ইউরোপের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট মাথায় নিয়ে ১৬ বছর পর আবারও বিশ্বজয়ের লক্ষ্যে মেগা ফাইনালে আজ নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে মাঠে নামছে এক দুর্ভেদ্য ও অপরাজেয় স্পেন। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ট্রফি ও ফুটবলের সর্বোচ্চ অমরত্ব ছিনিয়ে নেওয়ার এই লড়াইয়ে লুইস দে লা ফুয়েন্তের পরিকল্পনার সামনে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে আর্জেন্টিনা। পুরো ফুটবল বিশ্ব এখন বুঁদ হয়ে আছে এক জাদুকরী জেনারেশনাল দ্বৈরথ দেখার জন্য, যেখানে স্পেনের ১৯ বা র ১৯ বছর বয়সী বিস্ময় বালক লামিন ইয়ামাল মুখোমুখি হবেন ৩৯ বছর বয়সী কিংবদন্তি লিওনেল মেসির, যাকে বার্সেলোনার ডেরায় ইয়ামালের সবচেয়ে যোগ্য উত্তরসূরি বলে গণ্য করা হচ্ছে।
মাঠের সবুজ গালিচায় এটিই হতে যাচ্ছে তাদের প্রথম অফিশিয়াল দ্বৈরথ। তবে এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক অলৌকিক ইতিহাস; যেখানে ২০০৭ সালের ডিসেম্বর মাসে একটি চ্যারিটি ফটোশুটের অংশ হিসেবে মাত্র ছয় মাস বয়সি অবুঝ শিশু ইয়ামালকে স্নান করাতে পরম মমতায় সাহায্য করেছিলেন ২০ বছর বয়সী তরুণ মেসি। গোটা টুর্নামেন্টে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খেলে মাত্র ১টি গোল হজম করা স্পেন এবার তাদের ফুটবল ইতিহাসের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা ঘরে তুলতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। যা হতে পারে ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে তাদের প্রথম বিশ্বজয়ের ঠিক ১৬ বছর পর এক ঐতিহাসিক পুনরাবৃত্তি। স্প্যানিশ শিবিরের একমাত্র লক্ষ্য হলো তাদের নিখুঁত ও আগ্রাসী ফুটবল শৈলী দিয়ে বিশ্বকাপের এই মেগা ফাইনালকে এককভাবে লা রোজার রঙে রাঙিয়ে তোলা।
ফাইনালে স্পেনের কাছ থেকে মূলত নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ, অভূতপূর্ব দলীয় সংহতি এবং মাঠের ভেতর আগ্রাসী তীব্রতা আশা করা হচ্ছে। নিজেদের চেনা বলের দখল ধরে রাখা এবং নিখুঁত ছোট ছোট পাসের টিকিটাকা ঘরানার ফুটবল দর্শন তারা এই টুর্নামেন্টেও কঠোরভাবে বজায় রেখেছে। তাদের খেলা ৭টি ম্যাচে বল দখলের গড় হার ছিল অবিশ্বাস্য ৬৩.৭ শতাংশ। স্পেনের এই একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের মানসিকভাবে ও শারীরিকভাবে চরম ক্লান্ত করে তোলে। কারণ স্প্যানিশ মিডফিল্ডের জাদুকররা যখন নিখুঁত সুদ্ধতায় পাসের পর পাস খেলেন, তখন প্রতিপক্ষ কেবল মাঠের ভেতর বলের পেছনে ছায়ার মতো দৌড়াতে বাধ্য হয়।
তবে তাদের এই রণকৌশল কেবল বল ধরে রেখে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের ফাটল খোঁজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্পেনের মাঠের মুভমেন্ট অত্যন্ত গতিশীল, যেখানে খেলোয়াড়রা ক্রমাগত নিজেদের পজিশন অদলবদল করেন এবং আচমকা উইং দিয়ে বক্সে ধেয়ে গিয়ে প্রতিপক্ষের পুরো রক্ষণাত্মক কাঠামোকে ভেঙে চুরমার করে দেন। বিশেষ করে ডিফেন্স লাইনের গভীর থেকে আচমকা আক্রমণভাগে উঠে আসার কৌশলটি স্পেনের জন্য সবচেয়ে বেশি ফলপ্রসূ প্রমাণিত হয়েছে। সরাসরি উইং দিয়ে প্রতিপক্ষের ডিফেন্স লাইনের পেছনে ঢুকে পড়ার ক্ষেত্রে বাঁ প্রান্তে আরও বেশি আগ্রাসী ভূমিকা পালন করেছেন লেফট-ব্যাক মার্ক কুকুরেলা ও রাইট-ব্যাক পেড্রো পোরোদের অবিশ্বাস্য গতি ও ফ্রিকোয়েন্সির কারণে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা তাদের কাকে কীভাবে মার্ক করবে তা নির্ধারণ করতে চরম হিমশিম খাচ্ছে।
আর স্পেনের এই পুরো রণকৌশল ও ডিফেন্সকে এক সুতোয় বেঁধে রাখার প্রধান কাণ্ডারি হলেন ম্যানচেস্টার সিটির মিডফিল্ড রদ্রি। এই টুর্নামেন্টে স্পেনের দলগত খেলার স্টাইল সবচেয়ে সুনির্দিষ্ট এবং গোছানো। প্রতিটি খেলোয়াড় নিজের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখেন। সতীর্থদের সঙ্গে তাদের বোঝাপড়াও অত্যন্ত নিরেট। স্পেনের আক্রমণভাগে ইয়ামাল, ওয়ারজাবাল, দানি অলমো বা 'সুপারসাব' ফেরান তোরেস ও মিকেল মেরিনো যদি আক্রমণাত্মক ফুলঝুরি ছড়ান, তবে রদ্রি হলেন এই অপরাজেয় দলের আসল মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ড। ফিফার অফিশিয়াল পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রদ্রি প্রতি ম্যাচে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের তীব্র চাপের মুখেও গড়ে ৪৭টি নিখুঁত পাস সম্পন্ন করেছেন, যা টুর্নামেন্টের যে কোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে সর্বোচ্চ।