ভারতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় চলমান যুব আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার ব্যবস্থায় সংস্কারের নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি একটি ‘ত্রুটিহীন’ পরীক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) ক্ষমতাসীন জোটের আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে বৈঠকে মোদি বলেন, তরুণদের ভবিষ্যৎ যাতে কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
মন্ত্রিসভার সদস্য ও সংসদীয়বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু মোদির বক্তব্যের বরাত দিয়ে এসব তথ্য জানান। গত মে মাসে মেডিকেল কলেজে ভর্তির জাতীয় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা প্রকাশের পর এই প্রথম এই বিষয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করলেন মোদি। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় জনবিক্ষোভ এখন তাঁর তৃতীয় মেয়াদে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।
সোমবার (২০ জুলাই) দিল্লিতে হাজার-হাজার তরুণ সংসদ ভবনের দিকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তাদের প্রধান দাবি ছিল প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এর জেরে কয়েকজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যাও করেছেন।
রয়টার্স জানিয়েছে, মিছিলকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ হয়। দিল্লি পুলিশের দাবি, সংঘর্ষে প্রায় ১৮০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ১১৮ জন নিরাপত্তা ও পুলিশ সদস্য এবং ৬০ জন বিক্ষোভকারী রয়েছেন। তবে আন্দোলনের উদ্যোক্তারা দাবি করেছেন, ১৫০-এর বেশি বিক্ষোভকারী হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। রয়টার্স স্বাধীনভাবে এসব সংখ্যার সত্যতা যাচাই করতে পারেনি। সংঘর্ষের সময় পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করেছিল।
মোদি দাবি করেছেন, পরীক্ষায় অনিয়মের খবর পাওয়ার পর সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে। এই ঘটনায় ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি পুনঃপরীক্ষা সফলভাবে আয়োজন এবং নির্ধারিত সময়ে ফল প্রকাশ করা হয়েছে বলে দাবি করেন প্রধানমন্ত্রী।
রিজিজু বলেন, মোদি স্পষ্ট করেছেন—তরুণদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি একটি নির্ভরযোগ্য ও ত্রুটিহীন পরীক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
এদিকে আন্দোলনকারীরা জানিয়েছে, তারা সরকারবিরোধী প্রতিবাদ চালিয়ে যাবে, তবে আপাতত সংসদ অভিমুখে আর মিছিল করবে না। আন্দোলনের অন্যতম উদ্যোক্তা অভিজিৎ দিপকে বলেন, পুলিশের হামলায় আরও তরুণ আহত হোক—এমনটি তারা চান না। নারী বিক্ষোভকারীদের পুরুষ পুলিশ সদস্যদের হাতে মারধরের অভিযোগ তুলে তিনি সমর্থকদের কাছে দুঃখপ্রকাশ করেন।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি আন্দোলন সাম্প্রতিক মাসগুলোতে লাখো তরুণের সমর্থন পেয়েছে। চাকরির সংকট এবং বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে ক্ষুব্ধ তরুণ প্রজন্মের হতাশাই এই আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে আন্দোলনের অন্যতম সমর্থক ও ম্যাগসেসে পুরস্কারপ্রাপ্ত কর্মী সোনম ওয়াংচুকের অনশনও আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ২৮ জুন শুরু করা অনশনের পর শনিবার পুলিশ তাকে জোর করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। মঙ্গলবার দিল্লি হাইকোর্ট তাকে সরকারি হাসপাতাল থেকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের অনুমতি দিয়েছে। আন্দোলনকারীদের তিন দাবির একটি ছিল ওয়াংচুককে মুক্তি দেওয়া।
আন্দোলনকারীদের অন্য দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর আত্মহত্যা করা প্রায় এক ডজন শিক্ষার্থীর প্রত্যেকের পরিবারকে এক কোটি রুপি করে ক্ষতিপূরণ। ফলে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিতর্ক এখন ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা, তরুণদের ভবিষ্যৎ এবং সরকারের জবাবদিহিতা নিয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।