আমদানিকৃত কোটি কোটি টাকার চিকিৎসা যন্ত্রপাতি শেষ পর্যন্ত ভাঙারির দোকানে কেজি দরে বিক্রয় হইতেছে—ইহার চাইতে হতাশাজনক খবর আর কী হইতে পারে? গতকাল ইত্তেফাকে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত প্রতিবেদনটি আমাদের দেশের রুগণ স্বাস্থ্য খাতের কঙ্কালসার রূপটিকেই অতি নগ্নভাবে উন্মোচিত করিয়াছে। ইহা কেবল অদূরদর্শিতা নহে, বরং দেশের স্বাস্থ্য খাতের চরম অব্যবস্থাপনা, সীমাহীন দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের এক জীবন্ত দলিল। সংসদে খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানাইয়াছেন যে, বিগত রাজনৈতিক সরকারের আমলে আমদানিকৃত এই সকল যন্ত্রপাতির সুরক্ষার কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা ছিল না। আসলে তাহা অপরিকল্পিত উপায়ে কেবল কমিশনভোগীদের পকেট ভারী করিবার হীন উদ্দেশ্যে ক্রয় করা হয়। খুলনা ও ফরিদপুরের সরকারি হাসপাতালে দীর্ঘকাল পড়িয়া থাকা ১৮ কোটি টাকা মূল্যের দুইটি রেডিওথেরাপি মেশিনের করুণ পরিণতি তাহারই প্রকৃষ্ট প্রমাণ। ইহা ছাড়া দেশের অসংখ্য হাসপাতালে এক্সরে মেশিন আছে অথচ তাহা চালাইবার মতো কোনো টেকনিশিয়ান নাই। কোটি টাকা মূল্যের ল্যাবরেটরি মেশিন ধুলার আস্তরণে ঢাকা পড়িয়া আছে অথচ তাহা পরিচালনার জন্য ল্যাব টেকনিশিয়ান নিয়োগ দেওয়া হয় নাই। বৎসরের পর বৎসর এই মূল্যবান যন্ত্রপাতিসমূহ কাঠের বাক্সে বন্ধ অবস্থায় পড়িয়া থাকিয়া একসময় তাহা ব্যবহারের অনুপযোগী ও অকেজো হইয়া যায়।
মূলত সরকারি হাসপাতালে টেকনিশিয়ানের কৃত্রিম সংকট ও অচল যন্ত্রের পরিস্থিতি এই জন্য তৈরি করা হয়, যাহাতে বেসরকারি হাসপাতালগুলো তাহা হইতে সুবিধা পাইতে পারে। কেননা সরকারি হাসপাতালের একশ্রেণির ডাক্তার-নার্স-টেকনিশিয়ান ঐসব বেসরকারি হাসপাতালে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করিয়া থাকেন। তাহারা যোগসাজশ করিয়া এইখানে জনগণকে উচ্চমূল্যে পরীক্ষানিরীক্ষা করাইতে বাধ্য করেন। এই অনৈতিক বাণিজ্য বন্ধ হইতে পারে, যদি সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার-নার্স-টেকনিশিয়ানদের বেসরকারি হাসপাতালে প্রাইভেট প্র্যাকটিস নিষিদ্ধ করা হয়। প্রয়োজনে তাহারা বিকালে সরকারি হাসপাতালেই যৌক্তিক হারে অর্থবিনিময়ের মাধ্যমে বাড়তি দায়িত্ব পালন করিবেন; কিন্তু তাহাদের প্রাইভেট হাসপাতাল-ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারে দায়িত্ব পালন করিতে দেওয়া যাইবে না। নিয়ম অনুযায়ী তাহারা পারে না। কেননা সরকারি চাকুরিতে প্রবেশে বেসরকারি এমনকি সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করিতে হয়। আর প্রাইভেট এই সকল স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে পার্টটাইম নহে, বরং নিজস্ব ফুলটাইম ও স্থায়ী জনবল নিয়োগ দিতে হইবে, নতুবা তাহাদের লাইসেন্স বাতিল করিতে হইবে। সরকারি হাসপাতালে লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয়ে আলট্রাসনোগ্রাফি, ইসিজি, অ্যানেসথেশিয়া ও ভেন্টিলেটর মেশিন ইত্যাদি আনা হয়; কিন্তু তাহা বৎসরের পর বৎসর ধরিয়া সিন্দুকবন্দি রাখা অতীব দুঃখজনক। ইহার পাশাপাশি আমাদের পরিকল্পনাহীন কেনাকাটা বন্ধ করিতে হইবে। যে হাসপাতালে বিদ্যুৎ-সংযোগের পর্যাপ্ত ভোল্টেজ বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নাই, সেইখানে উচ্চ প্রযুক্তির আইসিইউ ও স্ক্যানার মেশিন পাঠাইয়া দেওয়া হয়, যাহা অব্যবহৃত অবস্থায় নষ্ট হইতে বাধ্য। কোনো কোনো গ্রামীণ হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনের কোনো সার্জন নাই, অথচ সেইখানে বহু দিন ধরিয়া আধুনিক অপারেশন থিয়েটারের দামি সরঞ্জামাদি বাক্সবন্দি পড়িয়া আছে। চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রকৃত চাহিদার চাইতেও আমদানিকারক, আমলা ও মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের অর্থনৈতিক ফায়দা ও বিপুল পরিমাণ আর্থিক কমিশনের লোভও ইহার জন্য দায়ী। তাহা ছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিকল্পনা শাখা ও মাঠপর্যায়ের হাসপাতালগুলির মধ্যে কোনো বাস্তবসম্মত সমন্বয় নাই। জনবল না থাকিলেও কেবল বাজেট বরাদ্দের টাকা আত্মসাৎ ও অপচয় করিবার জন্য যন্ত্র ক্রয় করা হয় বলিয়া অভিযোগ রহিয়াছে।
এই দিকে কোটি কোটি টাকার যন্ত্র অবহেলায় বিনষ্ট করিবার অপরাধে এযাবৎ কোনো আমলা, ঠিকাদার বা পরিচালকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় নাই। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিই দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়াছে। এই জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ অডিট কমিটি গঠন করিতে হইবে। হাসপাতালের ভৌত অবকাঠামো ও দক্ষ জনবলের সঠিক পরিসংখ্যান ব্যতিরেকে কোনো নতুন যন্ত্রপাতি ক্রয়ের অনুমোদন দেওয়া যাইবে না। ইহা ছাড়া দেশের প্রতিটি সরকারি হাসপাতালের যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা তদারকির জন্য একটি কেন্দ্রীয় অনলাইন ডেটাবেজ তৈরি করিতে হইবে, যাহাতে কোন যন্ত্র সচল আর কোনটি অচল—তাহা জনগণের সম্মুখে দৃশ্যমান থাকে। মোট কথা, জনগণের করের টাকায় ক্রয়কৃত সামগ্রী ভাঙারির দোকানে নিঃশেষ হইতে দেওয়া যায় না।