বিনামূল্যে ঠোঁট ও তালু কাটা রোগীর অস্ত্রোপচারে ৫ দিনের আন্তর্জাতিক চিকিৎসা মিশন

অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর পরিবারের ঠোঁট ও তালু কাটা সমস্যায় আক্রান্ত প্রায় ১০০ শিশুকে বিনামূল্যে শল্যচিকিৎসা প্রদানের লক্ষ্যে ঢাকায় পাঁচ দিনব্যাপী এক আন্তর্জাতিক চিকিৎসা মিশন শুরু হয়েছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জাবিহুল্লাহ শনিবার সকালে সরকারি কর্মচারী হাসপাতালে প্রধান অতিথি হিসেবে মিশনটির উদ্বোধন করেন।

সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল, স্মাইল এশিয়া এবং ঢাকা ব্যাংক পিএলসির সহযোগিতায় সাজেদা ফাউন্ডেশন-আয়োজিত এই কার্যক্রমে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শিশুদেরকে বিশেষায়িত, মানসম্মত ও বিনামূল্যে শল্যচিকিৎসা প্রদান করবে স্বেচ্ছাসেবী স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবী এবং বাংলাদেশী চিকিৎসকদের একটি আন্তর্জাতিক দল।

শিশুদের জন্য বিশেষায়িত পুনর্গঠনমূলক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সম্প্রসারণের যৌথ অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করতে ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা, স্বাস্থ্যসেবা নেতৃবৃন্দ, উন্নয়ন অংশীদার, কর্পোরেট প্রতিনিধি এবং আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সম্প্রদায়ের সদস্যরা এই অনুষ্ঠানে যোগদান করেন।

বিশিষ্ট অতিথিদের মধ্যে ছিলেন—জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহসানুল হক, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী, সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের মহাপরিচালক মো. এ. রাজ্জাক সরকার, সাজেদা ফাউন্ডেশনের উপ-প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফজলুল হক, ঢাকা ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওসমান এরশাদ ফয়েজ এবং স্মাইল এশিয়ার মহাসচিব অভিমন্যু তালুকদার।

কর্মসূচিটি ১৮ থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত চলবে, যেখানে আটটি দেশের ৩৮ জন চিকিৎসা পেশাজীবী বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের সাথে ঠোঁট ও তালুর কাটা অংশের অস্ত্রোপচার করার জন্য কাজ করবেন। এই বহুমাত্রিক দলে রয়েছেন প্লাস্টিক সার্জন, অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট, নার্স, থেরাপিস্ট ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা, যারা শিশুদের খেতে, কথা বলতে এবং আরও স্বাস্থ্যকর ও আত্মবিশ্বাসী জীবনযাপনে ফিরিয়ে আনতে তাদের দক্ষতা ব্যবহার করবেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি মো. ইসমাইল জাবিহুল্লাহ বলেন, “আজ এই মহৎ উদ্যোগটির উদ্বোধন করতে পেরে আমি গর্বিত। এই মিশনটি শিশুদের মুখে হাসি ও আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনছে এবং তাদের অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা লাঘব করছে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানবিক কাজের কোনো সীমান্ত নেই।”

সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের মহাপরিচালক মো. এ. রাজ্জাক সরকার বলেন, “গত বছরের মিশনের সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে আমাদের অংশীদারদের সাথে আবারও কাজ করতে পেরে আমরা আনন্দিত। আটটি দেশ থেকে এখানে আসা মেডিকেল টিমসহ এই উদ্যোগে যোগদানকারী প্রত্যেককে আমি ধন্যবাদ জানাই।”

সাজেদা ফাউন্ডেশনের উপ-প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফজলুল হক বলেন, “দেশব্যাপী কার্যক্রমের মাধ্যমে আমরা এ বছরের মিশনে ২০০ জনেরও বেশি রোগীকে অন্তর্ভুক্ত করতে পেরেছি। সাজেদা ফাউন্ডেশনের জন্য স্বাস্থ্য একটি অগ্রাধিকার খাত এবং আমরা সরকার ও আমাদের অংশীদারদের সাথে অংশীদারিত্বে এই ধরনের মানবিক উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে চাই।”

ঢাকা ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওসমান এরশাদ ফয়েজ বলেন, “আমাদের সকল সহযোগীর নিষ্ঠা ও সহযোগিতার কারণে এই শিশুরা আজ নতুন হাসি পাবে। ঢাকা ব্যাংক তার ব্যাংকিং কার্যক্রমের বাইরেও এই মানবিক উদ্যোগের পাশে থাকতে পেরে গর্বিত।”

স্মাইল এশিয়ার মহাসচিব অভিমন্যু তালুকদার বলেন, “গত কয়েক বছরে স্মাইল এশিয়া বাংলাদেশে ৫ শতাধিক অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেছে এবং আমরা আরও বেশি করতে চাই। এ বছর আটটি দেশের স্বেচ্ছাসেবকরা আমাদের সাথে যোগ দেওয়ায় আমি আত্মবিশ্বাসী যে এটি একটি সফল মিশন হবে।”

ঠোঁট ও তালু কাটা বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত সাধারণ জন্মগত মুখমণ্ডলের ত্রুটিগুলোর মধ্যে অন্যতম। প্রতি ৫০০ থেকে ৬০০টি জীবিত শিশুর মধ্যে প্রায় একজন এ ত্রুটি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। কেবল বাংলাদেশেই প্রতি বছর ৫ হাজারের বেশি শিশু এই অবস্থা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। সময়মতো অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ঠোঁট ও তালুর কাটার চিকিৎসা করা সম্ভব হলেও আর্থিক সংকট, ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা এবং বিশেষজ্ঞ সেবার অপ্রতুলতার কারণে অনেক শিশু এ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়। চিকিৎসা না করালে শিশুরা প্রায়শই খাওয়াদাওয়া, কথা বলার বিকাশ, শ্রবণশক্তি এবং পুষ্টির ক্ষেত্রে সমস্যার সম্মুখীন হয়, যা তাদের শিক্ষা, মানসিক সুস্থতা এবং জীবনের সামগ্রিক মানের উপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।

রোগীকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করার লক্ষ্যে এই অনুষ্ঠানে সরকারি কর্মচারী হাসপাতালে একটি কল সেন্টারও উদ্বোধন করা হয়।