বিবিসি বাংলার বিশ্লেষণ

ককরোচ পার্টির আন্দোলন মোদি সরকারের জন্য বিপদঘণ্টা

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এখন আর শুধু শিক্ষা খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি এবং সরকারের জবাবদিহিতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ। বিশ্লেষকদের মতে, ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) নামে পরিচিত এই নাগরিক উদ্যোগের ক্রমবর্ধমান আন্দোলন ভবিষ্যতে মোদি সরকারের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপ ও বিপদঘণ্টা হয়ে উঠতে পারে।

মঙ্গলবার (২১ জুলাই) বিবিসি বাংলার এক বিশ্লেষণে প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

সোমবার দিল্লির যন্তর মন্তর এলাকায় বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দিনভর উত্তেজনা বিরাজ করে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় হাজারো তরুণ-তরুণী জড়ো হন। বহু মেট্রো স্টেশন ও সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হলেও তারা বিভিন্ন বাধা পেরিয়ে যন্তর মন্তরে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করলেও আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করা যায়নি।

প্রায় এক মাস ধরে শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে যন্তর মন্তরে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে আসছে সিজেপি। যদিও নামের সঙ্গে ‘পার্টি’ থাকলেও এটি কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল নয়; বরং একটি নাগরিক উদ্যোগ হিসেবেই পরিচিত।

বিশ্লেষকদের মতে, এতদিন এই সংগঠনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা নিয়ে আলোচনা হলেও সোমবারের বিক্ষোভ দেখিয়ে দিয়েছে, বাস্তবেও তাদের উল্লেখযোগ্য জনসমর্থন রয়েছে। বিশেষ করে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং চাকরিপ্রত্যাশী তরুণদের বড় অংশ এতে অংশ নেন।

স্বাধীন সাংবাদিক স্মিতা শর্মা, যিনি শুরু থেকেই আন্দোলনটি অনুসরণ করছেন, বলেন, এই বিক্ষোভের মাধ্যমে তরুণরা সরকারকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে শুধু শিক্ষা নয়, বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের উদ্বেগও সরকারকে গুরুত্ব দিতে হবে।

সোমবার সংসদ ভবন অভিমুখে মিছিলের ডাক দিয়েছিল সিজেপি। আন্দোলনের শুরুতে সংগঠনটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, সরকার তাদের আলোচনায় আমন্ত্রণ জানিয়েছে।

অন্যদিকে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডা জানান, আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন আন্দোলনকারীরাই। ইনস্টাগ্রামে এক পোস্টে তিনি বলেন, আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে এবং পরে তারা লিখিত স্মারকলিপিও জমা দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি আন্দোলন প্রত্যাহার করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান।

তবে এখন পর্যন্ত আন্দোলনের মূল দাবি মেনে নেওয়ার কোনো ঘোষণা দেয়নি কেন্দ্রীয় সরকার। অন্যদিকে সিজেপিও কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে।

সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব মনে করেন, এই আন্দোলন কেবল শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত স্বার্থের লড়াই নয়।

তার ভাষায়, নতুন প্রজন্ম এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা, কর্মসংস্থানমুখী অর্থনীতি এবং জবাবদিহিমূলক রাজনীতির দাবিতে মাঠে নেমেছে, যা দেশের সামগ্রিক ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত।

স্মিতা শর্মার মতে, এই বিক্ষোভের সবচেয়ে বড় দিক ছিল বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। ইন্টারনেট ও যোগাযোগে নানা সীমাবদ্ধতা, মেট্রো স্টেশন বন্ধ থাকা এবং পুলিশের কড়াকড়ির মধ্যেও আন্দোলনকারীরা সংগঠিত থাকতে সক্ষম হয়েছেন।

সরকারের জন্য সতর্কবার্তা

স্মিতা শর্মার মতে, সরকার যদি এই আন্দোলনের বার্তা উপেক্ষা করে, তবে সেটি বড় ধরনের ভুল হবে। তার ভাষায়, তরুণদের মধ্যে যে ক্ষোভ জমেছে, তা ভবিষ্যতে আরও বড় আকারে বিস্ফোরিত হতে পারে।

প্রবীণ সাংবাদিক হেমন্ত আত্রিও একই ধরনের মত প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, এই আন্দোলন প্রমাণ করেছে যে জনগণকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। গণতন্ত্রে মানুষের অংশগ্রহণই সবচেয়ে বড় শক্তি এবং সরকারকে শেষ পর্যন্ত জনগণের কাছেই জবাবদিহি করতে হয়।

তার মতে, তরুণদের এই সক্রিয় অংশগ্রহণ সরকারকে মনে করিয়ে দিয়েছে যে মানুষের প্রধান উদ্বেগ এখন শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতি। এসব ইস্যুতে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে সরকারের জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, সিজেপির আন্দোলন তাৎক্ষণিকভাবে সরকারের নীতিতে পরিবর্তন আনতে না পারলেও ভারতের তরুণদের অসন্তোষকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। সেই কারণে এই আন্দোলনকে অনেকেই মোদি সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত হিসেবে দেখছে