বিশ্বকাপে রেফারি নিয়োগ করা হয় যেভাবে

বিশ্বকাপে শুধু খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স নয়, রেফারিংও প্রায়ই আলোচনার কেন্দ্রে থাকে। চলতি আসরের শেষ ষোলোয় আর্জেন্টিনা–মিসর ম্যাচে কয়েকটি বিতর্কিত সিদ্ধান্তের পর ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়েরের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেছে মিসর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। একই সঙ্গে কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্স–মরক্কো ম্যাচে রেফারিং দলের সবাই আর্জেন্টিনার হওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

এসব ঘটনার পর অনেকের মনেই প্রশ্ন—বিশ্বকাপে কোন ম্যাচে কোন রেফারিকে কীভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়? এই সিদ্ধান্তই বা নেয় কে?

তিন বছর ধরে চলে বাছাই
বিশ্বকাপের রেফারি নির্বাচন শুরু হয় টুর্নামেন্টের অনেক আগেই। ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য ফিফা ৫২ জন রেফারি, ৮৮ জন সহকারী রেফারি এবং ৩০ জন ভিডিও ম্যাচ অফিশিয়াল (ভিএমও) নির্বাচন করেছে। ছয়টি কনফেডারেশন ও ৫০টি সদস্যদেশের এসব কর্মকর্তাকে নিয়ে গঠন করা হয়েছে ‘ফিফা টিম ওয়ান’।

ফিফা জানিয়েছে, তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা পর্যবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে এই তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে।

ফিফার প্রধান রেফারিং কর্মকর্তা পিয়েরলুইজি কলিনা জানান, নির্বাচিত রেফারিদের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া প্রতিযোগিতা, ফিফার টুর্নামেন্ট এবং প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে ধারাবাহিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।

রেফারিং পরিচালক মাসিমো বুসাক্কার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২২ বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পরই পরবর্তী আসরের জন্য রেফারি বাছাই শুরু হয়। এই প্রক্রিয়ায় রেফারিং প্রশিক্ষকের পাশাপাশি ফিটনেস কোচ, চিকিৎসক ও ফিজিওথেরাপিস্টরাও যুক্ত ছিলেন। অর্থাৎ শুধু সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতাই নয়, শারীরিক সক্ষমতা ও ধারাবাহিক পারফরম্যান্সও সমান গুরুত্ব পেয়েছে।

কোন ম্যাচে কে, সিদ্ধান্ত হয় যেভাবে
বিশ্বকাপে প্রতিটি ম্যাচের জন্য আলাদাভাবে রেফারিং দল নির্ধারণ করে ফিফার রেফারিং কমিটি। নিয়োগের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনা করা হয়।

নিজ দেশের ম্যাচে দায়িত্ব নয়
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম হলো, কোনো দেশের রেফারিকে সাধারণত সেই দেশের ম্যাচে দায়িত্ব দেওয়া হয় না। সম্ভাব্য স্বার্থসংঘাত এড়াতেই এই নীতি অনুসরণ করা হয়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ফ্রান্স যদি সেমিফাইনাল বা ফাইনালে ওঠে, তাহলে ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ের সেই ম্যাচ পরিচালনা করবেন না।

রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক সংবেদনশীলতাও বিবেচনায়
শুধু নিজ দেশের ম্যাচ নয়, রাজনৈতিক বা ঐতিহাসিক কারণে সংবেদনশীল সম্পর্ক রয়েছে—এমন দেশগুলোর ম্যাচেও সংশ্লিষ্ট দেশের রেফারিদের এড়িয়ে চলে ফিফা।

এর অন্যতম উদাহরণ ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধের পর থেকে দুই দেশের ম্যাচে একে অপরের দেশের রেফারি নিয়োগ না দেওয়ার নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।

২০২২ বিশ্বকাপে এ কারণেই ইংলিশ রেফারি অ্যান্টনি টেইলরকে আর্জেন্টিনা–ফ্রান্স ফাইনালের জন্য বিবেচনা করা হয়নি। শেষ পর্যন্ত সেই ম্যাচ পরিচালনা করেন পোল্যান্ডের সিমোন মার্সিনিয়াক।

পারফরম্যান্সই সবচেয়ে বড় মানদণ্ড
নকআউট পর্বে যত এগোনো যায়, তত বেশি গুরুত্ব পায় রেফারিদের পারফরম্যান্স।

প্রতিটি ম্যাচ শেষে রেফারিদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের মান, ভিএআরের সঙ্গে সমন্বয়, ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা, খেলোয়াড়দের সঙ্গে যোগাযোগ এবং শারীরিক সক্ষমতার ওপর বিস্তারিত মূল্যায়ন করা হয়। সেই প্রতিবেদনই পরবর্তী ম্যাচে নিয়োগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ফলে শুধু অতীতের সুনাম নয়, চলতি টুর্নামেন্টে একজন রেফারির পারফরম্যান্সও সমান গুরুত্ব পায়। এ কারণেই গ্রুপ পর্বে দায়িত্ব পাওয়া কোনো রেফারি পরে আর ম্যাচ নাও পেতে পারেন। আবার ধারাবাহিকভাবে ভালো করলে সেমিফাইনাল বা ফাইনালের মতো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ পরিচালনার সুযোগও পেয়ে যান।