বন্যা-উত্তর স্বাস্থ্যসংকট ও পুনর্বাসন

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২৬, ০৬:১৫

দেশের ২৮টি উপজেলার ১৬০টি ইউনিয়নে সম্প্রতি যে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছে, তাহা কেবল আর মানবিক সংকটের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নাই; বরং ইহা এক ভয়াবহ স্বাস্থ্যসংকটের রূপ ধারণ করিয়াছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, এক দিনে (১৫ জুলাই) বন্যাকবলিত এলাকায় ৬৬৭ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হইয়াছে। একই সময় সাপের কামড়ে আক্রান্ত হইয়াছে ছয় জন এবং পানিতে ডুবিয়া মারা গিয়াছে তিন জন। আর গত ১০ জুলাই হইতে মাত্র পাঁচ দিনে বন্যাকবলিত এলাকার হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়াছে ২ হাজার ৬৩০ জন। তাহার মধ্যে ২ হাজার ৪৬২ জনই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হইয়াছে। ইহা ছাড়া ১২৩ জন সাপের কামড় খাইয়াছে এবং পানিতে ডুবিয়া মারা গিয়াছে ২১ জন। যদিও বন্যার প্রকৃত স্বাস্থ্যঝুঁকি এখনো আমাদের সম্মুখে উন্মোচিত হয় নাই। বন্যার পানি নামিতে শুরু করিয়াছে মাত্র এবং আর কিছুদিনের মধ্যে ক্ষয়ক্ষতিসহ প্রকৃত চিত্র পরিস্ফুট হইয়া উঠিবে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্যার পানি সরিয়া যাইবার পর শুরু হয় আসল বিপর্যয়। এই সময়ে দূষিত পরিবেশ, বিশুদ্ধ ও সুপেয় পানির তীব্র সংকট এবং আশ্রয়কেন্দ্রসমূহে মাত্রাতিরিক্ত ভিড়ের কারণে পানিবাহিত ও সংক্রামক ব্যাধি চরম আকার ধারণ করে। এই সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। প্রথমত, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার দূষিত বর্জ্য বন্যার পানির সহিত মিশিয়া সেই পানিকে মারাত্মকভাবে দূষিত করে। ফলে ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড ও হেপাটাইটিস-এ দ্রুত ছড়াইয়া পড়ে। ইহা রোধকল্পে পানি ফুটাইয়া অথবা পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট (হ্যালোজেন ট্যাবলেট) ব্যবহার করিয়া পান করা আবশ্যক। এই সময় দেখা দেয় নিউমোনিয়াও এবং এই জন্য শিশু ও বয়স্কদের ব্যাপারে অধিক যত্ন নেওয়া প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, পানি নামিয়া যাইবার পর যত্রতত্র জমিয়া থাকা স্বচ্ছ পানি এডিস মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়, যাহা ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ বৃদ্ধি করে। অতএব, দ্রুত পানি নিষ্কাশন এবং মশক নিধনে লার্ভিসাইড ও ফগিং করা অত্যাবশ্যক। তৃতীয়ত, দীর্ঘ সময় ভেজা ও কর্দমাক্ত পরিবেশে অবস্থান করিবার ফলে চর্মরোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। এই জন্য শরীর যথাসম্ভব শুষ্ক রাখা এবং আক্রান্ত স্থানে জীবাণুনাশক ব্যবহার করা প্রয়োজন। চতুর্থত, বন্যার পানি বৃদ্ধির সহিত সাপের উপদ্রব বাড়ে। এই সময়ে সর্পদংশনের বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন এবং আক্রান্ত ব্যক্তিকে ওঝার নিকট না লইয়া অনতিবিলম্বে হাসপাতালে প্রেরণ নিশ্চিত করিতে হইবে।

বর্তমান সরকার দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতিমধ্যে উপদ্রুত এলাকাগুলিতে ৩ হাজার ৬৭টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করিয়াছে এবং ৩ হাজার ১১৭টি মেডিক্যাল টিম চিকিৎসাসেবা প্রদান করিতেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সূত্র অনুযায়ী, বর্তমানে মাঠপর্যায়ে প্রায় ২২ হাজার ভায়াল অ্যান্টি-স্নেক ভেনম মজুত রহিয়াছে এবং অতি দ্রুত আরো ২৫ হাজার ভায়াল সরবরাহের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইতেছে। ইহা ছাড়া চিকিৎসাসেবা সচল রাখিতে মাঠ পর্যায়ে প্রায় ৭৫ লক্ষ ওআরএস (খাওয়ার স্যালাইন), ৪ লক্ষ ব্যাগ কলেরা স্যালাইন এবং ৩৬ লক্ষাধিক পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট প্রস্তুত রাখা হইয়াছে। এই সকল উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে এখন নূতন করিয়া যেই সকল এলাকায় বন্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা করা হইতেছে, সেই সকল অঞ্চলে আগাম প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে বন্যা কেবল একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকিবে না। দেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অন্য জেলাসমূহ এবং নদী অববাহিকায় যে কোনো মুহূর্তে নূতন করিয়া বন্যা দেখা দিতে পারে। সুতরাং, এই সকল অঞ্চলে এখন হইতেই আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করিলে তাহা হইবে দূরদর্শিতার পরিচায়ক।

মোদ্দা কথা, বন্যাপরবর্তী পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় কেবল খাদ্য ও পরিধেয় বস্ত্র বিতরণই যথেষ্ট নহে, বরং দুর্গত মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা এই মুহূর্তের সর্বপ্রধান চ্যালেঞ্জ। ইহা ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা ইত্যাদি সংস্কারেও উদ্যোগ নিতে হইবে। এই সকল সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও দেশের সচেতন সমাজকেও এই সংকট উত্তরণে আগাইয়া আসিতে হইবে।

ইত্তেফাক/এএম