বান্দরবানের রুমায় বন্যাদুর্গতদের জন্য বরাদ্দ করা ত্রাণ বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বন্যা পরবর্তী সময়ে ত্রাণ বিতরণে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা বঞ্চিত হয়েছেন। আর যারা ত্রাণ পেয়েছেন তাদের দেওয়া হয়েছে পোকাধরা চাল ও নিম্নমানের ভোজ্যতেল।
এমন অভিযোগের মুখে জেলা পরিষদ, খাদ্য গুদাম, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে দিয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বান্দরবানের রুমা উপজেলার মানুষের জন্য ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে বরাদ্দ করা সাড়ে ১২ মেট্রিক টন ত্রাণের চাল ও ভোজ্যতেল বিতরণকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি পোকাধরা চাল দেওয়ার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জোরালো আলোচনায় এসেছে। এরপর বিষয়টি জানাজানি হয়।
গত বুধবার (১৫ জুলাই) প্রথম ধাপে ৩০০ পরিবারের মাঝে ত্রাণ বিতরণের পরই উপকারভোগীদের একাংশ অভিযোগ করেন, তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে পোকাধরা ও নিম্নমানের চাল এবং নিম্নমানের ভোজ্যতেল। অভিযোগ ছড়িয়ে পড়তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে।
শুক্রবার অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করেন এবং ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মোট ৫০০ পরিবারের জন্য ত্রাণ বরাদ্দ করা হলেও প্রথম ধাপে ৩০০ পরিবারকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। বাকি ২০০ পরিবারের মধ্যে আগামী ১৮ জুলাই ত্রাণ বিতরণের কথা রয়েছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের ভুক্তভোগীদের তথ্যে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে।
সেগুন খামার এলাকার একাধিক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার অভিযোগ করে জানান, বন্যায় তাদের পুকুর, মাছ, ফার্মের মুরগি, ওল-কচু, শাকসবজি ও অন্যান্য ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হলেও তারা কোনো ত্রাণ পাননি। অথচ যাদের উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়নি, তাদের মধ্যে কেউ কেউ একাধিকবার ত্রাণ পেয়েছেন। তাদের প্রশ্ন—কোন ভিত্তিতে এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে? প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের বাদ দিয়ে কাদের স্বার্থে এই তালিকা করা হয়েছে?
তাছাড়া যারা ত্রাণ পেয়েছেন, তাদের অনেকেই হতাশা প্রকাশ করে বলেন, পোকায় ভরা চাল আর নিম্নমানের তেল দিয়ে আমাদের কী হবে? এসব চাল আমরা খাওয়ার অযোগ্য মনে করে মুরগির খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করেছি। একদিকে হাতে কোনো টাকা নেই, অন্যদিকে ব্যাংকের ঋণের চাপ। এমন পরিস্থিতিতে এই ধরনের ত্রাণ আমাদের সঙ্গে এক ধরনের প্রহসন।
ত্রাণ বিতরণে নিম্নমানের সামগ্রী দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে জেলা পরিষদের সদস্য লালজারলম বম দায় অস্বীকার করে বলেন, ‘চাল ভালো না খারাপ, আমি জানি না। প্যাকেট করার সময় আমার প্রতিনিধি লালপিয়াংথাং বম উপস্থিত ছিলেন। তিনি যদি কিছু না বলেন, তাহলে আমি কীভাবে জানব?’
তবে তার প্রতিনিধি লালপিয়াংথাং বম সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি করেন। তিনি বলেন,
‘খাদ্য গুদাম থেকে চাল নেওয়ার সময়ই বুঝতে পারি চালের মান খারাপ। সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি জেলা পরিষদের সদস্যকে জানাই। কিন্তু তিনি কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে বরং বিতরণের প্রস্তুতি চালিয়ে যেতে বলেন। এরপর আমার আর কিছু করার ছিল না।’
রুমা সদর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অংসিংনু মারমা অভিযোগ করেন, ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে চাল প্যাকেটজাত করা হলেও পুরো প্রক্রিয়া থেকে জনপ্রতিনিধিদের কার্যত দূরে রাখা হয়। তার ভাষায়, ‘চেয়ারম্যান বা সদস্যদের কাউকে কোনো দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। জেলা পরিষদের সদস্যের প্রতিনিধিই পুরো কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেছেন।’
অন্যদিকে খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পিপুল মারমা বলেন, গুদামে আগে থেকেই চাল ছিল। সাম্প্রতিক বন্যায় কিছু বস্তার চাল নষ্ট হয়েছে। যদি গুদামেই চাল প্যাকেটজাত বা বিতরণ করা হতো, তাহলে মান যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া যেত। কিন্তু চাল ইউনিয়ন পরিষদে নিয়ে গিয়ে প্যাকেট করা হয়েছে। আমাদের কাজ ছিল চাহিদা অনুযায়ী সাড়ে ১২ মেট্রিক টন চাল বুঝিয়ে দেওয়া।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লিজা আক্তার বিথী বলেন, চাল প্যাকেটজাত করার সময় আমাদের জানানো হয়নি। ফলে চালের মান সম্পর্কে আমরা অবগত ছিলাম না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি আলোচনায় আসার পর জানতে পেরেছি। পরে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলে ভবিষ্যতে ভালো মানের চাল সরবরাহ নিশ্চিত করার অনুরোধ করেছি।
এছাড়া আরও অভিযোগ উঠেছে, রুমা বাজার এলাকার বহু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, পাইন্দু ইউনিয়নের বিভিন্ন পাড়া এবং গালেঙ্গা ইউনিয়নের অনেক পরিবার ত্রাণের তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। স্থানীয়দের দাবি, সাম্প্রতিক বন্যা ও পাহাড়ধসে তাদের জুম চাষের ধানক্ষেত, শাকসবজির আবাদ এবং বিভিন্ন ফলের বাগান ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তারা কোনো ধরনের ত্রাণ সহায়তা পাননি।
উল্লেখ্য, ত্রাণ বিতরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিজা আক্তার বিথী, জেলা পরিষদের সদস্য লালজারলম বম, উপজেলা বিএনপি সাবেক সহসভাপতি থুইসাঅং মারমা, সদর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অংসিংনু মারমা, উপজেলা বিএনপির মহিলা দলের নেত্রী ঙৈনুচিং মারমা,চিংসাথোয়াই মারমা (বিপ্লব) সহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।