এরশাদের দলে-ঘরে মেলা ঝামেলা

এইচএম এরশাদের অবর্তমানে তার রেখে যাওয়া দল জাতীয় পার্টিতে (জাপা) নেতৃত্বের প্রশ্নে বিবাদ মিটেনি। বিশেষ করে, দলের ‘চেয়ারম্যান’ পদ নিয়ে এরশাদপত্নী রওশন এরশাদ ও তার ছোটো ভাই জিএম কাদেরের মধ্যে সৃষ্ট মতপার্থক্য এখনো অমীমাংসিত। বারিধারায় ‘প্রেসিডেন্ট পার্ক’-এ যে বাসায় এরশাদ থাকতেন, সেটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েও একধরনের ঝামেলা জিইয়ে রয়েছে। সেখানে বর্তমানে এরশাদপুত্র এরিক বসবাস করলেও বাবার মৃত্যুর পর থেকে মা বিদিশার সঙ্গে সে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। অন্যদিকে, এরশাদের মৃত্যুতে শূন্য হওয়া রংপুর-৩ আসনের আসন্ন উপনির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন নিয়েও বিরোধ দেখা দিয়েছে।

জাপার প্রতিষ্ঠাতা এইচএম এরশাদ গত ১৪ জুলাই মৃত্যুবরণ করার পর প্রথম বিরোধের সূত্রপাত হয় দলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া তথা ‘চেয়ারম্যান’ পদ নিয়ে। এরশাদের মৃত্যুর চার দিনের মাথায় ১৮ জুলাই ঘোষণা দিয়ে জাপার চেয়ারম্যান হিসেবে আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন শুরু করেন আগের কয়েক মাস ধরে ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান’ হিসেবে কাজ করা জিএম কাদের। গত ৪ মে মধ্যরাতে নিজের অবর্তমানে জিএম কাদের দলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বলে এরশাদ যে লিখিত ঘোষণা দিয়েছিলেন, সেটির ভিত্তিতেই অনেকটা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই চেয়ারম্যান হন তার ছোটো ভাই। তবে এতে বাদ সাধেন রওশন। গত ২২ জুলাই গভীর রাতে এক বিবৃতিতে রওশন জানিয়ে দেন, ‘জিএম কাদের চেয়ারম্যান নন, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবেই দায়িত্ব পালন করবেন।’ সেই বিবৃতিতে রওশন ছাড়াও দলের আরও নয় জন নেতার সমর্থনের কথা উল্লেখ করা হয়।

দলের নিয়ন্ত্রণ নিতে ও চেয়ারম্যান হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে অনেকটা বিরামহীন কর্মসূচি রাখছেন জিএম কাদের। ১৬ জুলাই এরশাদকে রংপুরে দাফন করে এসে কাদের ঢাকায় কুলখানি ও শোকসভাসহ বিভিন্ন স্থানে দোয়ামাহফিলে অংশ নেন। প্রেসিডিয়াম বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিয়ে জামালপুর, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে বন্যা পরিস্থিতি দেখার পাশাপাশি বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেন জিএম কাদের। পাশাপাশি নিয়মিত বনানী কার্যালয়ে বসছেন, চেয়ারম্যান হিসেবে দলীয় তহবিলসহ সাংগঠনিক সব কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। বিভিন্ন দিবস ও ইস্যুতে গণমাধ্যমে বিবৃতিও দিচ্ছেন। দলের গঠনতন্ত্রে চেয়ারম্যানকে দেওয়া ক্ষমতাও চর্চা করছেন। চেয়ারম্যান হিসেবে ইতিমধ্যে কয়েকজনকে পদোন্নতি দিয়েছেন, বিভাগীয় সম্মেলন কমিটিও অনুমোদন দিয়েছেন। সব মিলিয়ে এরশাদের অবর্তমানে হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া অবশিষ্ট নেতাকর্মীদের আগলে রেখেছেন জিএম কাদের। রওশনসহ তার বলয়ে থাকা নেতারা ‘চেয়ারম্যান’ হিসেবে এখনো স্বীকৃতি না দিলেও দলের হাল ধরে সাংগঠনিক কার্যক্রমে পুরোপুরি সক্রিয় জিএম কাদের।

আগামী ২৩ জুলাই মরহুম এরশাদের চল্লিশা। এ উপলক্ষ্যে ঢাকা ও রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে। ঢাকায় কর্মসূচি নির্ধারণে আজ শুক্রবার ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ জাপার নেতাদের নিয়ে বনানী কার্যালয়ে বৈঠক করবেন জিএম কাদের।

অন্যদিকে, এত দিনের নীরবতা ভেঙে দলের ভেতরে ও জাতীয় সংসদে দলের নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্রিয় হতে যাচ্ছেন রওশন এরশাদ। স্বামী এরশাদের চল্লিশা যাওয়ার পর প্রকাশ্যে তত্পর হবেন তিনি। জাপায় রওশন বলয়ের অন্যতম নেতা হিসেবে প্রকাশ্যে কথা বলা ফখরুল ইমাম গতকাল বৃহস্পতিবার ইত্তেফাককে বলেন, ‘২৩ জুলাইয়ের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাত্ চাইবেন রওশন, এছাড়া এরশাদের চল্লিশা উপলক্ষ্যে সংসদ ভবনের মসজিদে দোয়া-মাহফিল আয়োজনেরও প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।’

রওশন বলয়ে থাকা জাপার একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সংসদের আসন্ন অধিবেশনের আগেই দলের নেতৃত্ব নিয়ে সৃষ্ট সমস্যা সমাধান করতে চান রওশন। অধিবেশন শুরু হওয়ার আগেই সংসদ ভবনে দলীয় এমপিদের বৈঠক ডাকবেন সংসদের বর্তমান বিরোধীদলীয় উপনেতা রওশন। সেখানে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা মনোনীত করা হবে। সেক্ষেত্রে রওশন বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচিত হতে পারেন। রওশন বিরোধীদলীয় নেতা না হলে নতুন বিরোধীদলীয় উপনেতা কাকে করা হবে, সেটা নিয়েও আলোচনা হতে পারে।

জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য ফখরুল ইমাম এমপি ইত্তেফাককে বলেন, ‘জাপার চেয়ারম্যান হতে রওশন এরশাদের তেমন আগ্রহ নেই, তবে আমরা চাই তিনি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করুন। কারণ, বিরোধীদলীয় নেতা হওয়ার পাশাপাশি তিনি যদি দলের চেয়ারম্যান না হন তাহলে দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পার্লামেন্টারি পার্টির প্রধান হতে পারবেন না। সেক্ষেত্রে বিভিন্ন নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন ছাড়াও সংসদে বিরোধী দলের কার্যক্রম পরিচালনায় নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে।’ এক প্রশ্নের জবাবে ফখরুল বলেন, ‘রওশন এরশাদ বিরোধীদলীয় নেতা ও পার্টির চেয়ারম্যান হলে সেক্ষেত্রে জিএম কাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।’

তবে রওশন বলয়ের নেতাদের এই ফর্মুলার সঙ্গে একমত নন জিএম কাদেরের সঙ্গে থাকা নেতারা। জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জাপার সভাপতি সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা ইত্তেফাককে বলেছেন, ‘আমরা চাই দল ঐক্যবদ্ধ থাকুক। সেক্ষেত্রে রওশন এরশাদ সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জিএম কাদের দলের চেয়ারম্যান থাকলে বিষয়টির সুন্দর সুরাহা হবে। এতে দলে কোনো বিভক্তি সৃষ্টিরও সুযোগ থাকবে না।’

জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ এমপি ইত্তেফাককে বলেন, ‘সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারলে দলটা টিকবে, অন্যথায় সংকট আরো বাড়বে।’ জাপার জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব লিয়াকত হোসেন খোকা এমপি বলেন, ‘আমরা চাই রওশন এরশাদ ও জিএম কাদের সমন্বয়ের মাধ্যমে দল পরিচালনা করুন।’

এরিকের সঙ্গে মোবাইলেও যোগাযোগ করতে পারছেন না বলে বিদিশার অভিযোগ। এ ব্যাপারে ইতিমধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের কাছেও নালিশ গেছে। উল্লেখ্য, মৃত্যুর আগে এরশাদ তার স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি ট্রাস্ট করে গেছেন। ‘হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ট্রাস্ট’ নামে নিবন্ধিত এই ট্রাস্টের অন্যতম সদস্য ও জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য মেজর (অব.) খালেদ আখতার জানান, মূলত এরিকের দেখাশোনার জন্যই এই ট্রাস্ট গঠন করা হয়েছে। ট্রাস্ট সেভাবেই কাজ করছে।

অন্যদিকে, রংপুর-৩ আসনে দলীয় মনোনয়ন নিয়েও এরশাদের পরিবারস্বজনদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। এরশাদের ভাগ্নি জামাই ও জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু ইত্তেফাককে বলেন, ‘রংপুর-৩ আসনটি জাপার রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র। মূলত এই আসনটিকে কেন্দ্র করেই জাপার রাজনীতি আবর্তিত। সেই কারণে পরিবারের মধ্য থেকেই কাউকে প্রার্থী করার কথা ভাবা হচ্ছে। এ নিয়ে পরিবারের ভেতরে কথাবার্তা হচ্ছে। দেখা যাক, শেষ পর্যন্ত কী হয়।’ জানা গেছে, রংপুর উপনির্বাচনে প্রার্থী ঠিক করতে কয়েক দিনের মধ্যেই জাপার প্রেসিডিয়ামের সভা ডাকা হবে।