কেরানীগঞ্জে ২০ লাখ মানুষের নিরাপত্তায় মাত্র ৩৬৬ পুলিশ, চাপে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা

রাজধানীর লাগোয়া গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা কেরানীগঞ্জে জনসংখ্যা ও অপরাধপ্রবণতা বাড়লেও সেই তুলনায় বাড়েনি পুলিশের জনবল ও সরঞ্জাম। স্থানীয়দের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ২০ লাখ মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ৩৬৬ জন পুলিশ সদস্য। দুই থানা, চার ফাঁড়ি ও তিন অস্থায়ী ক্যাম্প নিয়ে বিশাল এই জনপদে সীমিত জনবল ও অপ্রতুল যানবাহন নিয়েই আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করছে পুলিশ।

শিল্পকারখানা, আবাসিক এলাকা, নৌপথ, পাইকারি বাজার এবং রাজধানীতে প্রবেশের অন্যতম করিডর হওয়ায় কেরানীগঞ্জে প্রতিদিন বিপুল মানুষের চলাচল থাকে। ১২টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই উপজেলা ঢাকা-২ ও ঢাকা-৩ সংসদীয় আসনের অন্তর্ভুক্ত। উপজেলা নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এখানে ভোটার ৬ লাখ ৫৪ হাজার ৪৯ জন। ২০২২ সালের জনশুমারিতে জনসংখ্যা ১০ লাখ ১১ হাজার ১ জন দেখানো হলেও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বাসিন্দাদের দাবি, বর্তমানে এই সংখ্যা ২০ লাখ ছাড়িয়েছে।

এলাকাবাসী, ব্যবসায়ী ও পুলিশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানীর নিকটবর্তী হওয়ায় কেরানীগঞ্জে দ্রুত নতুন বসতি, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে উঠছে। এর পাশাপাশি বেড়েছে ভাসমান মানুষের উপস্থিতিও। সেই সঙ্গে মাদক পাচার, কিশোর গ্যাং, ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি, হত্যা ও ধর্ষণসহ নানা ধরনের অপরাধও বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য, রাজধানীতে অপরাধ সংঘটিত করে অনেক অপরাধী বুড়িগঙ্গা পার হয়ে কেরানীগঞ্জের অপেক্ষাকৃত নিরিবিলি এলাকায় আত্মগোপন করে।

দুই থানার তথ্য অনুযায়ী, গত জুন মাসে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় ১০২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পাঁচটি হত্যা, দুটি ধর্ষণ, দুটি দস্যুতা ও পাঁচটি চুরির মামলা। একই সময়ে কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় হয়েছে ৭২টি মামলা। এর মধ্যে চুরি-ডাকাতির আটটি, একটি ধর্ষণ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে উপজেলায় রয়েছে দুটি থানা, চারটি পুলিশ ফাঁড়ি ও তিনটি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প। কিন্তু জনবলের সঙ্গে সঙ্গে প্রকট রয়েছে যানবাহনের সংকটও। দুই থানার জন্য মোট গাড়ি আছে মাত্র আটটি। এর মধ্যে তিনটি সরকারি এবং পাঁচটি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় পাওয়া। প্রয়োজন হলে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও লেগুনা ভাড়া করেও দায়িত্ব পালন করতে হয় পুলিশকে। একই সঙ্গে টহল, মামলা তদন্ত, আসামি গ্রেপ্তার, আদালতে হাজিরা, ভিআইপি নিরাপত্তা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, সরকারি কর্মসূচি এবং জনসমাবেশের নিরাপত্তাসহ বহুমাত্রিক দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। বর্তমানে দুই থানার অধীনে ২২টি মোবাইল টিম ও আটটি চেকপোস্ট কাজ করছে।

কেরানীগঞ্জ উপজেলা পরিসংখ্যান কর্মকর্তা বিউটি আক্তার বলেন, ২০২২ সালের জনশুমারির পর গত চার বছরে উপজেলার জনসংখ্যা অন্তত ১০ শতাংশ বেড়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কেরানীগঞ্জ মডেল থানার এক কর্মকর্তা জানান, আন্তর্জাতিকভাবে প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য প্রায় ২২২ জন পুলিশ সদস্যকে গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড ধরা হয়। সে হিসাবে ২০ লাখ মানুষের জন্য প্রয়োজন প্রায় ৪ হাজার ৪৪০ জন পুলিশ সদস্য। সেখানে ৩৬৬ জন সদস্য দিয়ে সব দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। তার ভাষ্য, এই জনবল নিয়ে কাজ করতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের মানসিক চাপের মধ্যে থাকতে হচ্ছে।

একই থানার এক উপপরিদর্শক বলেন, ‘মব কালচার’ এখন পুলিশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাও হামলার শিকার হয়েছেন। তার মতে, পর্যাপ্ত সদস্য থাকলে এ ধরনের পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সহজ হতো।

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার এক উপপরিদর্শক বলেন, প্রতিটি ইউনিয়নে নিয়মিত টহল, জরুরি সাড়া, মাদকবিরোধী অভিযান, কিশোর গ্যাং দমন এবং মামলার তদন্ত—সব ক্ষেত্রেই জনবল সংকটের প্রভাব পড়ছে। মাঠপর্যায়ে সদস্যসংখ্যা আরও কমে যায়, কারণ অনেককে প্রশাসনিক কাজ, আদালতে হাজিরা ও নিরাপত্তা দায়িত্বে থাকতে হয়।

আরেক কর্মকর্তা বলেন, জনবল কম থাকায় অনেক সময় টানা ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়। এতে পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবনেও চাপ পড়ে। তবে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তায় কাজ করে যেতে হচ্ছে। তার মতে, সদস্যসংখ্যা বাড়লে যেমন পুলিশের ওপর চাপ কমবে, তেমনি জনগণও দ্রুত সেবা পাবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কেরানীগঞ্জ শাখার সাধারণ সম্পাদক কাওসার আহমেদ বলেন, কেরানীগঞ্জের জনসংখ্যা, ভৌগোলিক বিস্তৃতি ও অপরাধের ধরন বিবেচনায় দ্রুত পুলিশ সদস্য বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে নতুন ফাঁড়ি, তদন্তকেন্দ্র, আধুনিক প্রযুক্তি ও পর্যাপ্ত লজিস্টিক সহায়তারও প্রয়োজন রয়েছে।

ঢাকা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কেরানীগঞ্জ সার্কেল) মো. জামিলুল হক বলেন, বিশাল এই জনপদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে জনবল ও পরিবহন-সীমাবদ্ধতার কারণে বাড়তি চাপ নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। তবু পুলিশ সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে জনগণের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও বলেন, অভিযোগকারী অবস্থায় অনেকেই পুলিশের কঠোর পদক্ষেপ চান, কিন্তু অভিযুক্ত বা বিবাদীপক্ষ হলে একই ব্যক্তিরাই পুলিশের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এ ধরনের দ্বৈত মানসিকতা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরও জানান, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪২ ধারা অনুযায়ী শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা বা আসামি গ্রেপ্তারে পুলিশ কোনো ব্যক্তির সহযোগিতা চাইলে তা দিতে হয়। অন্যথায় দণ্ডবিধির ১৮৭ ধারায় তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে ঢাকা-৩ আসনের সংসদ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ও বলেন, রাজধানীতে অপরাধ করে অনেকেই বুড়িগঙ্গা পেরিয়ে কেরানীগঞ্জে আশ্রয় নেয়। একই সঙ্গে শিল্পকারখানা ও ঘনবসতির কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষের আগমন বাড়ছে। ফলে এ এলাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণের চাপও বাড়ছে।