মহান সৃষ্টিকর্তা এই ধূলিবিশ্বের প্রতিটি প্রাণীর মধ্যে একটি সহজাত প্রবৃত্তি দান করিয়াছেন; উহা হইল, নিজেকে টিকাইয়া রাখা এবং স্বজাতিকে রক্ষা করা। একটি ক্ষুদ্র পাখি নিজের ছানাকে রক্ষা করিবার জন্য হন্তারক বাজপাখির সম্মুখে নির্ভয়ে ঝাঁপাইয়া পড়ে; একটি মা-মুরগি শিয়াল কিংবা চিলের আক্রমণের মুখেও প্রাণের মায়া ত্যাগ করিয়া আগলাইয়া রাখে সন্তানকে। প্রকৃতির এই অলিখিত বিধান লক্ষ লক্ষ বৎসর ধরিয়া অপরিবর্তিত রহিয়াছে। অথচ বিস্ময়ের বিষয়, সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব বলিয়া পরিচিত মানুষই আজ যেন সেই চিরন্তন নিয়মনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান লইয়াছে। যাহার হাতে 'নিরাপত্তা' থাকিবার কথা, সেই হাতেই আজ রক্তের দাগ লাগিতেছে; যাহার বুকে আশ্রয় মিলিবার কথা, সেই বুকেই আজ ভয়। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এই ধরনের একের পর এক সংবাদ স্বভাবতই আমাদের বিবেককে নাড়া দিয়া যায়। শাসন করিতে গিয়া পিতা-মাতার মারধরে সন্তানের মৃত্যু, পারিবারিক অশান্তির জেরে শিশুসন্তানকে লইয়া মায়ের আত্মঘাতী হইবার সিদ্ধান্ত, সামান্য বিরক্তির কারণে ভাইয়ের হাতে ভাইয়ের প্রাণহানি-ইহা কি কেবলই বিচ্ছিন্ন অপরাধ? না, ইহা আমাদের সমাজেরই এক গভীর নৈতিক বিপর্যয়ের লক্ষণ। আরও উদ্বেগের বিষয় হইল, বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে অবহেলা, অপমান কিংবা পরিত্যাগের ঘটনাও দিনদিন বাড়িতেছে। যাহারা জীবনভর সন্তানকে আগলাইয়া রাখিয়াছেন, বার্ধক্যে সেই তাহারাই যেন সকলের চাইতে অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষে পরিণত হইতেছেন। সমাজজীবনে আজ কেন এই মানবতার সংকট?
পবিত্র কোরআন মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ককে রহমত ও ভালোবাসার ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করিয়াছে। আল্লাহ তাআলা বলিয়াছেন, ‘তিনি তোমাদের মধ্যে পরস্পরের জন্য ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করিয়াছেন।’ (সুরা আর-রুম: ২১)। অন্যত্র তিনি সতর্ক করিয়াছেন, ‘যেই ব্যক্তি অন্যায়ভাবে একজন মানুষকে হত্যা করে, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকেই হত্যা করিল।’ (সুরা আল-মায়িদা: ৩২)। মহানবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলিয়াছেন, ‘যে দয়া করে না, তাহার প্রতি দয়া করা হয় না।’ এই শিক্ষাই কি মানবসভ্যতার চিরন্তন নৈতিক ভিত্তি নহে, যাহা হইতে আমরা ক্রমশ বিচ্যুত হইয়া পড়িতেছি?
অনেকে বলিবেন, বর্তমান বিশ্বের অস্থিরতা, যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, কর্মসংস্থানের সংকট এবং পারিবারিক চাপ মানুষের সহিষ্ণুতা কমাইয়া দিতেছে। কথাটি অমূলক নহে; কিন্তু প্রশ্ন হইল, প্রতিকূলতা কি কেবল মানুষের ভাগ্যেই লিখিত? অরণ্যে প্রতিদিন খাদ্যের জন্য সংগ্রাম, শিকারির ভয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ-এই সকল পরিস্থিতির মধ্য দিয়াও প্রাণিকুল স্বজাতিকে রক্ষা করিবার প্রবৃত্তি বিসর্জন দেয় না। সুতরাং, স্বজাতি বিরুদ্ধ হইয়া প্রকারান্তরে মানুষ কি আত্মবিসর্জন দিতেছে না?
বিশ্ব ইতিহাসও যেন একই সতর্কবাণী উচ্চারণ করে। যেই সমাজে পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হইয়াছে, সেই সমাজে সহিংসতা, মানসিক অবসাদ, একাকীত্ব ও অপরাধের বিস্তার ঘটিয়াছে, সেই সমাজ ধ্বংস হইয়া গিয়াছে। মূলত এই কারণেই আধুনিক বিশ্বের বহু উন্নত রাষ্ট্র আজ পরিবারকেন্দ্রিক নীতি, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সংহতি পুনর্গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করিতে বাধ্য হইতেছে। তাহারা উপলব্ধি করিয়াছে, রাষ্ট্রের ভিত্তি ইট-পাথরের অট্টালিকা নহে; বরং রাষ্ট্রের ভিত্তি পরিবার, আর পরিবারের ভিত্তি স্নেহ-মায়া-মমতা।
মনুষ্যত্বের এই সংকটের সমাধান কেবল কঠোর আইন প্রণয়নে সম্ভব নহে। এই জন্য পরিবার ও ব্যক্তি জীবনে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার পুনর্জাগরণ, স্বজাতির মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক সহমর্মিতার সংস্কৃতি গড়িয়া তোলা আজ সময়ের অনিবার্য দাবি। যেই শিক্ষা মানুষকে ‘মানবিক’ না করিয়া কেবল কর্মজীবনের উপযোগী করে, সেই শিক্ষা নিঃসন্দেহে অসম্পূর্ণ। অতএব, প্রকৃতির চিরন্তন নিয়মে, মানবতার শাশ্বত শিক্ষায় এবং বিবেকের আলোকেই মানুষকে মানুষের নিকট ফিরিয়া আসিতে হইবে। অন্যথায়, ইতিহাস হয়তো একদিন লিখিবে-পৃথিবীর একমাত্র প্রাণী, যে নিজের স্বজাতির জন্য সবচাইতে বড় বিপদে পরিণত হইয়াছিল, তাহার নাম মানুষ।