বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ৮ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

অর্থনীতিকে টেকসই করতে কৃষিশিল্পের গুরুত্ব

আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২৩, ০৪:৩০

কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে কৃষির ওপর নির্ভরশীল মানুষ এই খাতের প্রসারে প্রচুর শ্রম ব্যয় করছেন। শুধু শিল্প খাতের উন্নয়নে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথ দেখাবে না। কৃষির যথাযথ বিকাশ সাধনের পাশাপাশি শিল্পের ও সেবা খাতের ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হলে তা মজবুত অর্থনীতির ভিত গড়ে তুলতে সহায়ক হবে। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষিভিত্তিক শিল্পের অবস্থা তেমন সমৃদ্ধ নয়। কৃষিভিত্তিক পাটশিল্প, বস্ত্রশিল্প, চামড়াশিল্প, চিনিশিল্প, চা-শিল্প—এই কয়েকটা বাদ দিলে বাকিগুলোর তথ্য-উপাত্ত তেমন নেই। আজ শুরু তো কাল শেষ। শুরুটা যেমন সুপরিকল্পিত নয়, তেমনি কীভাবে শেষ হয়, তারও কোনো হদিস খুঁজে পাওয়া যায় না। কৃষিভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠায় তেমন পরিকল্পনা বা গুরুত্ব দেওয়া হয় না। কৃষি উন্নয়নের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইইএফ ফান্ডের নামে যে পরিমাণ টাকা বিনিয়োগ হয়েছে, তাতে কৃষিভিত্তিক শিল্পের কতটুকু উন্নয়ন হয়েছে, খোঁজ নেওয়া দরকার। অথচ কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে সুব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলে কৃষিশিল্প যে কোনো শিল্পের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যেত। আমদানি-নির্ভর কাঁচামাল দিয়ে গড়া শিল্পকারখানা সাধারণত লাভজনক হয় না। কারণ এতে মূল্য সংযোজন হয় না। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষি কাঁচামাল সহজলভ্য। কৃষিপণ্যকে যদি শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে গণ্য করে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে গবেষণার মাধ্যমে সম্ভাবনা যাচাই করে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা হয়, তাহলে বর্তমান থেকে আরো অনেক উন্নতি হবে।

চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইনসহ অনেক দেশে উত্পাদিত কৃষিপণ্যের নানাবিধ ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের খাদ্যদ্রব্য তৈরি করে সারা বিশ্বে বাজারজাত করছে। তদ্রুপ কৃষিপণ্য ব্যবহার করে শিল্প প্রতিষ্ঠা করতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরো মজবুত হবে। বরিশাল ও চট্টগ্রামের পটিয়ায় বিপুল পরিমাণ সুস্বাদু পেয়ারা উত্পাদিত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকা ও টাঙ্গাইলের মধুপুরের মিষ্টি ও সুস্বাদু আনারস দেশের মানুষের কাছে খুবই জনপ্রিয়। আমাদের দেশের উর্বর মাটিতে বিপুল পরিমাণ তরমুজ, বাঙ্গিসহ বিভিন্ন প্রকার রসালো মৌসুমি ফল উত্পাদিত হয়। মৌসুমের সময় কৃষকরা নামেমাত্র মূল্যে এই সব ফল বিক্রয় করতে বাধ্য হয়। অথচ কৃষিশিল্প প্রতিষ্ঠা করে এই সব পেয়ারা, আনারসসহ অন্যান্য মৌসুমি ফল ব্যবহার করে জেলি, জুস, স্কোয়াস ও অন্যান্য নানাবিধ খাদ্যদ্রব্য তৈরি করে দেশে ও বিদেশে বাজারজাত করা যায়।

বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল সারা দেশে উত্পাদিত হলেও জয়দেবপুরের লাল মাটিতে কাঁঠালের উত্পাদন খুবই বেশি হয়। কাাঁঠালের মৌসুমে প্রকৃত উত্পাদনকারীরা একেবারেই মূল্য পায় না, যা কিছু উপার্জন করে তা মধ্যস্বত্বভোগীরা এবং খুচরা বিক্রেতারা। অথচ থাইল্যান্ডে কাঁঠালের কোষের ‘চিপস’ তৈরি করে সুন্দর মোড়কে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে বাজারজাত করছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় উত্পাদিত স্থানীয় জাতের কলা অত্যন্ত মিষ্টি ও সুস্বাদু। স্থানীয় বাজারের চাহিদার তুলনায় উত্পাদিত কলার পরিমাণ অনেক বেশি। ফলে ঐ কলা বিক্রি করার জন্য সাধারণত চট্টগ্রাম শহরের বাজারে সরবরাহ করা হয়। এই সুস্বাদু কলার ‘চিপস’ তৈরি করে দেশে ও বিদেশে বাজারজাত করা যায়। আমেরিকা, কানাডা, জাপানসহ বিভিন্ন উন্নত দেশে কলা, কাঁঠালের চিপসসহ বিভিন্ন রকম ফলের তৈরি রকমারি খাবারের বাজার রয়েছে। সারা বিশ্বে বাংলাদেশের উত্পাদিত আম, আনারস, কলা, কাঁঠাল, পেয়ারাসহ বিভিন্ন রকম ফল ও কৃষিপণ্য দিয়ে তৈরি উত্পাদিত দ্রব্যের চাহিদা রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, সম্প্রতি জাপানে বাংলাদেশে উত্পাদিত মিষ্টি আলুর চাহিদা বেড়েছে। বাংলাদেশে কয়েক ধরনের মিষ্টি আলুর চাষ হয়। জাপানে মিষ্টি আলু রপ্তানি করার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয় বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করেছে। মিষ্টি আলু বিদেশে রপ্তানিযোগ্য হওয়ায় মিষ্টি আলুর মূল্যও বেড়েছে। মিষ্টি আলু দিয়ে জাপানিদের পছন্দনীয় রকমারি খাবার তৈরি করেও রপ্তানি করার পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। কৃষক অধিক মূল্য পাবে, মিষ্টি আলুভিত্তিক শিল্প গড়ে উঠবে, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হবে। এমনিভাবে অন্যান্য ফল উত্পাদনে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিশেষায়িত কৃষিপণ্য রপ্তানি অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করে চাহিদা মোতাবেক চাষাবাদ, ব্যবস্থাপনা, সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষানিরীক্ষা করে রপ্তানির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে মোট উত্পাদিত দুধের ৮১ ভাগ মিষ্টির দোকানে ও চায়ের দোকানে ব্যবহার করা হয়। তৃণমূল খামারিরা মিষ্টির দোকানদার ও চা-দোকানের মর্জির ওপর নির্ভরশীল। যদি আবহাওয়া খারাপ থাকে, তাহলে দুধ বিক্রি হয় না। প্রান্তিক কৃষকদের উত্পাদিত দুধ ক্রয়কারী ছোট ছোট ব্যবসায়ীদেরও উত্সাহিত করার জন্য নগদ অর্থ দান করছেন। কিন্তু এরপর কি? এই ছোট ছোট ব্যবসায়ীদের ক্রয় করা দুধ সমন্বয় করে বৃহত্ দুগ্ধশিল্প স্থাপন করে চাহিদা অনুযায়ী অধিক পরিমাণ দুধ পাস্তুরিত করে প্যাকেটজাত করা যেতে পারে এবং অধিকসংখ্যক গুঁড়ো দুধ উত্পাদনের শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে দেশের চাহিদা পূরণ করা যায়। এই গুঁড়ো দুধ দিয়ে মিষ্টি তৈরির মূল উপাদান ‘দুধের ছানা’ তৈরি করা যায়। এই প্রক্রিয়ায় প্রান্তিক খামারিদের উত্পাদিত দুধ উপযুক্ত মূল্যে বিক্রি নিশ্চিত হবে, প্রাকৃতিক পরিবেশ বা সামাজিক অস্থিরতার কারণে বা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে বা যে কোনো কারণে দুগ্ধ খামারিদের ব্যবসা, বিনিয়োগ, বিপণন মিষ্টির দোকানদারদের মর্জির ওপর নির্ভরশীল হবে না। নিজের দেশে উত্পাদিত মানসম্মত গুঁড়ো দুধ দিয়ে চাহিদা মেটাতে পারলে প্রচুর পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।

সাধারণত কোনো পণ্য যখন রাসায়নিক ক্রিয়া বা যে কোনো প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নতুনরূপে আবির্ভূত হয় বা নতুন পণ্য হিসেবে তৈরি হয়, যাতে নতুন বা বেশি মূল্য সংযোজিত হয় বা value add হয় সেটাই শিল্পজাত দ্রব্য। কৃষিপণ্য কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে প্রক্রিয়াজাত করে মূল্য সংযোজন করে বাজারজাত করাই কৃষিভিত্তিক শিল্প। কৃষিশিল্প বলতে শস্যবীজ উত্পাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে শুরু করে জৈবসার উত্পাদন, বাজারজাতকরণ, উত্পাদিত পণ্য ব্যবহার করে রকমারি খাবার প্রস্তুতকরণ, বাজারজাতকরণ, রপ্তানিকরণ, মত্স্য হ্যাচারি, মত্স্য খাবার, মত্স্য খামার, মত্স্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, গোখাদ্য-পোলট্রি খাদ্য উত্পাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাজারজাতকরণ, পোলট্রি হ্যাচারি, Beef Fattening, ডিম-দুধ-মাছ-মাংস উত্পাদন প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাজারজাতকরণ ইত্যাদি। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষিশিল্পের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষিভিত্তিক শিল্পে কৃষিপণ্য কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করলে উত্পাদিত পণ্যে মূল্য সংযোজন হয়, ফলে কৃষকরা তাদের উত্পাদিত পণ্যের উপযুক্ত মূল্য পেয়ে অধিক পরিমাণ কৃষিপণ্য উত্পাদনে উত্সাহিত হয়। এতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়। ফলে দেশের অর্থনীতি মজবুত ও টেকসই হয়।

লেখক: ব্যবস্থাপক, জনসংযোগ উপবিভাগ, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন