সাম্প্রতিক ম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গেছে, ইসলামী ব্যাংক সম্প্রতি আস্থার সংকটে পড়েছে। জুন মাসে মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে আমানতকারীরা ব্যাংকটি থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন। ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে খুরশীদ আলমের নিয়োগের পরই এই বিপুল অর্থ উত্তোলনের প্রবণতা দেখা দেয়। খুরশীদ আলমকে নিয়ে গুঞ্জন ছিল যে, তিনি ক্ষমতাধর এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে এবং ব্যাংকটি থেকে ব্যাপক অর্থ লুট করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। জনগণ যখন কোনো ব্যাংকের ওপর আস্থা হারায় এবং বিপুলসংখ্যক আমানতকারী একযোগে অর্থ তুলে নিতে শুরু করেন, তখন শেষ পর্যন্ত ঐ ব্যাংকের হাতে নগদ অর্থ ফুরিয়ে যায়।
ব্যাংকিংয়ের মূল ব্যবসা হলো আমানতকারীদের অর্থ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ভোক্তাদের ঋণ হিসেবে প্রদান করা। পৃথিবীর কোনো ব্যাংকের ভল্টেই এত নগদ অর্থ থাকে না যে, একসঙ্গে তাদের আমানতকারীদের সামান্য একটি অংশের বেশি অর্থ ফেরত দেওয়া সম্ভব হবে। আমানতকারীদের আস্থাহীনতার কারণে ব্যাপক অর্থ উত্তোলন শুরু হলে একটি ব্যাংক 'ব্যাংক রান'-এর মুখে পড়তে পারে। 'ব্যাংক রান' বলতে এমন পরিস্থিতিকে বোঝায়, যখন বিপুলসংখ্যক আমানতকারী অপ্রত্যাশিতভাবে অর্থ তুলে নেওয়ায় ব্যাংকের হাতে নগদ অর্থ শেষ হয়ে যায় এবং বাধ্য হয়ে শাখাগুলো বন্ধ করতে হয়। একটি ব্যাংকে 'ব্যাংক রান' শুরু হলে সাধারণত আস্থা আরো কমে যায়, যার পরিণতিতে ব্যাংকটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর জানিয়েছেন, ইসলামী ব্যাংককে ১৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। সম্ভবত এই পদক্ষেপই ইসলামী ব্যাংকে 'ব্যাংক রান' প্রতিরোধ করেছে।
খুরশীদ আলমকে অপসারণ করা হয়েছে, কিন্তু প্রকৃত সমস্যার সমাধান হয়নি। ইসলামী ব্যাংক কার্যত দেউলিয়া। গত ৭ জুন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়, ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা এর মোট ঋণের ৫০ শতাংশেরও বেশি।
ইসলামী ব্যাংক একা নয়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের প্রতারণার শিকার হওয়া একাধিক ব্যাংকের মধ্যে এটি একটি। প্রতারকরা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে নিজেদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান কিংবা ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে বাধ্য করেছে।
ঋণগ্রহীতারা অতিমূল্যায়িত দামে আমদানির কাগজপত্র তৈরি করে ঋণ গ্রহণ করেন এবং পরে সেই ঋণ পরিশোধে খেলাপি হন। ব্যাংকের পরিচালক এবং তাদের সঙ্গে যোগসাজশকারী ঋণগ্রহীতারা ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার করার পর নিজেরাও বিদেশে চলে যান।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সরকার সুস্থ আর্থিক অবস্থায় থাকা ব্যাংকগুলোর ওপর দুর্বল বা কার্যত দেউলিয়া ব্যাংক অধিগ্রহণের জন্য চাপ সৃষ্টি করেছিল। এসব দেউলিয়া ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সরকারি সহায়তা ছাড়া তারা আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে সক্ষম হবে না।
সুস্থ ব্যাংককে দেউলিয়া ব্যাংক অধিগ্রহণে বাধ্য করা সঠিক নীতি নয়। আমি যদি একটি সুস্থ ব্যাংকের মালিক হতাম এবং সরকার আমাকে একটি দেউলিয়া ব্যাংকে বিনিয়োগ করতে বলত, তাহলে আমি বলতাম, 'আমার আমানতকারীদের সঞ্চয় রক্ষা করার দায়িত্ব আমার রয়েছে। সরকার যদি এই বিনিয়োগের শতভাগ নিশ্চয়তা না দেয়, তাহলে আমি কোনো দেউলিয়া ব্যাংকে বিনিয়োগ করব না।'
সুস্থ ব্যাংককে দেউলিয়া ব্যাংক উদ্ধারে বাধ্য করার পরিবর্তে সরকারকেই দেউলিয়া ব্যাংকগুলোর উদ্ধারকাজে এগিয়ে আসা উচিত। এজন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সরকারি বন্ড বিক্রির মাধ্যমে সংগ্রহ করা যেতে পারে, যা সুস্থ ব্যাংকগুলো স্বেচ্ছায় কিনবে। সরকারের উচিত এই অর্থ ঋণ হিসেবে নয়, মূলধনি বিনিয়োগ বা ইকুইটি হিসেবে প্রদান করা। এর ফলে সরকার দেউলিয়া ব্যাংকগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ারহোল্ডারে পরিণত হবে এবং কার্যত সেগুলো জাতীয়করণ হবে। জাতীয়করণ দেউলিয়া ব্যাংকগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনবে এবং 'ব্যাংক রান' প্রতিরোধ করবে। মানুষ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ওপর আস্থা রাখে, কারণ তারা জানে, প্রয়োজন হলে সরকার বন্ড বিক্রি করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে রাখা আমানত ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।
জনতা ব্যাংকের মতো কিছু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকেও বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ রয়েছে। তবু তাদের আমানতকারীরা হুমড়ি খেয়ে অর্থ তুলে নেওয়ার চেষ্টা করছেন না। সরকার যদি দেউলিয়া কোনো ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার নিশ্চয়তা দেয়, তাহলে সম্ভবত সেই ব্যাংকেও 'ব্যাংক রান' এড়ানো সম্ভব হবে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে, বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতে শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এত বড় অঙ্ক কল্পনা করা কঠিন।
পদ্মা সেতু নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল ৩০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ খেলাপি ঋণের অর্থ দিয়ে ১৯টি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব। দেউলিয়া ব্যাংকগুলোকে উদ্ধার করতে সরকারকে সম্ভবত প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকার সরকারি বন্ড বিক্রি করতে হবে। এই বিপুল অঙ্ক-৫ লাখ কোটি টাকা-আমাদের প্রায় ৯ লাখ কোটি টাকার জাতীয় বাজেটের প্রায় অর্ধেকের সমান। এত বিপুল পরিমাণ সরকারি বন্ড বিক্রি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দেবে। ব্যাংকগুলো যখন সরকারি বন্ড কিনবে, তখন তাদের হাতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাছে ঋণ দেওয়ার জন্য কম অর্থ থাকবে। সরকার বিপুল পরিমাণ বন্ড বিক্রি করলে অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যাংকঋণ পাবে না এবং তাদের সম্প্রসারণও ব্যাহত হবে।
অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, দুর্বল ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত ব্যাংকগুলোকে উদ্ধার করা হবে কেন? সেগুলোকে বন্ধ হয়ে যেতে দেওয়া হবে না কেন?
সমস্যা হলো, যদি ইসলামী ব্যাংকের মতো বড় একটি দেউলিয়া ব্যাংকে 'ব্যাংক রান' শুরু হয়, তাহলে জনগণ পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারাতে পারে এবং সুস্থ ব্যাংকগুলো থেকেও দ্রুত আমানত তুলে নেওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে।
দেউলিয়া ব্যাংক বন্ধ করে দেওয়া অবশ্যই একটি বিকল্প। তবে সেটি এমনভাবে করতে হবে, যাতে আমানতকারীরা সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়ায় তাদের অর্থ ফেরত পান। সরকার যদি আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার নিশ্চয়তা দেয়, তাহলে 'ব্যাংক রান' এড়ানো সম্ভব।
মাত্র কয়েক দশক আগেও বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ তাদের সঞ্চয় নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার ও স্থাবর সম্পত্তির আকারে সংরক্ষণ করতেন। মানুষ যদি আবার ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারায়, তাহলে সেই পরিস্থিতিই আবার স্বাভাবিক রূপ নিতে পারে। ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারানো মানে হবে ব্যাংকগুলোতে আর আমানত থাকবে না এবং ঋণ দেওয়ার মতো অর্থও থাকবে না। ব্যাংকের কার্যকর মূলধন ঋণ ছাড়া সুস্থ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও সংকুচিত হবে। কর্মসংস্থানও কমে যাবে।
ব্যাংকের আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত না করলে আমরা 'ব্যাংক রান'-এর মুখোমুখি হতে পারি, যার পরিণতিতে অর্থনীতি ধসে পড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হবে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, দেউলিয়া ব্যাংকগুলোকে অবশ্যই টিকে থাকতে হবে।
কোনো দেউলিয়া ব্যাংককে উদ্ধার করার সময় সরকার চাইলে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার পর ব্যাংকটি বন্ধ করে দিতে পারে। ব্যাংকটির অবশিষ্ট সম্পদ-ঋণ ও বন্ধক রাখা সম্পত্তি-রাষ্ট্রায়ত্ত কোনো ব্যাংক বা সম্পদ ব্যবস্থাপনাপ্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা যেতে পারে। খেলাপি ঋণের একটি অংশ ঋণখেলাপিদের বন্ধক রাখা সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে উদ্ধার করা সম্ভব হতে পারে।
তবে ঋণখেলাপি ও তাদের সঙ্গে যোগসাজশকারী ব্যাংক পরিচালকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর নিষ্পত্তি হতে বহু বছর লেগে যাবে। আর যদি ঋণখেলাপি ও সংশ্লিষ্ট পরিচালকরা ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার করে নিজেরাও বিদেশে চলে গিয়ে থাকেন, তাহলে তারা আমাদের আদালতের বিচারিক এক্তিয়ারের বাইরে থেকে যাবেন।
লেখক: যুক্তরাষ্ট্রের ওবারলিন কলেজ থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক এবং কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী