শিশুর কান্না আমাদের বিবেকের পরীক্ষা

চারদিকে আমরা এমন সকল নিষ্ঠুর ও অমানবিক ঘটনা ঘটিতে দেখিতেছি, যাহা কেবল উদ্বেগজনকই নহে, রীতিমতো ভীতিজাগানিয়া। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও আমাদের বিবেককে নাড়া দিয়া গিয়াছে। ভিডিওটিতে দেখা যায়, মাত্র দুই মাস বয়সি এক শিশুর পা মুচড়াইয়া দিতেছেন তাহারই আপন চাচি। অভিযোগ উঠিয়াছে, পারিবারিক কলহের প্রতিশোধ লইতেই নিরীহ শিশুটির উপর এই নিষ্ঠুরতা চালানো হইয়াছে। শিশুটি কেন সারাক্ষণ কান্না করিতেছে—এই সন্দেহ হইতেই তাহার মা গোপনে ক্যামেরা স্থাপন করেন, আর তাহাতেই ধরা পড়ে মানবিকতাকে লজ্জায় ফেলিবার সেই দৃশ্য । স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে—আমরা কোন সমাজে বাস করিতেছি, যেইখানে দুই মাস বয়সি একটি নিষ্পাপ শিশুও প্রতিহিংসার রোষানল হইতে রক্ষা পায় না?

দুঃখজনক হইল, ইহা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নহে । প্রায় প্রতিদিনই সংবাদপত্রের পাতা খুলিলেই শিশু নির্যাতন, পারিবারিক সহিংসতা, নারী নিপীড়ন, খুন, ছিনতাই কিংবা বৃদ্ধ পিতা-মাতার প্রতি অমানবিক আচরণের সংবাদ চোখে পড়ে। কোথাও পিতার হাতে সন্তান নিহত, কোথাও ভাইয়ের হাতে ভাই, কোথাও আবার বৃদ্ধ পিতা-মাতা অপমানিত ও পরিত্যক্ত। সমাজে যেন সহমর্মিতার স্থানে ক্রমেই স্থান লইতেছে নিষ্ঠুরতা ও অসহিষ্ণুতা। ইহা কেবল আইনশৃঙ্খলার অবনতির লক্ষণ নহে—ইহা আমাদের নৈতিক ও মানবিক অবক্ষয়েরও নির্মম প্রতিচ্ছবি। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলিয়াছেন, ‘প্রতিটি শিশু এই বার্তা লইয়া জন্মগ্রহণ করে যে, স্রষ্টা এখনো মানুষের প্রতি আস্থা হারান নাই।' অর্থাৎ, সেই শিশুর প্রতিই যদি আমরা নির্মম হইয়া উঠি, তাহা হইলে আমাদের মানবিকতার দাবি কোথায়? আবার ঔপন্যাসিক জেমস বেডউইনের একটি গভীর পর্যবেক্ষণ স্মরণযোগ্য—‘শিশুরা বড়দের কথা শুনিতে খুব দক্ষ নহে; কিন্তু বড়দের অনুসরণ করিতে কখনো ব্যর্থ হয় না।' অর্থাৎ, আজ আমরা যাহা করিব, আগামী প্রজন্ম তাহাই শিখিবে। ঘৃণা, প্রতিহিংসা ও সহিংসতার বীজ যদি শিশুমনে রোপিত হয়, তাহা হইলে ভবিষ্যতের সমাজ শান্তিপূর্ণ হইবে—এমন আশা করিবার কোনো কারণ আছে কি? নিশ্চয়ই আমরা এক অস্থির সময় পার করিতেছি। অর্থনৈতিক চাপ, পারিবারিক টানাপড়েন, সামাজিক অস্থিরতা, যুদ্ধ ও অনিশ্চয়তা মানুষের মানসিক ভারসাম্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলিতেছে; কিন্তু কোনো সংকটই একটি শিশুর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণের বৈধতা প্রদান করে না। সভ্যতার প্রকৃত মানদণ্ড নির্ধারিত হয় দুর্বল, অসহায় ও শিশুদের প্রতি আমাদের আচরণের মধ্য দিয়া। যে সমাজ তাহাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করিতে পারে না, সেই সমাজের উন্নয়ন যতই হউক, তাহা প্রকৃত উন্নয়ন বলিয়া বিবেচিত হইতে পারে না ।
বাংলাদেশের গণ্ডি ছাড়াইয়া বিশ্বপরিস্থিতির দিকেও দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। গাজায় দীর্ঘদিনের যুদ্ধ হাজার হাজার শিশুর জীবন বিপর্যস্ত করিয়া দিয়াছে। অসংখ্য শিশু পিতা-মাতা হারাইয়াছে, অনেকেই স্থায়ীভাবে পঙ্গু হইয়াছে, আবার অনেকের শৈশব চাপা পড়িয়াছে ধ্বংসস্তূপের নিচে। যুদ্ধবিধ্বস্ত সেই সকল শিশুর কাঠের পায়ের খটখট শব্দ হয়তো আমাদের কানে পৌছায় না; কিন্তু মানবতার আদালতে সেই আর্তনাদ কখনো নিঃশব্দ থাকে না। বিশ্বের যেইখানেই কোনো শিশুর উপর অন্যায় সংঘটিত হউক, তাহা সমগ্র মানবজাতির জন্যই লজ্জার বিষয় ।

অতএব, কেবল কঠোর আইন প্রণয়ন করিলেই চলিবে না; পরিবারে মূল্যবোধের চর্চা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানবিক শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা এবং অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি—সকল কিছুই সমানভাবে জরুরি। শিশুকে প্রতিপালনের অর্থ কেবল তাহার খাদ্য ও বস্ত্রের ব্যবস্থা করা নহে—তাহাকে ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও মর্যাদা প্রদান করাও সমান দায়িত্ব । মনে রাখিতে হইবে, আজকের শিশুই আগামী দিনের সমাজ নির্মাণ করিবে। তাহাদের চোখে যদি আমরা ভয়ের পরিবর্তে ভালোবাসা ও মানবিকতার আলো জ্বালাইতে না পারি, তাহা হইলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিকট আমাদের কোনো জবাব থাকিবে না। নিষ্পাপ-কোমলমতি শিশুদের ‘হাসি রক্ষা’ করাই কি মানবতার ভবিষ্যৎ রক্ষা করা নহে?