শরণার্থীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করতে জাতিসংঘ ২০০১ সাল থেকে প্রতি বছর ২০ জুন বিশ্ব শরণার্থী দিবস পালন করছে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য Solidarity with refugees অর্থাৎ 'শরণার্থীদের সঙ্গে সংহতি'। এটি শরণার্থীদের অধিকার, মর্যাদা, জীবিকা ও প্রত্যাবাসন বিষয়কে গুরুত্ব দেয়। শরণার্থীদের অধিকার ও স্বার্থ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১৯৫১ সালে জাতিসংঘ রিফিউজি কনভেনশন স্বাক্ষরিত হয়। কনভেনশন অনুসারে শরণার্থীরা ১০টি অধিকারভোগী। যথা—বহিষ্কৃত না হওয়া; অনুপ্রবেশের জন্য শাস্তিভোগ না করা; কাজ করার অধিকার; আশ্রয়, শিক্ষা, ত্রাণ ও সহযোগিতাপ্রাপ্তি; ধর্ম পালনের স্বাধীনতা; আইনগত সুবিধা; দেশের অভ্যন্তরে অবাধ চলাচল সুবিধা এবং পরিচিতি ও ভ্রমণ দলিলপ্রাপ্তি। তবে বাংলাদেশ রিফিউজি কনভেনশন ও প্রটোকলে স্বাক্ষর করেনি বিধায় এর কিছু শর্ত মানতে বাধ্য নয় ।
সমগ্র বিশ্ব জুড়ে একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই প্রত্যক্ষ করা গেছে বিশৃঙ্খলা ও গণহারে দেশান্তরী হওয়া মানুষের মিছিল। এরা স্বদেশত্যাগী হতে বাধ্য হয়েছে এবং হচ্ছে যুদ্ধ অথবা শাসক সম্প্রদায়ের নির্যাতনে, কিংবা শিক্ষা, প্রশিক্ষণ অথবা কাজের সন্ধানে। এই পরিস্থিতি মানুষের চিন্তাচেতনাকে ভোঁতা করে দেওয়া ছাড়াও এর একটি ভূরাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। এসব ঠিকানাবিহীন মানুষদের উপজীব্য করে সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের প্রয়াস পাচ্ছে কর্তৃত্ববাদী শাসকরা। আবার এ ধরনের কোনো কোনো শাসক উদ্বাস্তু মিছিলকে হাতিয়ার করে যুদ্ধের মহড়ায় লিপ্ত হয়েছে। কেউ কেউ আবার নিজ দেশের কর্মজীবী মানুষদের খেপিয়ে তুলছে এসব শরণার্থীর বিরুদ্ধে তাদের কাজের সুযোগ- সীমিত ও সংকুচিত করার ধুয়ো তুলে। যেমনটি ঘটেছে যুক্তরাজ্যে ব্রেক্সিট আন্দোলনের সাফল্য এবং জার্মানির সাম্প্রতিক নির্বাচনে মের্কেলের পরাজয় এবং কট্টর জাতীয়তাবাদী বলে কথিত ডানপন্থি এএফডি দলের বিজয়ের মধ্য দিয়ে। এরকম একটি পরিস্থিতিকে সামনে রেখে শুরু হওয়া জাতিসংঘ শীর্ষ সম্মেলনের এজেন্ডায় বিষয়টি থাকায় অনেকেই খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু তা বিশ্ববিবেককে কতটা আশ্বস্ত করতে পেরেছে, সে ব্যাপারে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
অথচ আজ থেকে ৬০ বছর আগে গণহারে বাধ্য হয়ে দেশান্তরী হওয়া মানুষদের নিয়ে দায়িত্ব রয়েছে বলে একমত হয়েছিলেন বিশ্বনেতৃবৃন্দ। ১৯৫১ সালে শরণার্থীসংক্রান্ত জেনেভা কনভেনশনের দলিলে সই করে বিশ্বের ১৪৪টি রাষ্ট্র। কিন্তু এখন এই কনভেনশনের শর্তসমূহ অকার্যকর হওয়ার হুমকিতে পড়েছে। রাজনীতিবিদরা নিজ নিজ দেশের পরিস্থিতির চাপে এ দায় এড়াতে উদগ্রীব হয়ে পড়েছেন। বিশ্ব জুড়ে নৈতিক দায়িত্বের বিষয়টি অবহেলিত হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি উত্থান ঘটছে জাতীয় পরিচিতির সীমিত পরিসরে উগ্র জাতীয়তাবাদ। ভিনদেশিদের ব্যাপারে প্রথাগত ভীতি এবং অর্থনৈতিক মন্দার ফলে সরকারের জনসেবা বা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার সুযোগ সীমিত হওয়াকে উপজীব্য
করে এ উগ্রতা উসকে দেওয়া হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য রাষ্ট্রের ঐকমত্যের ভিত্তিতে শরণার্থী ও অভিবাসী বিষয়ক নিউ ইয়র্ক ঘোষণা অনুমোদিত হয়েছে এবং আশা করা হয়েছে যে, এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে ইউরোপসহ বিশ্বব্যাপী বহমান শরণার্থী স্রোতকে মানবিক বিবেচনায় মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। কিন্তু এ ব্যাপারে সন্দেহ রয়েছে যথেষ্ট । কারণ পুরো ঘোষণা পাঠ করলেই এর অস্পষ্টতা ও বিমূর্ততা ধরা পড়ে। এই ঘোষণার সীমাবদ্ধতা হচ্ছে, এর কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এই ঘোষণায় যে যুদ্ধ ও দারিদ্র্যের জন্য পালিয়ে বাঁচতে চাওয়া হাজার হাজার মানুষ বিপদসংকুল পথে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে শরণার্থী জীবন বেছে নিতে মরিয়া, তার অবসানের কোনো দিকনির্দেশনা নেই। আছে শুধু আহাজারি। এর উৎসমুখ বন্ধেরও কোনো অঙ্গীকার নেই।
ইউএনএইচসিআর বলছে, গত এক দশকে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা হয়েছে দ্বিগুণ। অথচ সংস্থাটির মানবিক তহবিল এখনো ২০১৫ সালের মতো রয়ে গেছে। ফলে চলমান ব্যয় সংকোচন শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুতদের আরো ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
শরণার্থীদের আশ্রয় দানকারী দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাও এক বাস্তবতা। পরিবেশ- প্রতিবেশের ক্ষতি, সামাজিক বিশৃঙ্খলা, স্থানীয়- বহিরাগত দ্বন্দ্ব, এমন অনেক ঘটনা ঘটে। রোহিঙ্গা অবস্থানের ফলে বাংলাদেশও এমন অনেক অভিজ্ঞতার শিকার । ক্যাম্পের অভ্যন্তরে ও বাইরে প্রায়ই সহিংসতা ও সংঘাতের ঘটনা ঘটছে। ক্যাম্পের বাইরে স্থানীয়দের সঙ্গে সংঘাত, চোরাচালানে সহযোগিতা, অবৈধভাবে বাংলাদেশি পাসপোর্ট সংগ্রহ করে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের দুর্নাম ঘটাচ্ছে । জানা যায়, ৩৩টি ক্যাম্পে অন্তত ১২টি রোহিঙ্গা সশস্ত্র গ্রুপ রয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের এসব সশস্ত্র গ্রুপ আরাকান আর্মির সঙ্গে যুদ্ধ করতে বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে সদস্য সংগ্রহ করছে। এ উদ্যোগ চলমান থাকলে ক্যাম্পের নিরাপত্তা পরিবেশ বিঘ্নিত হবে এবং স্থানীয় পরিবেশ অশান্ত করবে। কেননা, ধরে নেওয়া যায় এর সঙ্গে স্থানীয় স্বার্থান্বেষী মহলও সম্পৃক্ত হবে। অন্যদিকে তহবিলসংকটের কারণে রোহিঙ্গাদের মানবিক সাহায্য ক্রমশ সীমিত হচ্ছে। ৯ জুন ২০২৫ ইউনিসেফ সংবাদ সম্মেলনে জানায়, তহবিলসংকটের কারণে ১ হাজার ১৭৯ জন স্থানীয় শিক্ষককে বাদ দেওয়া হচ্ছে। ফলে ৪ সহস্রাধিক লার্নিং সেন্টার বন্ধ হয়ে যাবে এবং ২ লাখ ৩০ হাজার শিশু শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে।
২০২৫ সালে শরণার্থী দিবসের প্রাক্কালে জাতিসংঘের শরণার্থী-বিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্ডি বলেছেন, 'আমরা এখন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এক অস্থির সময়ে বাস করছি, যেখানে আধুনিক যুদ্ধ এক ভঙ্গুর ও মর্মান্তিক মানবিক সংকট তৈরি করেছে । শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য শান্তিপূর্ণ ও টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে আমাদের আরো বেশি প্রচেষ্টা দরকার।'
বিশ্ব জুড়ে রেকর্ড সংখ্যক মানুষ যুদ্ধ, সহিংসতা ও নিপীড়নের কারণে বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। তাই মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের পাশে দাঁড়ানো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়সহ আমাদের সবার দায়িত্ব। নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটে আসা এই মানুষগুলোর জন্য খাবার, বস্ত্র, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের মতো জরুরি সহায়তা প্রয়োজন হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা নিজ নিজ অবস্থান থেকে শরণার্থীদের মানবেতর জীবনযাপন সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা এবং তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে অন্যদের উৎসাহিত করা। বাস্তুচ্যুতদের পুনর্বাসন ও সুরক্ষায় কাজ করে, এমন বিশ্বস্ত সংস্থাগুলোকে সহায়তা বা অনুদান প্রদান করতে পারেন।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার সর্বশেষ বৈশ্বিক প্রতিবেদন অনুযায়ী যুদ্ধ, সংঘাত, নিপীড়ন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে বর্তমানে বিশ্ব জুড়ে অন্তত ১১ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত অবস্থায় জীবন যাপন করছেন। মোট বাস্তুচ্যুত মানুষের মধ্যে প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখই শিশু। অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত হয়ে ৬ কোটি ৮৬ লাখ মানুষ সংঘাতের কারণে নিজ দেশের ভেতরেই গৃহহীন হয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চের শুরু থেকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় কেবল লেবাননেই ১০ লাখের বেশি মানুষ নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এক দশকের মধ্যে প্রথম বারের মতো ২০২৫ সালে এই সংখ্যা কিছুটা হ্রাস পেলেও, ২০২৬ সালের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সংঘাত পরিস্থিতিকে আবারও মারাত্মক করে তুলেছে।
বিশ্ব জুড়ে শরণার্থীদের প্রায় ৭৩ ভাগ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে বসবাস করায় তারা খাদ্য, বাসস্থান ও চিকিৎসার চরম সংকটে ভুগছে। এর ওপর আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা তহবিল কাটছাঁট হওয়ায় সংকট আরো ঘনীভূত হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী ৭০ শতাংশ শরণার্থীই পাঁচ বছর বা তার বেশি সময় ধরে দীর্ঘমেয়াদি নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছে। আন্তর্জাতিক তহবিলসংকটের কারণে মানবিক সহায়তা সংকুচিত হচ্ছে, যা শরণার্থীদের মৌলিক স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সুরক্ষাকে চরম ঝুঁকিতে ফেলছে । এই সংকট উত্তরণে জাতিসংঘ ২০৩৫ সালের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি শরণার্থীদের মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যার মূল চাবিকাঠি হলো শরণার্থীদের স্থানীয় কর্মসংস্থান ও শিক্ষার সুযোগ দেওয়া এবং নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা।
দীর্ঘমেয়াদি শরণার্থীসংকটে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আশ্রিতদের একটি সামাজিক মিথস্ক্রিয়া তৈরি হয়। রাষ্ট্রকে একদিকে আইনের শাসন, স্থানীয়দের অধিকার ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়, অন্যদিকে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে শরণার্থীদের ন্যূনতম মর্যাদা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ নিতে হয়। ভবিষ্যতে শরণার্থীদের আইনি সুরক্ষা ও সুষ্ঠু অভিবাসন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক কাঠামো গড়ে তোলা অপরিহার্য।
পরিশেষে, শরণার্থীসংকটের মূল সমাধান কেবল দান বা আশ্রয়ে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর স্থায়ী সমাধান নিহিত রয়েছে সংঘাত নিরসন, টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং প্রতিটি মানুষের মর্যাদা রক্ষার বৈশ্বিক রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।
লেখক: ফিকামলি তত্ত্বের জনক; বিশ্ববিদ্যালয় সাবেক শিক্ষক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক