রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বৃহৎ নগরগুলির বিস্তীর্ণ অঞ্চল এই বারের বৃষ্টিতে নজিরবিহীনভাবে জলাবদ্ধ হইতে দেখিলাম আমরা। জলাবদ্ধতা যেন নগরবাসীর ফি বর্ষার চিরচেনা নিয়তি; কিন্তু এই বারকার পরিস্থিতি সেই চিরচেনা দুর্ভোগকেও ছাড়াইয়া গিয়াছে। বহু স্থানে মানুষ কোমরসমান পানিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকা পড়িয়াছেন, যানবাহন অচল হইয়াছে, ব্যবসায়-বাণিজ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা – সকল কিছুই হইয়া পড়িয়াছে স্থবির । বিনিদ্র রজনি পার করা জলমগ্ন ভুক্তভোগীদের অনেকেই গণমাধ্যমে আক্ষেপ করিয়া বলিয়াছেন যে, নিকট অতীতে এমন ভয়াবহ জলাবদ্ধতা তাহারা দেখেন নাই। তাহারা প্রশ্ন তুলিয়াছেন, প্রতি বর্ষায় বৃষ্টিপাত কিংবা বন্যার পানিতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়, প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে—এই দুর্দশার দায় কাহার?
বিরাজমান জলাবদ্ধতার কারণ সম্পর্কে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বলিয়াছেন, পলিথিনই অন্যতম প্রধান দায়ী। এই বক্তব্যকে অমূলক বলিবার অবকাশ নাই। কারণ, আমাদের নগরগুলি আজ অপচনশীল প্লাস্টিক ও পলিথিনের ভাগাড়ে পরিণত হইয়া উঠিয়াছে। ড্রেন, খাল ও জলাশয় আবর্জনায় ভরাট হইয়া পানিপ্রবাহের স্বাভাবিক পথ রুদ্ধ হইতেছে; উপরন্তু নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি তো রহিয়াছেই। ফলে সামান্য বৃষ্টিও রূপ লয় বড় দুর্যোগে। পরিবেশবিদেরা বহু দিন ধরিয়াই সতর্ক করিয়া আসিতেছেন যে, জলাবদ্ধতা কেবল অবকাঠামোগত ব্যর্থতা নহে; ইহা নাগরিক আচরণ ও পরিবেশ-অসচেতনতারও ফল ।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক বক্তৃতায় তাহার একটি ছোট অথচ গভীর তাৎপর্যপূর্ণ অভ্যাসের কথা বলিয়াছেন। তিনি জানান, শৈশব হইতেই ব্যবহৃত টিস্যু ডাস্টবিনে ফেলিবার অভ্যাস রপ্ত করিয়াছেন তিনি। একটি রাষ্ট্রের পরিচ্ছন্নতা অনেক সময় এমন ছোট ছোট অভ্যাস দিয়াই শুরু হয়। জাপান, সিংগাপুর কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলিতে নাগরিক দায়িত্ববোধই পরিচ্ছন্ন নগর গঠনের অন্যতম ভিত্তি হিসাবে কাজে করিয়াছে। সেইখানে আইনের প্রয়োগ যেমন আছে, তেমনি আছে আত্মশৃঙ্খলা। আমাদের দেশেও যদি প্রত্যেকে নিজের ব্যবহৃত পলিথিন, বোতল বা আবর্জনা নির্ধারিত স্থানে ফেলিবার অভ্যাস গড়িয়া তোলে, তাহা হইলে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব।
তবে দায় কেবল নাগরিকের নহে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বৃহৎ নগরগুলির ড্রেনেজ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরিয়াই অব্যবস্থাপনা, সমন্বয়হীনতা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভুগিতেছে। বর্ষা মৌসুমে খোলা ম্যানহোলে পড়িয়া কিংবা বিদ্যুতায়িত পানিতে প্রাণহানির সংবাদও শুনিতে হয়। তথাপি দায় নিরূপণের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলিকে প্রায়ই একে অপরের উপর দোষ চাপাইতে দেখা যায় । ইহা কোনো সভ্য রাষ্ট্রের চিত্র হইতে পারে না। মনে রাখা প্রয়োজন, একটি নগরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা তাহার উন্নয়নের অন্যতম প্রধান সূচক। প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতার নগর পরিকল্পনা ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা আজও বিস্ময় জাগায়। হাজার হাজার বছর পূর্বে যাহারা সুপরিকল্পিত ড্রেন নির্মাণ করিতে পারিয়াছিল, আধুনিক প্রযুক্তির যুগে আমরা কেন সেই মৌলিক ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করিতে পারিব না?
সচেতন মহলের পরিষ্কার কথা – প্রকৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান লইয়া 'উন্নয়ন' কখনো টিকসই হয় না । নির্বিচারে গাছ কাটিয়া, খাল-জলাশয় ভরাট করিয়া, পলিথিনে পরিবেশ ভাসাইয়া কিংবা বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে অবহেলা করিয়া প্রকারন্তরে আমরা নিজেরাই নিজেদের জন্য বিপদ ডাকিয়া আনিতেছি। আজ জলাবদ্ধতা, কাল তীব্র তাপপ্রবাহ, আবার কখনো আকস্মিক বন্যা—এই সকল দুর্যোগের অনেকটাই আমাদের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের বিষফল। আমরা প্রায়ই এই সম্পাদকীয়তে লিখিয়া থাকি —পৃথিবী ভিন্ন আমাদের বিকল্প আবাসভূমি নাই; ‘প্ল্যানেট বি' বা 'সি’ বলিয়া কিছু নাই। অতএব, পরিবেশ রক্ষা মানেই কি নিজের জীবন ও ভবিষ্যৎ রক্ষা নহে?
এই বারের বৃষ্টিপাত, নগর জুড়িয়া ভয়াবহ জলাবদ্ধতা এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী বন্যা আমাদের জন্য একটি কঠিন সতর্কবার্তা। এই সংকট হইতে শিক্ষা গ্রহণ করিবার এখনই সময়। সরকারকে যেমন ড্রেনেজ ব্যবস্থা আধুনিক ও কার্যকর করিতে হইবে, নদনদী খালবিলগুলি দখল ও দূষণমুক্ত করিতে হইবে, তেমনি নাগরিকদেরও অভ্যস্ত হইয়া উঠিতে হইবে পরিবেশবান্ধব জীবনাচরণে । পরিবর্তনের সূচনা হউক ব্যবহৃত টিস্যু, পলিথিন কিংবা যে কোনো বর্জ্য ডাস্টবিনে ফেলিবার ন্যায় একটি ছোট্ট অভ্যাস দিয়াই। পরিবেশের প্রতি এইরূপ সামান্য যত্নই ভবিষ্যতের বৃহৎ বিপর্যয় প্রতিরোধের প্রথম পদক্ষেপ। ইহার পাশাপাশি জলাবদ্ধতা নিরসন করিতে হইলে পয়োনিষ্কাশনসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা একই কর্তৃপক্ষের আওতায় আনিতে হইবে। নতুবা বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থাপনা কখনোই দূর হইবে না ।

