মানুষের স্মৃতিশক্তি সৃষ্টিকর্তার অন্যতম বিস্ময়কর দান। স্মৃতিই মানুষকে অভিজ্ঞতার সহিত যুক্ত করে। সুখ-দুঃখ, জয়-পরাজয়, ভুল ও প্রজ্ঞাকে এক সুতায় গাঁথিয়া জীবনের অর্থ নির্মাণ করে। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ কেবল বৃদ্ধ হয় না, যদি স্মৃতি অক্ষুণ্ণ থাকে, তাহা হইলে তিনি অভিজ্ঞতার আলোয় প্রাজ্ঞও হইয়া উঠেন। এই কারণেই জীবনের পরিণত বয়সে মানুষের মূল্য নির্ধারিত হয় শুধু তাহার শক্তি দ্বারা নহে, বরং স্মৃতিতে সঞ্চিত শিক্ষা ও বিচক্ষণতার দ্বারা। কিন্তু যখন স্মৃতির ভান্ডার ক্রমে শূন্য হইতে থাকে, তখন মানুষ যেন ধীরে ধীরে নিজেরই অস্তিত্ব হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়ে। ডিমেনশিয়া এই বিচ্ছিন্নতার নির্মমতম রূপ। প্রথমে মানুষ পরিচিত মুখ চিনিতে পারে না, চিনা পথ হারাইয়া ফেলে, কথার সূত্র ভুলিয়া যায়, দৈনন্দিন কাজের ধারাবাহিকতা ভাঙিয়া পড়ে। একসময় এমন পর্যায় আসে, যখন আত্মীয়স্বজনের পরিচয়, এমনকি নিজের নামও বিস্মৃতির অতলে বিলীন হইয়া যায়। কিন্তু প্রশ্নটি এইখানেই শেষ হয় না। ডিমেনশিয়া কি কেবল ব্যক্তির রোগ? নাকি জাতিও স্মৃতিভ্রংশে আক্রান্ত হইতে পারে?
সমুদ্রের ঢেউ উপকূলের বালুকাবেলায় চিহ্ন আঁকে, আবার পরমুহূর্তেই তাহা মুছিয়া ফেলে। বিস্মৃতি প্রকৃতির এক স্বাভাবিক ছন্দ। ব্যক্তি যখন নিজের জীবনের গল্প ভুলিয়া যায়, তখন সে নিজেরই কাছে অপরিচিত এক সত্তায় পরিণত হয়। কিন্তু যখন একটি জাতি তাহার অতীত বিস্মৃত হয়, তখন তাহা শুধু ইতিহাস হারায় না-হারায় আত্মপরিচয়, হারায় বিচারবোধ, হারায় ভবিষ্যৎ নির্মাণের দিকনির্দেশ। ইতিহাসে বহু শক্তিশালী সাম্রাজ্যের পতনের নেপথ্যে কেবল অর্থনৈতিক বা সামরিক দুর্বলতা ছিল না; ছিল স্মৃতির অবক্ষয়। রোমান সাম্রাজ্য যখন তাহার প্রজাতান্ত্রিক আদর্শ, নাগরিক দায়িত্ববোধ এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যের ঐতিহ্য বিস্মৃত হইল, তখনই পতনের বীজ রোপিত হইয়াছিল। মায়া সভ্যতা-পূর্ববর্তী পরিবেশগত বিপর্যয় হইতে শিক্ষা গ্রহণে ব্যর্থ হইয়াছিল বলিয়াই একই ভুল পুনরাবৃত্ত হইয়াছে। প্রাচীন পারস্যে সাইরাস দ্য গ্রেটের ন্যায়নীতি বিস্মৃত হইবার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত দুর্বল হইয়া পড়ে। ইতিহাসের নির্মম শিক্ষা এই যে, যে সভ্যতা স্মৃতি হারায়, সে কেবল অতীত হারায় না-ভবিষ্যতের উপরও নিজের অধিকার হারায়।
চেক সাহিত্যিক মিলান কুন্দেরা লিখিয়াছেন, 'একটি জাতিকে ধ্বংস করিবার প্রথম উপায় তাহার স্মৃতি ধ্বংস করা।' ইতিহাসের সর্ববৃহৎ ট্র্যাজেডিগুলির একটি হইল-মানুষ বারবার একই ভুল করে, কারণ সে মনে রাখিবার চাইতে ভুলিয়া যাইতে অধিক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। দর্শনের ভাষায় স্মৃতি কেবল অতীতের সংগ্রহশালা নহে, ইহাই নৈতিক বিবেকের ভিত্তি। যেই ব্যক্তি স্মৃতি হারায়, সে নিজের পরিচয় হারায়। অন্যদিকে, যেই জাতি স্মৃতি হারায়, সে নিজের বিবেক হারায়। তখন ইতিহাস আর শিক্ষক থাকে না, পরিণত হয় পুনরাবৃত্তির নিষ্ঠুর মঞ্চে।
ব্যক্তিগত ডিমেনশিয়ার চিকিৎসায় যেমন প্রাথমিক সতর্কতা, মস্তিষ্কচর্চা, সুস্থ জীবন যাপন এবং পরিবারের স্নেহ অপরিহার্য, তেমনি জাতিগত স্মৃতি রক্ষার জন্য প্রয়োজন সত্যভিত্তিক ইতিহাসচর্চা, মুক্তবুদ্ধির শিক্ষা, অতীতের ভুল স্বীকার করিবার নৈতিক সাহস এবং সংস্কৃতির ধারাবাহিক অনুশীলন। কারণ ইতিহাসকে বিকৃত করা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি ইতিহাসকে বিস্মৃত হওয়াও সমান ভয়াবহ। উভয় ক্ষেত্রেই জাতি বাস্তবতা হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়ে। অতএব, স্মৃতি রক্ষা করা মানে ভবিষ্যৎকে প্রজ্ঞার সহিত নির্মাণ করা। যেই ব্যক্তি নিজের স্মৃতি রক্ষা করে, সে নিজের পরিচয় রক্ষা করে। আর যেই জাতি তাহার ঐতিহাসিক স্মৃতি সংরক্ষণ করে, সে কেবল অতীতকে সম্মান জানায় না-ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বিবেক, স্বাধীনতা ও সভ্যতার ভিতও সুদৃঢ় করিয়া যায়। আমরা যেমন পথে চলিত, তেমনই পরিণতি পাইব।