ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে সরকারের মেয়াদের শেষ সময়ে একের পর এক বিতর্কিত আইন পাসকে কেন্দ্র করে তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। বিরোধী দলের প্রবল প্রতিবাদের মুখে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সংসদকক্ষ ত্যাগ করলেও তার অনুপস্থিতিতেই সরকার বিলগুলো পাস করিয়ে নেয়।
গত মঙ্গলবার নেসেটে অধিবেশন চলাকালে বিরোধী দলের কয়েকজন আইনপ্রণেতা নেতানিয়াহুকে লক্ষ্য করে ‘লজ্জা’, ‘পদত্যাগ করুন’ এবং ‘চলে যান’ বলে স্লোগান দেন। উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে ভোটাভুটিতে অংশ না নিয়েই তিনি সংসদ ত্যাগ করেন। তবে তার নেতৃত্বাধীন জোটের সদস্যরা বিলটি পাস করেন।
শুক্রবার (১৮ জুলাই) নেসেট ভেঙে দেওয়ার আগে সরকার দ্রুত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত বিল অনুমোদন করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী ২৭ অক্টোবরের জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে জোটের অতি রক্ষণশীল হারেদি ইহুদি ও কট্টর ডানপন্থী শরিকদের সন্তুষ্ট রাখাই ছিল নেতানিয়াহুর প্রধান লক্ষ্য।
১৯৮৮ সালের পর এই প্রথম কোনো ইসরায়েলি সরকার পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে যাচ্ছে। এর আগে দীর্ঘ সময় প্রধানমন্ত্রী থাকলেও নেতানিয়াহু নিজেও কখনো পূর্ণ মেয়াদ সম্পন্ন করতে পারেননি। বিশ্লেষকদের মতে, জোটের শরিকদের বিভিন্ন দাবি পূরণ করে ক্ষমতায় টিকে থাকার কৌশলই তাকে এ পর্যায়ে এনেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক নাদাভ ইয়ালের ভাষায়, নেতানিয়াহু এখন রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকার লড়াই করছেন এবং সে কারণে হারেদি সম্প্রদায়ের সমর্থন তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব আইন পাসের মাধ্যমে তিনি তাদের বোঝাতে চাইছেন যে তাদের স্বার্থ রক্ষায় তিনিই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নেতা।
ইসরায়েলের আইনে ১৮ বছর বয়সের পর অধিকাংশ নাগরিকের জন্য সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও বহু বছর ধরে হারেদি সম্প্রদায়ের পুরুষেরা এ নিয়মের বাইরে রয়েছেন। সুপ্রিম কোর্ট কয়েকবার এ ছাড় বাতিলের নির্দেশ দিলেও রাজনৈতিক বিরোধের কারণে বিষয়টির সমাধান হয়নি।
গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এ বিতর্ক আরও বেড়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, তাদের অন্তত ১২ হাজার অতিরিক্ত সেনা প্রয়োজন। কিন্তু প্রায় ৭২ হাজার হারেদি তরুণ এখনো বাধ্যতামূলক সামরিক দায়িত্বে যোগ দেননি। ফলে যুদ্ধের চাপ সামলাতে বাধ্যতামূলক ও রিজার্ভ সেনাদের ওপরই বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে।
এ অবস্থায় সরকার সরাসরি সামরিক ছাড় স্থায়ী না করে বিকল্প পথ বেছে নেয়। নতুন একটি আইনে ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থ ‘তাওরাত’ অধ্যয়নকে রাষ্ট্রের মৌলিক মূল্যবোধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে হারেদিদের সামরিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি বজায় রাখার আইনি ভিত্তি শক্তিশালী করার চেষ্টা করা হয়েছে।
এ ছাড়া আরেকটি আইনের মাধ্যমে সেনাবাহিনীতে যোগ না দেওয়া কয়েক হাজার হারেদি তরুণকে ২০২৭ সালের জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ওই সময় পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে বাধ্যতামূলক সামরিক দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না।
ভোটাভুটির আগে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামির প্রকাশ্যে সতর্ক করে বলেন, সেনাবাহিনীর বর্তমান প্রয়োজনের সঙ্গে এ আইন সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তার মতে, এতে দায়িত্ব পালনকারী সেনাদের মধ্যে বৈষম্যের অনুভূতি তৈরি হতে পারে এবং বাহিনীর প্রতি আস্থা ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
জামিরের এ মন্তব্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায় ক্ষমতাসীন জোট। লিকুদ পার্টির কয়েকজন আইনপ্রণেতা তার অপসারণ দাবি করেন। আর হারেদি দল শাসের চেয়ারম্যান আরিয়েহ দেরি অভিযোগ করেন, সেনাপ্রধান সামরিক দায়িত্বের সীমা ছাড়িয়ে রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করছেন।
তীব্র বিতর্কের মধ্যেই বিলটি পাস হলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিরোধী দলগুলো হাইকোর্টে আবেদন করলে আদালত আইনটির কার্যকারিতা সাময়িকভাবে স্থগিত করেন।
হারেদিদের সামরিক ছাড়সংক্রান্ত আইন ছাড়াও সরকার মেয়াদের শেষ দিকে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস করেছে। এর মধ্যে রয়েছে অ্যাটর্নি জেনারেলের ক্ষমতা সীমিত করার আইন, যা বিচারব্যবস্থা সংস্কার পরিকল্পনার অংশ। সমালোচকদের আশঙ্কা, এর ফলে সরকার আইনি ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে অ্যাটর্নি জেনারেলের মতামত উপেক্ষা করতে পারবে এবং বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল গালি বাহারাভ-মিয়ারাকে অপসারণের পথ সহজ হতে পারে।
এ ছাড়া সম্প্রচার-সংক্রান্ত আইন সংশোধনের মাধ্যমে গণমাধ্যমের ওপর সরকারের প্রভাব বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সমালোচকেরা। বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক শ্রেণিকক্ষ চালুর সুযোগ রেখে পাস হওয়া আরেকটি আইন নিয়েও মানবাধিকারকর্মী ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
এদিকে অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ অধিকৃত পশ্চিম তীরে নতুন ইহুদি বসতি সম্প্রসারণে প্রায় ২৪০ কোটি শেকেল ব্যয়ের ঘোষণা দিয়েছেন। একই সঙ্গে এর আগে স্থাপিত ৩৪টি নতুন অবৈধ বসতিকে বৈধতা দেওয়ার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ ইসরায়েলি ‘তাওরাত’ অধ্যয়নকে মৌলিক আইন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিরোধিতা করছেন এবং পরবর্তী সরকারে হারেদি দলগুলোর অংশগ্রহণও চান না। এ ইস্যুকে সামনে রেখে বিরোধী দলগুলো নির্বাচনী প্রচারণা জোরদার করেছে।
প্রধান বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকট সরকারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে রাজনৈতিক জোট রক্ষার অভিযোগ তুলেছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও বলেছেন, সরকার সেনাসদস্য, তাদের পরিবার ও দেশের মানুষের প্রতি অবজ্ঞা দেখিয়েছে।
তবে নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠদের দাবি, এসব সমালোচনায় প্রধানমন্ত্রী বিচলিত নন। তাদের মতে, আদালত যদি এসব আইনে হস্তক্ষেপও করে, তাহলে বিচারব্যবস্থার সঙ্গে নতুন সংঘাতকে নির্বাচনের আগে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ পাবেন নেতানিয়াহু।
সূত্র: সিএনএন