শিক্ষাগুরুর বিভীষিকাকাল কাটবে কবে?

ভারতের পরতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একসময় গুজরাটের মেহসানা জেলার ভাদনগর শহরের এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তেন। সেই বিদ্যালয়ে জগদীশ ভাই নায়েক নামে একজন শিক্ষক ছিলেন। ২০২২ সালের ১০ জুন একটি সরকারি কর্মসূচিতে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী মোদি সেখানে যান। শিক্ষক জগদীশ ভাই নায়েক খবর পান যে তার ছাত্র-যিনি এখন দেশের প্রধানমন্ত্রী-তার এলাকায় আসছেন। তখন তিনি মোদির সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তাৎক্ষণিকভাবে তার জন্য সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা হয়। অনুষ্ঠানস্থলে যখন দুই জনের সাক্ষাৎ হয়, তখন প্রধানমন্ত্রী মোদি প্রোটোকল ভেঙে পরম শ্রদ্ধায় তার শিক্ষকের পা ছুঁয়ে প্রণাম করেন। আবেগাপ্লুত শিক্ষকও তার ছাত্রকে জড়িয়ে ধরে আশীর্বাদ করেন। ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের সীমানা ছাড়িয়ে শিক্ষাগুরুর প্রতি তার এই যে সম্মানবোধ, তা আমাকে খুব আপ্লুত করেছিল।

ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ও 'মিসাইল ম্যান' ড. এ পি জে আবদুল কালাম পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় তার শিক্ষক ছিলেন আইয়ার সুব্রহ্মণিয়াম নামে একজন। মাদ্রাজ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (MIT) পড়ার সময় তার আর্থিক অবস্থা যখন খুব খারাপ ছিল, তখন এই শিক্ষক তাকে আর্থিকভাবে সাহায্যও করেছিলেন। রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর ড. কালাম রামেশ্বরমে গিয়ে তার সেই বৃদ্ধ শিক্ষকের সঙ্গে দেখা করে পা ছুঁয়ে প্রণাম করেন এবং তার পরিবারের খোঁজখবর নেন। নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী প্রফেসর আবদুস সালামের শিক্ষক ভক্তির ঘটনাটিও ইতিহাসে বিরল ও অনন্য। ১৯৭৯ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পাওয়ার পর তিনি তার শৈশবের ভারতীয় শিক্ষক অনিলেন্দ্র গাঙ্গুলীকে খুঁজে বের করতে ভারত সরকারের সাহায্য চান। এক পর্যায়ে সেই শিক্ষকের সন্ধানও পেয়ে যান। ১৯৮১ সালে কলকাতায় শয্যাশায়ী শিক্ষকের বাড়ি গিয়ে তিনি নোবেল মেডেলটি গুরুর গলায় পরিয়ে দেন এবং বলেন, 'স্যার, এটি আপনারই দান, আমার নয়।'

আমাদের দেশেও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের অনেকেই অতীতে তাদের শিক্ষকদের প্রতি অনুকরণযোগ্য সম্মান দেখিয়ে গেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২৭ থেকে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত টুঙ্গিপাড়ার গিমাডাঙ্গা জিটি স্কুলে পড়াশোনা করেন। সেই স্কুলের শিক্ষক ছিলেন বেজেন্দ্রনাথ সূত্রধর নামে একজন। ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি তার সেই স্কুলশিক্ষককে ঢাকায় বঙ্গভবনে ডেকে পাঠান। স্যারকে দেখেই তিনি তার পা ছুঁয়ে সালাম করেন, বুকে জড়িয়ে ধরেন এবং নিজের চেয়ারে বসিয়ে মন্ত্রীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। ১৯৭৬ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চারঘাটের সারদা পুলিশ একাডেমি পরিদর্শনে যান। সে সময়ে তিনি একাডেমি-সংলগ্ন এই সারদা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়টিও পরিদর্শন করেন। সেখানে গিয়ে তিনি আকস্মিকভাবে দেখতে পান, বিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তারই শৈশবকালের শিক্ষক জনাব মো. রিয়াজ উদ্দিন। বহু বছর পর নিজের পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষককে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দেখে রাষ্ট্রপতি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং শিক্ষকের পা ছুঁয়ে সালাম করেন।

ইতিহাস ঘাটলে এমন আরো অনেক ঘটনার খোঁজ পাওয়া যাবে। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের প্রজন্মের (গত শতাব্দীর ৫০-এর দশক প্রজন্ম) অনেকের জীবনেই শিক্ষক নিয়ে এমন অনেক গল্প রয়েছে। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশের অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, গত পাঁচ/ছয় দশকে আমরা যেন অনেক অনেক দূরে চলে এসেছি। একটা সময় ছিল যখন কোনো ভুল কাজ করার পর কোনো শিক্ষককে দূর থেকে আসতে দেখলেও একজন ছাত্রের রীতিমতো কাপড় ভিজে যাওয়ার অবস্থা হতো। অথচ আজকাল ছাত্রের ভয়ে সারাক্ষণ শিক্ষকরাই তটস্থ থাকেন; না জানি কখন কী ঘটে যায়, আর উন্মত্ত 'মব' এসে টুটি চেপে ধরে! এই তো কয়দিন আগে (৮ জুলাই, ২০২৬) চুয়াডাঙ্গায় শিক্ষার্থীকে শাসন করায় স্কুলে ঢুকে শিক্ষিকাকে পিটিয়েছে এক অভিভাবক। ৮ জুলাই ২০২৬ দুপুরে জেলা শহরের ফার্মপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঘটনাটি ঘটে। ভুক্তভোগী শিক্ষক কাবেরী করিম স্কুলটির প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বেও রয়েছেন। বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, স্কুল সন্নিকটবর্তী এলাকার জনৈক সামসুর রহমান শুভর মেয়ে বিসমাহ জান্নাত ঐশ্বর্য (৯) ঐ স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী। সে স্কুলের সমাবেশ চলাকালে এক ছাত্রের সঙ্গে কথা বলাবলি করছিল। এ কারণে তাকে শাসন করতে গিয়ে প্রধান শিক্ষক তার গালে একটি চড় মারেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তার বাবা বিদ্যালয়ে ঢুকে প্রধান শিক্ষককে মারধর করেন। (দৈনিক ইত্তেফাক, ৮ জুলাই, ২০২৬)।

শুধু অভিভাবক নয়, কখনো কখনো খোদ শিক্ষার্থী কর্তৃক শিক্ষককে মারধর করার সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে এবং স্যোশাল মিডিয়ায় ভেসে উঠছে। সম্প্রতি এমনই এক ঘটনা ঘটেছে টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার শওকত আলী ভূঁইয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে। শ্রেণিকক্ষে শাসন করায় নারী শিক্ষককে মারধর করেছে নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী। অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বাবা একই বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। স্কুলের ছাত্রীদের উত্যক্ত করার অভিযোগে শাসন করতে গেলে ঘটনার দিন দুপুরে শ্রেণিকক্ষে নবম শ্রেণির অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর সঙ্গে ভুক্তভোগী ঐ শিক্ষকের কথা কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে তাকে শাসন করতে একটি থাপ্পড় দেন ঐ শিক্ষক। এতেই ক্ষুব্ধ হয়ে শিক্ষককে থাপ্পড় আর কিলঘুষি মারা শুরু করে ঐ শিক্ষার্থী। (সমকাল, ২৫ জুন, ২০২৬)।
এর আগে গত এপ্রিলে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতির বিরুদ্ধে রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের একজন শিক্ষককে বাসভবনে ডেকে নিয়ে অপমান ও হেনস্তা করার অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও শিক্ষক মহলে তীব্র ক্ষোভ ও বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরমতে ১৬ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের দশম শ্রেণির পদার্থবিজ্ঞান ক্লাসে এক শিক্ষার্থী সহকারী শিক্ষক দয়াল চন্দ্র পালকে বারবার বিরক্ত করতে থাকে। একপর্যায়ে শিক্ষক ও অন্য শিক্ষার্থীদের অভিযোগ অনুযায়ী, ঐ শিক্ষার্থী শিক্ষকের সঙ্গে অত্যন্ত আপত্তিকর ও অবমাননাকর আচরণ করে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে শিক্ষক ছাত্রটির মাথায় হালকা আঘাত বা শাসন করেন। এই ঘটনার সূত্র ধরে ছাত্রের বিচারপতি পিতা শিক্ষককে তার নিজের বাসভবনে ডেকে পাঠান। গত ১৮ এপ্রিল সহকারী প্রধান শিক্ষককে সঙ্গে নিয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষক বিচারপতির বাসভবনে যান। অভিযোগ ওঠে যে, সেখানে শিক্ষককে চরমভাবে অপমান, মানসিক হেনস্তা এবং শিক্ষার্থীর কাছে জোরপূর্বক ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়।

আজকাল পত্রিকার পাতা ওলটালেই কোথাও না কোথাও শিক্ষক লাঞ্ছনার এমন খবর পাওয়া যায়। অতীতেও এমন হয়েছে। তবে ২০২৪-এর অন্তর্বর্তী সরকারের আমল থেকে এ যেন সর্বনাশা ক্যানসারের মতো সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। প্রাইমারি স্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়, কোথাও শিক্ষকরা নিজেদের নিরাপদ ভাবতে পারছেন না। বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার ২১ এপ্রিল সংখ্যায় এক প্রতিবেদনদৃষ্টে দেখা যায় ইউনুস সরকারের আমলে সারা দেশে ৩ থেকে ৪ হাজার শিক্ষক মবের শিকার হয়েছেন। দুঃখজনক হলো এই মবের সদস্যরা তাদেরই ছাত্র। গত ফেব্রুয়ারিতে দেশে একটা নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হলেও মব নিয়ন্ত্রণে তারা এখন পর্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। এখনো অনেক ক্ষেত্রেই অনেক শিক্ষককে পান থেকে চুন খসলেই 'ফ্যাসিবাদের দোসর' আখ্যা দিয়ে তার ওপর মব করা হচ্ছে। পেশাগত শ্রেণির মাঝে শিক্ষকদের মতো আর কোনো সম্প্রদায় এমন করে মবের শিকার হচ্ছেন না। সর্বত্রই শিক্ষকদের মাঝে পেশাগত নিরাপত্তাহীনতাবোধ কাজ করছে; ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক শিক্ষাদান কার্যক্রম-যার প্রভাব গিয়ে পড়ছে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায়। এই অবস্থা থেকে উত্তরণ না ঘটাতে পারলে একসময় গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাই যে মুখ থুবড়ে পড়বে, তা তো বলাই বাহুল্য। প্রশ্ন হলো-শিক্ষাগুরুর এই বিভীষিকাকাল কি কাটবে না? কাটলে, কবে?

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত জাতিসংঘ কর্মকর্তা ও কলামিস্ট