মাটির প্রাণ ফিরাইতে হইবে

বাংলাদেশের কৃষি আজ এক নীরব কিন্তু গভীর সংকটের মধ্য দিয়া পথ অতিক্রম করিতেছে। সংকটটি চোখে পড়ে না; কিন্তু ইহার অভিঘাত সুদূরপ্রসারী। পত্রপত্রিকার প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন গবেষণা বা জরিপ হইতে জানা যায়, কৃষিজমিতে জৈবসারের ব্যবহার ক্রমাগত কমিয়া যাইতেছে, আর সেই শূন্যস্থান পূরণ করিয়া লইতেছে রাসায়নিক সার। বর্তমানে দেশের অধিকাংশ মাটিতেই জৈবপদার্থের পরিমাণ কম এবং উচ্চ ও মাঝারি উচ্চভূমির প্রায় ৭০ শতাংশ আবাদি জমিতে মাটির জৈবপদার্থ ২ শতাংশের কম। উদ্বেগের বিষয় হইল, তাৎক্ষণিকভাবে উৎপাদন বাড়ানোর এই প্রবণতা দীর্ঘ মেয়াদে নিঃশেষ করিয়া দিতেছে মাটির প্রাণশক্তিকে। কারণ, জৈবসার কেবল একটি সারই নহে; ইহাই মাটির প্রাণ, উর্বরতার ভিত্তি এবং টিকসই কৃষির অন্যতম পূর্বশর্ত। অথচ এমন একটি প্রাকৃতিক সম্পদকে আমরা ক্রমশ দূরে ঠেলিয়া দিয়াছি।

একসময় বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে প্রায় প্রতিটি পরিবারে ব্যাপক হারে গবাদি পশু পালনের প্রচলন ছিল। সেই সুবাদে গোবরের অভাব ছিল না, কৃষিজমিতে নিয়মিত গোবর প্রয়োগ হইত-হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা ও অন্যান্য জৈববর্জ্যও সারে পরিণত হইত; কিন্তু কালের পরিক্রমায় সেই চিত্র পালটাইয়া গিয়াছে। গবাদি পশু পালনের প্রবণতা কমিয়াছে, চারণভূমি হ্রাস পাইয়াছে, বাড়িয়াছে ফসল উৎপাদন ব্যয়। অন্যদিকে জ্বালানির সংকটের মুখে বহু স্থানে গোবর সারের পরিবর্তে জ্বালানি হিসাবে ব্যবহৃত হইতেছে। ইহার ফলে স্বভাবতই ক্রমশ জৈবসারের পরিবর্তে রাসায়নিক সারের প্রতি নির্ভরশীল হইয়া পড়িয়াছেন কৃষক। তবে বাস্তবতা হইল, রাসায়নিক সার যতই প্রয়োগ করা হউক না কেন, ইহা কখনো মাটির জৈব গঠন ফিরাইয়া দিতে পারে না। বরং ইহার অতিরিক্ত ব্যবহারে মাটির উপকারী অণুজীব ধ্বংস হয়, জৈবপদার্থ কমিয়া যায়, পানির ধারণক্ষমতা হ্রাস পায় এবং একসময় অধিক সার দিয়াও প্রত্যাশিত ফলন পাওয়া যায় না। অর্থাৎ, কৃষি এমন এক দুষ্টচক্রে প্রবেশ করিয়াছে, যাহার ক্ষতি অপূরণীয়।

ইহার প্রভাব কি কেবল কৃষিক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ? মোটেই নহে। অতিরিক্ত রাসায়নিক সারের ব্যবহার নদী-খাল ও ভূগর্ভস্থ পানিকে দূষিত করে, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি সাধন করে এবং পরিবেশে ক্ষতিকর গ্যাসের নিঃসারণ বৃদ্ধি করে। আবার গোবর পোড়ানোও পরিবেশবান্ধব কোনো সমাধান নহে; ইহাতে মূল্যবান জৈবসার নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বৃদ্ধি পায় বায়ুদূষণ। বিশ্বের বহু দেশ এই বাস্তবতা উপলব্ধি করিয়াছে। এই কারণেই মূলত ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কৃষিজমির স্বাস্থ্য রক্ষায় কম্পোস্ট ও জৈবসারের ব্যবহার বাড়াইবার জন্য সরকারি সহায়তা দেওয়া হইতেছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে প্রাকৃতিক কৃষি ও গোবরভিত্তিক জৈবসার ব্যবহারে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হইয়াছে। চীনও গত এক দশকে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমাইয়া জৈবপদার্থের ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে মাটির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ গ্রহণ করিয়াছে। উন্নত বিশ্ব বুঝিয়াছে, মাটির স্বাস্থ্য বিনষ্ট হইলে খাদ্যনিরাপত্তাও দীর্ঘস্থায়ী হয় না। একই কথা বলিতেছে কৃষিবিজ্ঞান-উন্নত কৃষির পূর্বশর্ত কেবল অধিক সার প্রয়োগ নহে; বরং সুস্থ মাটি নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশেও যেন এই উপলব্ধির সময় আসিয়াছে। কৃষকের জন্য প্রয়োজন জৈবসার উৎপাদন ও ব্যবহারে কার্যকর প্রণোদনা, কম্পোস্ট তৈরির প্রযুক্তি সম্প্রসারণ, গবাদি পশু পালন উৎসাহিত করা ও গোবরকে জ্বালানি হিসাবে পোড়ানোর পরিবর্তে বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা করা। কৃষকদের মধ্যে সমন্বিত পুষ্টি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করাও সময়ের দাবি। কৃষির ভবিষ্যৎ রক্ষা করিতে হইলে মাটিকে বাঁচাইতেই হইবে, আর মাটিকে বাঁচাইতে হইলে ফিরিয়া যাইতে হইবে জৈবসারের কাছে। রাসায়নিক সার ফসল ফলাইতে পারে; কিন্তু মাটিকে জীবিত রাখিতে পারে না। অর্থাৎ, জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা ও অনিয়মিত আবহাওয়ার ন্যায় নূতন নূতন চ্যালেঞ্জ যখন বাংলাদেশের কৃষিকে ক্রমাগত ঝুঁকির মুখে ফেলিতেছে, তখন জৈবসারের বিকল্প থাকিতে পারে না। এই সত্য যত দ্রুত আমরা উপলব্ধি করিব, দেশের কৃষি ও পরিবেশের জন্য তাহা ততই মঙ্গল।