অতিসম্প্রতি নজরুল বর্ষের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তিনি মন্তব্য করেন, জাতীয় কবিকে ঘিরে আয়োজিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পাশাপাশি নজরুল গবেষক, শিল্পী ও নজরুলপ্রেমীদের আরও বেশি সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা উচিত। তাঁর এই বক্তব্য মূলত একটি বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্নের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে-রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতৃত্ব ও প্রতিনিধিত্ব কি যথাযথভাবে সংশ্লিষ্ট জ্ঞান, দক্ষতা ও পেশাগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হচ্ছে?
একটি আধুনিক রাষ্ট্রে প্রশাসনের সঙ্গে সংস্কৃতি ও সমাজের সম্পর্ক থাকা স্বাভাবিক। তবে একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে যে, প্রশাসনিক পরিচয় যেন অন্যান্য পেশাজীবী, গবেষক, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের স্বাভাবিক ভূমিকা ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রকে ছাপিয়ে না যায়। রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হওয়া উচিত ভারসাম্য, জবাবদিহিতা এবং যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন।
ইংরেজ ইতিহাসবিদ লর্ড অ্যাক্টনের বিখ্যাত উক্তি “Power tends to corrupt, and absolute power corrupts absolutely”-আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হলে জবাবদিহিতা দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রশাসন জনগণের সেবক; নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্ব নীতি নির্ধারণ করে এবং পেশাদার প্রশাসন তা বাস্তবায়ন করে। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে প্রশাসন অতিরিক্ত প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারে।
ইসলামী রাষ্ট্রচিন্তাতেও ক্ষমতা ও দায়িত্বকে আমানত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনের নির্দেশনা-“আমানত তার হকদারের কাছে পৌঁছে দাও” (সূরা আন-নিসা ৪:৫৮)-আধুনিক প্রশাসনের ভাষায়ও একই শিক্ষা দেয়: সঠিক ব্যক্তিকে সঠিক স্থানে দায়িত্ব প্রদান করতে হবে। তাই একটি কার্যকর রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজন ক্ষমতার ভারসাম্য, জবাবদিহিতা এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে দায়িত্ব বণ্টন।
বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোর বর্তমান বাস্তবতা বুঝতে হলে এর ঐতিহাসিক শিকড়ের দিকে তাকাতে হয়। ব্রিটিশ শাসনামলে গড়ে ওঠা ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস (ICS)-এর মূল লক্ষ্য ছিল জনগণের অংশগ্রহণমূলক শাসন নয়, বরং উপনিবেশ পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করা। ফলে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা, কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্বমূলক প্রশাসনিক সংস্কৃতির একটি ধারা তৈরি হয়, যা পাকিস্তান আমলেও অনেকাংশে অব্যাহত ছিল।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রকৌশল, কৃষি, বন, অর্থনীতি ও অন্যান্য বিশেষায়িত ক্যাডার গড়ে উঠলেও শীর্ষ প্রশাসনিক পদ, নীতি নির্ধারণী পর্যায় ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাধারণ প্রশাসন ক্যাডারের প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি থেকে যায়। এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিবর্তনের ফল। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হওয়া, বিভিন্ন সময়ে কর্তৃত্ববাদী শাসনের সময় প্রশাসনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতার কারণে প্রশাসনের প্রভাব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার পেশাদার আমলাতন্ত্রকে আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য মনে করলেও সতর্ক করেছিলেন যে, অতিরিক্ত শক্তিশালী আমলাতন্ত্র পরিবর্তন প্রতিরোধী ক্ষমতাকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। তাই একটি কার্যকর রাষ্ট্রের জন্য শক্তিশালী প্রশাসনের পাশাপাশি প্রয়োজন ক্ষমতার ভারসাম্য, জবাবদিহিতা এবং বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের যথাযথ মূল্যায়ন।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হলো সিভিল সার্ভিসে ক্ষমতার ভারসাম্য। মূল প্রশ্ন হচ্ছে-প্রশাসন কি তার সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমার মধ্যে থেকে রাষ্ট্র পরিচালনায় সমন্বয়কারীর ভূমিকা পালন করবে, নাকি ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের অন্যান্য পেশাগত ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে ছাপিয়ে একটি প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত হবে? একটি আধুনিক রাষ্ট্রে দক্ষ ও শক্তিশালী প্রশাসন অপরিহার্য। তবে সেই শক্তি তখনই রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর, যখন তা আইনের শাসন, জবাবদিহিতা, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং জনগণের স্বার্থের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে। অন্যথায় প্রশাসনিক ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যকে দুর্বল করে এবং বিশেষায়িত জ্ঞান ও দক্ষতার বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
প্রশাসনিক ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের পেছনে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দুর্বলতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। অনেক ক্ষেত্রে মন্ত্রী বা জনপ্রতিনিধিরা নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের জটিল কারিগরি বিষয় সম্পর্কে পর্যাপ্ত গবেষণা, নীতিগত সহায়তা কিংবা বিশেষজ্ঞ পরামর্শের অভাবে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। ফলে নীতি প্রণয়নে প্রকৌশলী, চিকিৎসক, কৃষিবিদ, অর্থনীতিবিদ, বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ ও গবেষকদের তুলনায় প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গিই বেশি গুরুত্ব পায়।
দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মহলে এমন সমালোচনা রয়েছে যে, কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থার সময় প্রশাসনের একটি অংশ রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মাধ্যমে তুলনামূলকভাবে অধিক প্রভাবশালী অবস্থান অর্জন করেছে। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার শীর্ষ পর্যায়ে প্রশাসন ক্যাডারের উপস্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশে প্রশিক্ষণ, উচ্চশিক্ষার স্কলারশিপ, আন্তর্জাতিক কর্মশালা, প্রকল্প পরিচালনা, প্রেষণ, পদোন্নতি এবং নীতিনির্ধারণী কমিটিতে প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও প্রশাসন ক্যাডার তুলনামূলক বেশি সুযোগ পেয়েছে-এমন ধারণা অন্যান্য ক্যাডার ও পেশাজীবীদের একটি বড় অংশের মধ্যে রয়েছে। এর ফলে সিভিল সার্ভিসে বৈষম্যের অনুভূতি এবং পারস্পরিক আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়েছে।
এই বাস্তবতার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে বিশেষায়িত পেশাভিত্তিক ক্যাডারগুলোর ওপর। চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, বিজ্ঞানী, শিক্ষা, বন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ ক্যাডারের কর্মকর্তারা দীর্ঘ একাডেমিক শিক্ষা ও পেশাগত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিজ নিজ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ হিসেবে গড়ে ওঠেন। কিন্তু তাঁদের অনেকের অভিযোগ, পদোন্নতি, গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, বিদেশে প্রশিক্ষণ, উচ্চশিক্ষার সুযোগ এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁরা প্রশাসন ক্যাডারের তুলনায় পিছিয়ে থাকেন। বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরিবর্তে সাধারণ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়ার প্রবণতাও দীর্ঘদিনের বিতর্ক।
এর ফলে একটি নেতিবাচক প্রবণতা তৈরি হয়েছে। অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী, যারা চিকিৎসা, প্রকৌশল, কৃষি বা বিজ্ঞান গবেষণায় দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারতেন, তাঁরা তুলনামূলক বেশি ক্ষমতা, মর্যাদা ও ক্যারিয়ারের সুযোগের কারণে প্রশাসন ক্যাডারকে বেশি আকর্ষণীয় মনে করেন। এতে বিশেষায়িত খাতে দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতির পাশাপাশি গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
তবে এ আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। এটি কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সততা, মেধা বা দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন নয়। প্রশাসন ক্যাডারে অসংখ্য দক্ষ, সৎ ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মকর্তা রয়েছেন, যারা আন্তরিকতার সঙ্গে রাষ্ট্রের সেবা করে যাচ্ছেন। আলোচনার বিষয় হলো একটি প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা, যেখানে ক্ষমতা, সুযোগ-সুবিধা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র একটি নির্দিষ্ট প্রশাসনিক ধারার দিকে তুলনামূলকভাবে বেশি কেন্দ্রীভূত হয়েছে কি না এবং এর ফলে রাষ্ট্রের অন্যান্য পেশাগত শক্তির পূর্ণ সম্ভাবনা কতটা কাজে লাগানো যাচ্ছে।
বাস্তবে প্রশাসন ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞান একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং পরিপূরক। একজন প্রশাসকের শক্তি নীতি সমন্বয়, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, আইনগত প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার মধ্যে নিহিত। অন্যদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি কিংবা গবেষণার মতো জটিল খাতে কার্যকর নেতৃত্বের জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গভীর জ্ঞান ও দীর্ঘ পেশাগত অভিজ্ঞতার বিকল্প নেই। একটি কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থায় এই দুই ধরনের দক্ষতার সমন্বয়ই সর্বোত্তম ফল নিশ্চিত করে।
বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলোর অভিজ্ঞতাও একই শিক্ষা দেয়। যুক্তরাজ্যে সাধারণ প্রশাসকরা নীতি সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মতো খাতে বিশেষজ্ঞদের নেতৃত্বকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রে নাসা, জাতীয় স্বাস্থ্য সংস্থা এবং রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থার মতো প্রতিষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ বিশেষজ্ঞরাই নেতৃত্ব দেন। একইভাবে জার্মানি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুর প্রশাসনিক দক্ষতা এবং বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের সমন্বয়ের মাধ্যমে কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। তাদের মূল নীতি-যে ব্যক্তি যে ক্ষেত্রে সবচেয়ে যোগ্য, নেতৃত্বের সুযোগও তারই পাওয়া উচিত।
বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোকে আরও কার্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ করতে হলে অতীতে আলোচিত কিছু সংস্কার উদ্যোগ নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে। এর মধ্যে ইউনিফাইড সিভিল সার্ভিস এবং সিনিয়র সার্ভিসেস পুল (এসএসপি) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী পদগুলোকে একটি নির্দিষ্ট ক্যাডারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সব ক্যাডারের যোগ্য, অভিজ্ঞ ও মেধাবী কর্মকর্তাদের জন্য উন্মুক্ত করা।
ইউনিফাইড সিভিল সার্ভিসের মূল দর্শন হলো-সিভিল সার্ভিসকে বিচ্ছিন্ন ক্যাডারের সমষ্টি হিসেবে নয়, বরং একটি সমন্বিত পেশাগত কাঠামো হিসেবে গড়ে তোলা। অর্থাৎ একজন প্রকৌশলী, চিকিৎসক, কৃষিবিদ, অর্থনীতিবিদ, বিজ্ঞানী বা শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা যদি নেতৃত্ব, কর্মদক্ষতা ও সততার ভিত্তিতে নিজেকে প্রমাণ করতে পারেন, তবে তাঁরও রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের দায়িত্ব পালনের সুযোগ থাকা উচিত। একইভাবে সিনিয়র সার্ভিসেস পুলের ধারণা ছিল বিভিন্ন ক্যাডারের সেরা কর্মকর্তাদের প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী পদে নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা। এতে প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরে বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের সমন্বয় সম্ভব।
যদিও এসব সংস্কার বাস্তবায়ন সহজ নয়, কারণ দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতা কাঠামো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রতিরোধ সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক। তবু রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে কোনো গোষ্ঠীর প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধার চেয়ে দক্ষ, জবাবদিহিমূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ প্রশাসনিক ব্যবস্থা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। একটি আধুনিক রাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি সিভিল সার্ভিস গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিটি ক্যাডারের কর্মকর্তা মেধা, কর্মদক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সমান প্রতিযোগিতার সুযোগ পাবেন।
প্রশাসনিক সংস্কারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পদায়ন ও পদোন্নতির নীতিকে আরও স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক করা। বিদেশে প্রশিক্ষণ, উচ্চশিক্ষার স্কলারশিপ, আন্তর্জাতিক ফেলোশিপ, প্রেষণ, প্রকল্প পরিচালনা এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নির্ধারণে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃতি, প্রার্থীর দক্ষতা ও পেশাগত অবদানকে প্রধান বিবেচ্য করা উচিত। বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সেবার মান উভয়ই উন্নত হবে।
বাংলাদেশ আগামী দিনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তার মতো জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। এসব খাতে কেবল প্রশাসনিক দক্ষতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন উচ্চমানের বিশেষজ্ঞ জ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনী নেতৃত্ব। তাই রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রশাসক ও বিশেষজ্ঞের কার্যকর অংশীদারিত্ব এখন অপরিহার্য।
এখানে ইসলামী প্রশাসনিক দর্শনও গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেয়। ইসলামে দায়িত্বকে ক্ষমতা বা বিশেষ সুবিধা নয়, বরং একটি আমানত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। পবিত্র কুরআন ও মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শিক্ষা অনুযায়ী কর্মকর্তা নির্বাচনে যোগ্যতা, সততা ও ন্যায়বিচারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। হযরত উমর (রা.)-এর শাসনামলে কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও পদায়নে যোগ্যতা, জবাবদিহি এবং জনকল্যাণ ছিল প্রধান বিবেচ্য বিষয়। আধুনিক ব্যবস্থাপনা চিন্তাবিদ পিটার ড্রাকারের ভাষায়ও কার্যকর নেতৃত্বের অন্যতম শর্ত হলো-সঠিক ব্যক্তিকে সঠিক দায়িত্বে নিয়োগ করা। অর্থাৎ ইসলামী প্রশাসনিক দর্শন ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা-উভয়ই রাষ্ট্র পরিচালনায় পরিচয়ের চেয়ে যোগ্যতা এবং ক্ষমতার চেয়ে দায়িত্ববোধকে অধিক গুরুত্ব দেয়।
সবশেষে বলা যায়, প্রশাসনিক সংস্কারের উদ্দেশ্য কোনো ক্যাডারের মর্যাদা কমানো বা বাড়ানো নয়; বরং রাষ্ট্রের সামগ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। একটি আধুনিক রাষ্ট্রে প্রশাসন, চিকিৎসা, প্রকৌশল, কৃষি, শিক্ষা, বিজ্ঞান, অর্থনীতি ও প্রযুক্তি-সব ক্ষেত্রের মেধা ও অভিজ্ঞতাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। যোগ্যতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব, ন্যায্য সুযোগের নিশ্চয়তা, বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের মর্যাদা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করতে পারলেই একটি দক্ষ, জবাবদিহিমূলক ও আধুনিক সিভিল সার্ভিস গড়ে উঠবে। কারণ রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি কোনো একক ক্যাডারের আধিপত্যে নয়; বরং সব পেশাগত শক্তির সমন্বিত বিকাশে নিহিত।
লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট।