ক করে দিয়েছেন চীনপন্থি নেতা ক্যারি লাম। তবে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আহত একজনকে চিকিত্সাকর্মীরা বিমানবন্দরের প্রধান টার্মিনালের বাইরে নিয়ে যাওয়ার পর পুলিশ এবং বিক্ষোভকারীদের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। পুলিশের কয়েকটি গাড়ি বিক্ষোভকারীরা আটকে দেয়। দাঙ্গা পুলিশ বিক্ষোভকারীদেরকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে সামনে এগোয়।
বিক্ষোভকারীরা বিমানবন্দরের বেশ কয়েকটি স্থানে ট্রলিব্যাগ ও অন্যান্য জিনিস দিয়ে রাস্তা বন্ধ করে রাখে। গণমাধ্যমে একটি ছবিতে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে এক বিক্ষোভকারীর কপাল বেয়ে রক্ত ঝরতে দেখা গেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল ব্যাচেলে মঙ্গলবার বিক্ষোভকারীদের ওপর শক্তি প্রয়োগের ব্যাপারে হংকংকে সংযত থাকা এবং বিক্ষোভ দমনে পুলিশের যেনতেনভাবে টিয়ারগ্যাস ছুড়ে মারার বিষয়টি তদন্ত করে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন।
ব্যাচেলে বলেন, ‘পুলিশকে বদ্ধ জায়গায় বিভিন্ন সময়েই জনতার ভিড়ে সরাসরি মানুষের ওপর টিয়ার গ্যাস ক্যানিস্টার ছুড়ে মারতে দেখা যাচ্ছে। এভাবে ছোড়া টিয়ার গ্যাস শেল এ মানুষের মারাত্মকভাবে আহত হওয়া এবং মৃত্যুরও ঝুঁকি আছে। আর তা আন্তর্জাতিক আইনেরও পরিপন্থি।’
এ পন্থায় বিক্ষোভ দমন না করে মানুষকে তাদের মতো শান্তিপূর্ণভাবে প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করতে হংকং কর্তৃপক্ষকে সংযতভাবে আচরণ করার আহ্বান জানানো হয়েছে ব্যাচেলর কার্যালয় থেকে।
চীনে বন্দি প্রত্যর্পণ নিয়ে দুই মাস আগে প্রস্তাবিত একটি বিল বাতিলের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠা হংকংয়ের বিক্ষোভ এখন স্বাধীনতা আন্দোলনের রূপ নিয়েছে। বিক্ষোভের মুখে প্রধান নির্বাহী ক্যারি লাম ওই বিলকে ‘মৃত’ ঘোষণার পরও আন্দোলন থামছে না।
বিক্ষোভকারীরা বিলটি পুরোপুরি বাতিল, পুলিশী নিপীড়নের বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্ত এবং ক্যারি লামের পদত্যাগ চাইছে। গত শুক্রবার বিক্ষোভকারীরা বিমানবন্দরে জড়ো হওয়ার পর থেকে এখনো সেখানে অবস্থান করছে।
এদিকে হংকংকে ‘রসাতলে’ নিয়ে যাবেন না বলে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদেরকে নতুন করে সতর্ক করে দিয়েছেন নেতা ক্যারি লাম। মঙ্গলবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এ সতর্ক বার্তা দেন। এ সময় প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে হংকংবাসীকে মতবিরোধ দূরে সরিয়ে রাখার আহ্বান জানান লাম।
তিনি বলেন, ‘হংকং একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে পৌঁছেছে।’ বিক্ষোভের সময় সহিংসতার কারণে হংকং এমন এক ‘অতল গহ্বরের দিকে তলিয়ে যাচ্ছে যেখান থেকে আর ফিরে আসার পথ নাই’। ‘এক মিনিট চিন্তা করুন, নগরীর দিকে তাকিয়ে দেখুন, আমাদের ঘরবাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখুন—আপনারা কি সত্যি চান সব রসাতলে যাক?’
হংকং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সরকার-বিরোধীদের টানা পঞ্চম দিনের বিক্ষোভে শত শত ফ্লাইট বাতিল এবং চেক ইন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ক্যারি লাম বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে একথা বললেন। বিমানবন্দরের কর্মকর্তারা সতর্কবার্তা দেওয়ার পরও মঙ্গলবার ফের বিক্ষোভকারীরা বিমানবন্দরে ভিড় জমাতে শুরু করে। বিমানবন্দরের ভেতরের কয়েকটি ছবিতে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীরা যাত্রীদের ট্রলি ব্যাগ নিয়ে বেষ্টনী তৈরি করছে। এতে যাত্রীরা বিচলিত হয়ে পড়ছে।
স্যোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করা ভিডিওতেও দেখা গেছে, বিমানবন্দরের ভেতর বসে থাকা বিক্ষোভকারীদের ভিড়। তাদেরকে টপকে যাত্রাপথের দিকে যেতে হিমশিম খাচ্ছে যাত্রীরা। এ পরিস্থিতিতে বিমানবন্দরের ওয়েবসাইটে এক বিবৃতিতে যাত্রীদেরকে যত দ্রুত সম্ভব টার্মিনাল ভবন ছেড়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। বিক্ষোভের কারণে সোমবার ১৬০টির বেশি ফ্লাইট বাতিল হওয়ার পর মঙ্গলবারও আরো কয়েকডজন ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
মঙ্গলবারের সংবাদ সম্মেলনে ক্যারি লামকেও সাংবাদিকদের বেশ কয়েকটি প্রশ্নবানে জর্জরিত হতে হয়েছে। হংকংয়ের নাগরিকদের ভয় দূর করতে লাম রাজনৈতিক দায়িত্ব নেবেন কিনা, পুলিশের বিক্ষোভ দমনাভিযান থামাবেন কিনা এবং কখন লাম পদত্যাগ করতে ইচ্ছুক হবেন এ সমস্ত প্রশ্ন তাকে করেন সাংবাদিকরা।